
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনষ্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে দেশে আবাদি, নদী, লেক, বনভূমি, সুন্দরবন, সংরক্ষিত বনাঞ্চল ইত্যাদি এলাকা মিলিয়ে জমির পরিমান ১ কোটি ৪৭ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর। উদ্ভিদের বেঁচে থাকা এবং জীবনচক্র সম্পূর্ণ করতে ১৬টি পুষ্টি উপাদান অবশ্যই প্রয়োজন। এসব পুষ্টি উপাদানে রয়েছে Ñকার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, অক্সিজেন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, আয়রন, সালফার, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক, ম্যাঙ্গানিজ, কপার, বোরন, মলিবডেনাম, কোবাল্ট ও ক্লোরিন। ক্রমাগত হারে ফসল চাষ করার ফলে মাটি থেকে গাছের জন্যে প্রয়োজনীয় উপাদানগুলো আস্তে আস্তে কমে একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। তাই টেকসই মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
উৎপাদানশীলতা বৃদ্ধি পেলে মালিক, শ্রমিক, ভোক্তা এমনকি সরকারও তার সুফল পেয়ে থাকে। দক্ষতার সঙ্গে এবং কম খরচে পণ্য বা সেবা উৎপাদনে মালিক পক্ষের চাহিদা থাকে সব সময়েই। উৎপাদনে খরচ কম হওয়াতে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যে পণ্য বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে করে মুনাফার পরিমাণ বেড়ে যায়। পণ্যের গুণগত মান উন্নত হলে ভোক্তাশ্রেণি খুব সহজে উৎপাদিত পণ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতির কারণে সারা পৃথিবীতে যাদের উৎপাদনশীলতা বেশি তারাই বাজারে টিকে থাকছে বেশ ভালোভাবে এবং লাভবান হচ্ছে। কারণ ১০ সে.মি. মাটির উন্নয়ন করতে প্রায় ২০০০ বছর সময় লাগে। প্রভাবশালী সাময়িকী ফোর্বস লিখেছে “পৃথিবীতে খুব দ্রুত মাটির গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার খবর মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যে নিঃসন্দেহে খারাপ খবর। পুষ্টিকর ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন ভাল ও সুস্থ মাটি। বর্তমানে পৃথিবীর প্রায় ৩৮ শতাংশ ভূপৃষ্ঠ কৃষিকাজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে। জাতিসংঘের মৃত্তিকা সম্পদ পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত প্রতিবেদন (২০১৫) অনুযায়ী মাটি নষ্ট হওয়াকে পরিবেশ ও কৃষির জন্যে বড় ধরনের হুমকি বলে অভিহিত করা হয়েছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসেবে ইতিমধ্যে বিশে^র ৩৩ শতাংশ মাটি অবক্ষয় সাধিত বা ডিগ্রেডেড হয়েছে যা উদ্বেগজনক।
উৎপাদনশীলতার সঙ্গে জড়িত রয়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার মান, অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে নৈপুণ্য এবং প্রতিষ্ঠানিক কার্যাবলির গুণমান। উৎপাদনশীলতা হল একধরনের ক্ষমতা বা গুণ, মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি এবং সময়মত ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়া। গাণিতিকভাবে উৎপাদনশীলতা বলতে উৎপাদন ও উপাদান Ñএ দুয়ের অনুপাতকে বুঝায়। সামাজিকভাবে গতকালের চেয়ে আজকের দিন আরো ভাল এবং আজকের চেয়ে আগামীকাল আরো ভাল যাবে Ñএ ধরনের চিন্তা ভাবনা এবং সেইভাবে কাজ করাই হল উৎপাদনশীলতা। আসলে উৎপাদনশীলতা সম্পদের দক্ষ এবং কার্যকরী ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল। সম্পদের দক্ষ ও কার্যকরী ব্যবহার যত বেশী হবে উৎপাদনশীলতা তত বৃদ্ধি পাবে। আধুনিক যুগে জাতীয় উন্নয়নের প্রশ্নে উৎপাদনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিযোগীতাময় বিশে^ উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ছাড়া কোন শিল্পই টিকে থাকতে পারে না। শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারনের ক্ষেত্রেও উৎপাদনশীলতা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়। শ্রমিকরা মজুরি বাড়ানোর কিংবা অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধির দাবি তুললে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ স্বাভাবিকভাবেই তাদেরকে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কথা বলে থাকেন। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেলেই শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো সম্ভব হয়। যার সুবাদে প্রতিষ্ঠানও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যায় এবং লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছে যে কারণে শ্রমিক পক্ষ এবং মালিক পক্ষ উভয়কেই উৎপাদনশীলতা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতে হবে।
