শুক্রবার ● ৬ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘রেস্তোরাঁ’ খাতের অবদান দিন দিন বাড়ছে
মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরী ।।
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:০০ এএম আপডেট: ০৬.১১.২০২৬ ১:১৬ এএম |

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘রেস্তোরাঁ’ খাতের অবদান দিন দিন বাড়ছে
‘রেস্তোরাঁ’ খাত বাংলাদেশের অন্যতম দ্রুত বিকাশমান সেবা খাত হিসেবে বিগত কয়েক দশকে আত্মপ্রকাশ করেছে।  বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘রেস্তোরাঁ’ খাতের অবদান দিন দিন বাড়ছে। নগরায়ন মানুষের জীবনযাত্রার মান ও ধরন পরিবর্তনের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসে এক বিশাল ও আমূল পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। গ্রামীণ সমাজ থেকে মানুষ যখন শহরমুখী হয়, তখন তাদের কাজের ধরন, সময়ের ব্যস্ততা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ বদলে যায়, যা সরাসরি তাদের খাদ্যতালিকায় প্রভাব ফেলে। গ্রামীণ বা ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রার তুলনায় শহরের ব্যস্ত ও যান্ত্রিক পরিবেশ মানুষের খাবারের পছন্দ এবং তা গ্রহণের অভ্যাসে পরিবর্তন নিয়ে আসে। রেস্তোরাঁয় খাওয়া, ক্যাফেতে সময় কাটানো কিংবা অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে খাবার আনিয়ে খাওয়া শহুরে জীবনযাত্রার একটি নিয়মিত অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং ডিজিটাল সুবিধার প্রসারই মূলত এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে। 
বিশ্বজুড়ে মানুষের খাদ্য-ব্যয়ে বাইরের খাবার বা রেস্তোরাঁ ও টেকআউটের পেছনে খরচ করার প্রবণতা বৃদ্ধির ফলশ্রুতিতে রেস্তোরা শিল্পের জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আধুনিক অর্থনীতিতে ‘রেস্তোরা শিল্প’ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পর্যটন উন্নয়ন, খাদ্য সংস্কৃতির বিকাশ এবং জাতীয় আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। কর্মজীবী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি, পরিবারের বাইরে খাবার গ্রহণের প্রবণতা, সামাজিক অনুষ্ঠান, জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী, ব্যবসায়িক সভা এবং পর্যটনের কারণে রেস্তোরাঁ চাহিদা বৃদ্ধিপেয়েছে। নগরায়নের ফলে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পায়; নাগরিকরা অর্গানিক খাবার, সালাদ, লো-ক্যালোরি ডায়েট বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য তালিকা অনুসরণে আগ্রহী হয়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খাবারের প্রচার, গ্রাহক রিভিউ, অনলাইন অর্ডারিং সুবিধা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার এই খাতটিকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে এই শিল্পকে আরো জনপ্রিয় করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, গ্রাহকদের মতামত রেস্তোরাঁ ও খাদ্য শিল্পের নাটকীয় পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ।