বাংলাদেশ একটি লোকালয়পূর্ণ জনবহুল দেশ। বিপুল জনসংখ্যার খাদ্যচাহিদা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টন। আগামী ২০ বছরে ক্রমবর্ধমান এ জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি করতে হবে। দেশে নিট ফসলী জমি ৭৯ লাখ ৪৭ হাজার হেক্টর, যা আগামী দিনের খাদ্য উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশে শস্যের একর প্রতি উৎপাদন অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। এছাড়া নতুন খরকড়ি, শিল্প প্রতিষ্ঠান ও রাস্তাঘাট তৈরি, লবনাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙ্গনসহ অন্যান্য কাজে অবদানযোগ্য জমি বছরে প্রায় ৬৯ হাজার হেক্টর কমে যাচ্ছে। এরকম এক পরিস্থিতিতে ক্রমাগত ফসল ফলানোর কারণে এবং মাটিকে যথাযথভাবে ব্যবহার না করায় উর্বরতা শক্তি নষ্ট হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবনাক্ততা বৃদ্ধি ইটভাটার জন্য মাটির উপরিভাগের পুষ্টিকর অংশ তুলে নেয়া ছাড়াও মাটির টেকসই ব্যবস্থাপনার অভাবে ফসলের পুষ্টি উপাদানের ঘাটতির ফলে মৃত্তিক সম্পদ এখন হুমকির মুখে রয়েছে।
এফএও ২০২৬ এর মতে বিশে^ ও বিলিয়নেরও বেশি মানুষ একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করতে সক্ষম নয়, যাহা বিশে^র জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ। প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষ দূর্বল খাদ্য এবং সেডেনটারি জীবনযাত্রার কারণে অতিরিক্ত ওজনে স্থূলকায় আকৃতিতে ভোগে। বিশে^র কৃষিখাদ্য ব্যবস্থায় বর্তমানে ১ বিলিয়ন মানুষের কর্মসংস্থান করা হয়ে থাকে, যা অন্য যে কোন সেক্টরের চেয়ে বেশি। দরিদ্র এবং অর্থ, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ, সম্পদের অ্যক্সেসের অভাবে বহু চ্যালেঞ্জ স্বত্তেও ক্ষুদ্র চাষিরা বিশে^র খাদ্যের ৩৪ শতাংশের বেশি উৎপাদন করেন। অপর্যাপ্ত ফসলকাটা, ট্রানজিট, হ্যান্ডলিং ও ষ্টোরেজের কারণে বিশে^র ১৪ শতাংশ খাদ্য নষ্ট হয় এবং ১৭ শতাংশ ভোক্তা পর্যায়ে নষ্ট হয়। বিশে^র জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ শহরে বসবাস করে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এটি ৬৮ শতাংশে উন্নীত হবে। ১০ শতাংশ মানুষ ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস, পরজীবি বা রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা দূষিত অনিরাপদ খাদ্য সরবরাহে আক্রান্ত হয়। (সুতরাং একটি টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা একান্ত দরকার)
জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করার অন্যতম পথ অর্থনীতির প্রতিটি খাতের কর্মকান্ডে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা যার গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমান বিশে^ সব রাষ্ট্র ব্যবস্থায় উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে জাতীয় আন্দোলন হিসাবে স্বীকৃত দিয়ে যাচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় শিল্পনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদনশীলতা কার্যক্রমকে Ñধারাবাহিক ও পদ্ধতিগতভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করছে। শিল্প বিকাশের জন্য যেমন নতুন শিল্পকারখানা সৃজনের দরকার, তেমনি এসব কারখানায় দক্ষতা ও মুনাফা বৃদ্ধি করে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের জন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিও একান্তভাবে অপরিহার্য। পাশাপাশি এটাও স্মরণ রাখতে হবে একটি টেকসই, কৃষিখাদ্য ব্যবস্থা হল এমন একটি ব্যবস্থা, যাতে বিভিন্ন ধরনের পর্যাপ্ত পুষ্টিকর ও নিরাপদ খাবার সবার কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে যায় এবং কেউ ক্ষুধার্ত বা অপুষ্টিতে না ভোগে।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