রেস্তোরাঁ শিল্পের সঙ্গে মানব সভ্যতার খাদ্য সংস্কৃতি, বাণিজ্য, পর্যটন এবং চিরন্তন আতিথেয়তার দীর্ঘ ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। প্রাচীন সভ্যতায় পথিকদের জন্য খাদ্য সরবরাহকারী সরাইখানা ও খাবারের দোকান থেকে রেস্তোরার ধারণার সূচনা হয়। কোন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ভোগের নিমিত্ত প্রস্তুত কোন খাদ্য ও পানীয় বিক্রয় করা হলে তাকে রেস্টুরেন্ট বা রেস্তোরাঁ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে আধুনিক রেস্তোরাঁর ধারণা ১৮ শতকে ফ্রান্সে বিকশিত হয় । ১৭৬৫ সালে প্যারিসে প্রতিষ্ঠিত একটি খাবারের দোকানকে আধুনিক ‘রেস্তোরাঁ’-র প্রাথমিক উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; যেখানে গ্রাহকরা নির্দিষ্ট মেনু থেকে পছন্দমত খাবার অর্ডার করতে পারতেন। ‘রেস্টুরেন্ট’  শব্দটি ফরাসি শব্দ ‘রেস্তোরাঁ’ থেকে এসেছে । ‘রেস্টুরেন্ট’- যার অর্থ পুনর্জীবিত করা বা শক্তি ফিরিয়ে দেয়া। শুরুতে এটি এমন পুষ্টিকর স্যুপ বা খাদ্যকে বুঝাতো যা শরীরের শক্তি পুনরুদ্ধারে সহায়ক ছিল। পরবর্তীকালে এই শব্দটি এমন প্রতিষ্ঠানের নাম হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে যেখানে বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশন করা হয় । শিল্প বিপ্লব, নগরায়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারের ফলে রেস্তোরাঁ শিল্প বিশ্বব্যাপী দ্রুত প্রসার লাভ করে । বর্তমানে উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশে ফাস্টফুড, ফাইন ডাইনিং, ক্যাফে, বুফে, ফুডক্লাউড কিচেন, কেজুয়াল ডাইনি এবং ফুড ট্রাক সহ বিভিন্ন ধরনের রেস্তোরাঁ পরিচালিত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী রেস্তোরাঁ ও খাদ্য পরিষেবা বাজারের আকার প্রায় ২.০ ট্রিলিয়ন থেকে ২.৪ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০৩০-এর দশকের শুরুর দিকে সামগ্রিক খাদ্য পরিষেবা খাত বাজারের আকার ২.৬ ট্রিলিয়ন থেকে ৬.৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গ্যাস্ট্রোনমি এবং বিশ্বখ্যাত ফুড ক্রিটিকদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বের সেরা ৫টি ফাইন-ডাইনিং রেস্তোরাঁ হলো: স্পেনের বার্সিলোনা শহরের ‘ডিসফ্রুতার’- ২০২৪ সালে এটি বিশ্বের সেরা রেস্তোরাঁ হিসেবে মুকুট অর্জন করে এবং বর্তমানে এটি ‘বেস্ট অব দ্যা বেস্ট’ হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত। পেরুর রাজধানী লিমায় অবস্থিত ‘মাইদো’ - ২০২৫ সালের বিশ্বের সেরা ৫০ টি ভালো রেস্তোরাঁর তালিকায় এটি বিশ্বের এক নম্বর রেস্তোরাঁ হিসেবে নির্বাচিত হয়। ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে অবস্থিত ‘অ্যালকেমিস্ট’- মিশেলিন স্টার বিশিষ্ট এই রেস্তোরাঁটি বিশ্বের অন্যতম ব্যয়বহুল এবং প্রভাবশালী ফাইন-ডাইনিং স্পট। আর্জেন্টিনা বুয়েনস আইরেস অবস্থিত ‘ফগন আসাদো’- বিশ্বখ্যাত ভ্রমণ প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রিপ এ্যাডভাইজার’ -এর ২০২৬ ট্রাভেলার্স চয়েস ‘বেস্ট অব দ্যা বেস্ট’ তালিকায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো এটি বিশ্বের সেরা ফাইন-ডাইনিং রেস্তোরাঁ নির্বাচিত হয়েছে। যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে শহরের ‘ইকয়ী’-ফুড অ্যান্ড ওয়াইন ম্যাগাজিনের ২০২৬ টেস্টমেকার অ্যাওয়ার্ডসে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এবং সাহসী স্বাদের ফাইন-ডাইনিং অভিজ্ঞতার জন্য বিখ্যাত এ রেস্তোরাঁটি বিশ্বব্যাপী এক নম্বর স্থান অধিকার করেছে।
বাংলাদেশ একটি ক্রমবর্ধমান অর্থনীতির দেশ, যেখানে অর্থনীতির আধুনিকায়নের সাথে সাথে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বাংলাদেশ সেবা ও শিল্পখাতমুখী অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) সেবাখাত প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে এবং এর অবদান প্রায় ৫১ থেকে ৫৩ শতাংশ। জিডিপি’র সেবাখাতগুলোর মধ্যে ‘হোটেল ও রেস্টুরেন্ট’ একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত। বর্তমান সময়ে রেস্তোরাঁ শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম দ্রুত বিকাশমান সেবা খাত। নগরায়ন, জীবনযাত্রার পরিবর্তন,মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি, অনলাইন খাবার অর্ডার ব্যবস্থার প্রসারের ফলে এ শিল্পে প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশ্বায়নের প্রভাব, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের রেস্তোরাঁ শিল্প বা ফুড অ্যান্ড বেভারেজ সেক্টর বর্তমানে এক অভূতপূর্ব জোয়ার এসেছে। আন্তর্জাতিক ফুডচেইন কেএফসি, পিৎজা হাট, বার্গার কিং, ডমিনোস, কিংবা গ্লোরিয়া জিন্সের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, বগুড়া, এবং কক্সবাজারের মতো বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতেও দ্রুত নিজেদের আউটলেট সম্প্রসারিত করছে। পাশাপাশি দেশীয় উদ্যোক্তাদের হাত ধরে সুলতানস ডাইন, কাচ্চি ভাই, চিলিস, কিংবা বিভিন্ন ক্যাফে চেইন গড়ে উঠেছে; করপোরেট স্টাইলে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল ব্যবহার করে তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে এবং মানের দিক থেকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সাথে পাল্লা দিচ্ছে। এই খাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম (যেমন ফুডপান্ডা, পাথও ফুড) এবং সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং বড় ভূমিকা রাখছে। এই খাতের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ রেস্তোরাঁ ব্যবসাকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। তারা প্রথাগত চিন্তার বাইরে গিয়ে ইউনিক থিম, কন্টিনেন্টাল মেনু, এবং উন্নত কাস্টমার সার্ভিসের ওপর জোর দিচ্ছেন। তরুণদের এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ফুড ইন্ডাস্ট্রিকে আরও আধুনিক এবং আন্তর্জাতিক মানের করে তুলছে। ফলে কর্মসংস্থান বেড়েছে এবং স্বাস্থ্য সচেতনতাও বেড়েছে। ‘আপটার্ন’-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশের রেস্তোরাঁ ও খাদ্য পরিষেবা বাজার ২০২৪ সালে ছিল ৩.৭৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; যার আকার সময়ের সাথে খুব দ্রুত গতিতে বাড়ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রেস্তোরাঁ খাত কেবল ক্ষুধা মেটানোর মাধ্যম নয়, বরং এটি দেশের অন্যতম সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল এবং গতিশীল একটি অর্থনৈতিক খাত। এগুলো একটি প্রাণবন্ত ব্যবসায়িক ইকোসিস্টেম, যেখানে স্বাদ, অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তি এবং উদ্যোক্তাসুলভ মানসিকতার এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটে। ভোক্তাদের রুচির পরিবর্তন এবং মানুষের হাতে খরচযোগ্য আয় বৃদ্ধির ফলে এই শিল্পে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।  এখন রেস্তোরাঁ কেবলই খাওয়ার জায়গা নয়, বরং এটি বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের সাথে সময় কাটানো, আড্ডা দেওয়া বা ব্যবসায়িক মিটিংয়ের প্রধান সামাজিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ভোক্তারা এখন শুধু ভালো খাবারই চান না, বরং রেস্তোরাঁটির পরিবেশ, অভ্যন্তরীণ নকশা ও সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং পরিবেশনের নান্দনিকতাকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। গত কয়েক বছরে এই শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে; নতুনত্ব সংযোজিত হয়েছে । রাস্তার ধারের ছোট দোকান বা পারিবারিক ক্যাফে থেকে বেরিয়ে এসে এখন গড়ে উঠেছে পেশাদার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত কুইক-সার্ভিস চেইন, অভিজ্ঞতা-নির্ভর ভোজনব্যবস্থা এবং ক্রমবর্ধমান ডেলিভারি ইকোসিস্টেম। ফলস্বরূপ, খাদ্যসেবা শিল্পটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক পরিচালিত ‘হোটেল ও রেস্টুরেন্ট জরিপ-২০২১’ অনুযায়ী ২০২১ সালে মোট হোটেল ও রেস্টুরেন্ট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ছিল ৪.৩৬ লক্ষ,  যার সংখ্যা ২০০৯-১০ জরিপে ছিল মাত্র ২.৭৫ লক্ষ। গত কয়েক বছরে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে আমাদের রেস্তোরাঁ ব্যবসা যে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে, তা থেকে আমাদের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে। ‘হোটেল ও রেস্টুরেন্ট জরিপ-২০২১’ অনুযায়ী ২০২১ সালে ২০.৭২ লাখ মানুষ এসব হোটেল ও রেস্তোরাঁতে কর্মরত ছিলেন যা পূর্বের জরিপে ছিল মাত্র ৯.০৪ লাখ। ২০২১ সালে এসব হোটেল ও রেস্তোরাঁ কর্মরত এর মধ্যে ১৯.৭০ লক্ষ ছিল পুরুষকর্মী ( ৯৫.১৪%) এবং ১.০০৭ লক্ষ মহিলা কর্মী ( ৪.৮৬%)। বাংলাদেশের জিডিপিতে সময়ের সাথে সাথে হোটেল ও রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠানের অবদান বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৯-১০ সালে এ উপখাতে স্থূল মূল্য সংযোজন হিসাব করা হয়েছিল ১১৯৮৬১ মিলিয়ন টাকা, যা ২০১৯-২০ এসে দাড়িয়েছিল ৩৮৭০৩৬ মিলিয়ন টাকায়।  এই সময়ের মধ্যে গড় মূল্য সংযোজন প্রায় ৩.২৩ গুন বেড়েছে।  ২০২১ সালে হোটেল,  ক্যাম্পিং সাইট এবং অন্যান্য স্বল্পকালীন আবাসনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের গড় মূল্য সংযোজন হয়েছে ৩২১১.৫৯ হাজার টাকা এবং রেস্তোরাঁ,  বার ও ক্যান্টিন ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের গড় মূল্য সংযোজন হয়েছে ৮৬৮.৫০ হাজার টাকা। রেস্তোরাঁ শিল্পে উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু করে সরবরাহ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাবার পরিবেশনের মতো পর্যায়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকে। ফলে বিভিন্ন স্তরে দক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্হানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সময়ের সাথে সাথে বাংলাদেশে রেস্তোরাঁ ও ফাস্ট ফুড ব্যবসার ব্যবসায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। আধুনিক তরুণ সমাজ এখন প্রথাগত খাবারের চেয়ে দ্রুত প্রস্তুতকৃত এবং স্বাদযুক্ত খাবারের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে। বাজারের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে কুইক-সার্ভিস রেস্টুরেন্ট এবং চেইন শপ, যা মোট খাতের প্রায় ৩৫.৬৮% দখল করে আছে । এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার ফলে দেশের রেস্তোরাঁ শিল্পে তরুণ পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের রুচির কথা মাথায় রেখে এখন দেশীয় খাবারের পাশাপাশি ইতালিয়ান, মেক্সিকান, জাপানিজ, কোরিয়ান এবং ফিউশন খাবারের রেস্তোরাঁ ও ক্যাফে ব্যাপকভাবে গড়ে উঠছে। কর্মব্যস্ত শহুরে জীবনে ফুডপান্ডা, পাথাও ফুডের মতো ডেলিভারি অ্যাপের জনপ্রিয়তার কারণে ‘ক্লাউড কিচেন’ (যেখানে কোনো বসার জায়গা বা ডাইনিং রুম থাকে না, শুধু অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে ফুড ডেলিভারি দেওয়া হয়) মডেলটি কম পুঁজি ও কম ঝুঁকিতে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। তরুণদের আকর্ষণ করতে কম খরচে ভালো মানের খাবার (যেমন: স্ট্রিট ফুড কার্ট, সাশ্রয়ী কম্বো অফার) এবং আকর্ষণীয় অন্দরসজ্জা সংবলিত ক্যাফে তৈরি হচ্ছে, যা আড্ডার জন্য উপযুক্ত। বাংলাদেশের রেস্তোরাঁ শিল্পের মধ্যে ক্লাউড কিচেন বা ভার্চুয়াল কিচেন খাতটি বর্তমানে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নয়ন-যেমন মোবাইল পেমেন্ট ব্যবস্থা, ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম এবং অনলাইনে খাবার অর্ডার করার সুবিধা-গ্রাহকদের জন্য খাবার প্রাপ্তিকে আরও সহজ ও সুবিধাজনক করে তুলেছে। ঢাকায় গণ-ব্যবহারযোগ্য উন্মুক্ত স্থানের অভাব প্রকট; তাই অনেকেই এখন বিনোদন বলতে বাইরে খাওয়া-দাওয়া করাকেই বোঝেন। এমন মানুষের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, যারা বিভিন্ন ধরনের খাবার চেখে দেখতে পছন্দ করেন। বর্তমানে রেস্তোরাঁগুলোতেও খাবারের বিশাল বৈচিত্র্য রয়েছে-সেখানে চাইনিজ, ভারতীয়, থাই, জাপানি, কোরিয়ান, আরবি, তুর্কি ও অন্যান্য নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায়। অনেক বড় রেস্তোরাঁয় এখন শিশুদের খেলার জায়গাও থাকে।
বাংলাদেশের রেস্তোরাঁ ও খাদ্যসেবা খাতের এই দ্রুত রূপান্তরের মূলে রয়েছে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ভিত্তি, বাণিজ্যিক সাফল্যের আকাক্সক্ষা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি। যেকোনো খাদ্য ব্যবসার ভিত্তি হলো তার স্বাদ। এটিই ব্যবসার আসল চাবিকাঠি। তাই রেসিপি ও রান্নার প্রক্রিয়াকে এমন একটি স্ট্যান্ডার্ড বা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে, যাতে প্রতিটি আউটলেটে এবং প্রতিদিন একই স্বাদের খাবার পাওয়া যায় (যেমনটি ম্যাকডোনাল্ডস বা কেএফসি করে থাকে)। এই ধারাবাহিকতাই গ্রাহকের ভরসা তৈরি করে এবং ব্যবসাকে বড় করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে রেস্তোরাঁ ব্যবসার খাতটির সমৃদ্ধ হওয়ার বেশ কিছু সুযোগ রয়েছে। মানুষের ব্যয়যোগ্য আয় বৃদ্ধি, নগরায়ণ, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, ভোক্তাদের পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তন এবং ভ্রমণের প্রবণতা বৃদ্ধি-এমন কিছু সুযোগ রয়েছে যা কাজে লাগিয়ে রেস্তোরাঁ ব্যবসাগুলো বিকশিত হতে পারে। রেস্তোরাঁগুলোকে তাদের কার্যক্রমের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। অনেক তরুণ উদ্যোক্তা হচ্ছেন, তবে নিয়ন্ত্রণ বা শৃঙ্খলার অভাবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। রেস্তোরাঁ ব্যবসায় খাদ্য নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতাই নয়, এটি ব্যবসার ব্র্যান্ড ভ্যালু ও গ্রাহকের আস্থা অর্জনের প্রধান হাতিয়ার।যাঁরা ব্যবসায় আসবেন, তাঁদের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি ও ব্যবসা পরিচালনার মৌলিক বিষয়গুলো জানতে হবে। প্রশিক্ষণ ও সনদের ব্যবস্থা থাকলে অদক্ষতা কমবে এবং নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করা সহজ হবে। রেস্তোরাঁ খাতের টেকসই উন্নয়নে একটি সমন্বিত নীতিমালা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি একক কোনো ব্যবসা নয়, বরং কৃষি, কর্মসংস্থান, সরকারের রাজস্ব এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। ভোক্তাদের জন্য মানসম্মত, স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে রেস্তোরাঁ ব্যবসা অর্থনীতির জন্য সব বিবেচনায় লাভজনক হবে।
লেখকঃ গবেষক, কলাম লেখক, সমাজকর্মী এবং একজন সরকারি কর্মচারী।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২