
কেন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গার্মেন্ট শিল্পাঞ্চলগুলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সবাই। গত কয়েকদিনে শ্রমিকরা নেমে এসেছেন রাস্তায়, সংঘর্ষ হচ্ছে পুলিশের সঙ্গে, মালিকরা একের পর এক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করছে। মিরপুর, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ায় বিক্ষোভ, অবরোধ ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ শ্রমিকদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ এবং লাঠিচার্জ করেছে। এতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বৃহৎ কয়েকটি গার্মেন্ট কারখানা বন্ধ ঘোষণায় এই খাতে উত্তেজনার পাশাপাশি আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। শ্রমিকদের অসন্তোষের সূত্রপাত বকেয়া মজুরি নিয়ে। উত্তরাসহ কয়েকটি অঞ্চলে কয়েক মাসের মজুরি বকেয়া রয়েছে–এমন অভিযোগ তুলে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মজুরি বোর্ড ঘোষণা এবং নিম্নতম মজুরি ঘোষণার দাবি।
পরিস্থিতি প্রতি মুহূর্তেই পাল্টাচ্ছে। দেশের তিন শিল্প অধ্যুষিত মিরপুর, গাজীপুর-ময়মনসিংহ, সাভার-আশুলিয়ায় বিজিএমইএর আওতাধীন ২ হাজার ১৩৪টি কারখানার মধ্যে সচল ছিল ১ হাজার ৮১৬টি। তবে শ্রম অসন্তোষের জেরে ৭৭৯টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে নারায়ণগঞ্জ এলাকাতেও। এর আগে ঢাকা মহানগরীর মিরপুরে শ্রমিকরা কাজ না করে বেরিয়ে গেলে ৬৮টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। এসব কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা ৫১ হাজার ৬২৫। গাজীপুর ও ময়মনসিংহ এলাকায় ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ২৭৬টি কারখানার ৬ লাখ ৪৫ হাজার ৩৬০ শ্রমিক অসন্তোষের কারণে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। সাভার, আশুলিয়া ও জিরানী এলাকায় ৪৪১টি কারখানার মধ্যে ১৮৫টির শ্রমিকরা কাজ না করে বেরিয়ে যান। এ এলাকায় কাজ করেননি মোট ২ লাখ ৯০ হাজার ২০৫ শ্রমিক। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ শ্রমিক এখন কারখানার বাইরে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন শিল্প মালিকরা। মালিকদের সংগঠন বলেছে অবস্থার উন্নতি না হলে শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী ‘কাজ নেই, মজুরি নেই’ নীতিতে কারখানা বন্ধ রাখার বিষয়টি তারা বিবেচনা করবেন।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশের শ্রমিকদের মজুরি বিশ্বের পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। পোশাক শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি গত দুই দশকে কয়েক দফায় পুননির্ধারণ করা হয়েছে। ২০০৬ সালে নিম্নতম মজুরি ছিল ১ হাজার ৬৬২ টাকা ৫০ পয়সা। ২০১০ সালে তা বাড়িয়ে ৩ হাজার, ২০১৩ সালে ৫ হাজার ৩০০, ২০১৮ সালে ৮ হাজার এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি সাড়ে ১২ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, যা ওই বছরের ডিসেম্বরে কার্যকর হয়েছিল। তারপর দ্রব্যমূল্য আর জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকরা।
ফলে এখন ওভারটাইম না করলে সংসার চলে না, বাজার হয় না, আবার ওভারটাইম করলে শরীর চলে না, জীবন বলে কিছু থাকে না। পোশাকশ্রমিকরা ওভারটাইম করে বাঁচার জন্য, সংসার আর চাকরি রক্ষা করতে বেঁচে থাকে ওভারটাইম করার জন্য। পোশাকশ্রমিকদের জীবন যেন এই চক্রে বাঁধা। গার্মেন্টের নারী শ্রমিকদের ঘুম ভাঙতে হয় ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে। উঠেই প্রথমে তাদের কাজ চুলায় ভাত বসানো, রাতে রান্না করা তরকারি গরম করা। সন্তানকে ঘুমের মধ্যেই খাইয়ে দিয়ে প্রায় এক দৌড়ে বাসস্ট্যান্ড নাহলে দৌড়ের মতো করে হেঁটে ফ্যাক্টরিতে পৌঁছানো। মাথায় কাজ করে এই চিন্তা যে, কারখানায় ঢুকতে পাঞ্চিং মেশিনে আঙুল রাখতে হবে সকাল ৭টা ৫৯ মিনিটে। ডিজিটাল ব্যাপার। এক মিনিট দেরি হলেই হাজিরা কাটা।
আইনে যাই থাকুক এরপর ১২ ঘণ্টার টানা ক্লান্তিকর কাজ। এই দৈনিক রুটিন দেশের ২৫ লাখের বেশি নারী শ্রমিকের যারা কাজ করেন গার্মেন্টে। বাংলাদেশের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ পোশাক শ্রমিকের ৫৫ শতাংশ নারী। পুরুষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে রান্না ও সন্তান সামলানোর কাজ বাদ দিলে বাজার করা এবং অন্যান্য কাজসহ প্রতিদিনের রুটিন প্রায় একই রকম। এই শ্রমিকদের হাতে সেলাই, আয়রন ও প্যাকেট করা পোশাকের গায়ে থাকা ‘গধফব রহ ইধহমষধফবংয’ ট্যাগ বিশ্ব গর্বের সঙ্গে বহন করে। কিন্তু তাদের নিজেদের জীবনই আটকে আছে একটি দৃশ্যমান চক্র ও অদৃশ্য শোষণের জালে। ছুটতে ছুটতে বাসায় আসা, দৌড়ে ফ্যাক্টরিতে হাজির হওয়া, একনাগাড়ে কাজ করা, ঘুম–প্রতিদিন একই চিত্র, যত দিন চাকরিটা থাকে।
পোশাকশ্রমিকদের কত ঘণ্টা কাজ করতে হয়? শ্রম আইনে আছে আট ঘণ্টা, বাস্তবে খাটতে হয় ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত।
আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ১০০ ধারা অনুযায়ী, দৈনিক কর্মঘণ্টা হবে আট ঘণ্টা, ১০৮ ধারা অনুযায়ী ওভারটাইমসহ সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা। আইনে আছে ওভারটাইম করলে সাধারণ হারের তুলনায় দ্বিগুণ হারে মজুরি পাবেন। আইনের ১০২ ধারা অনুযায়ী, সরকার লিখিত আদেশ দ্বারা এককালীন ছয় মাস পর্যন্ত বিধান শিথিল করতে পারে। সরকার ২০২৪ সালে বিশেষ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে রপ্তানিমুখী কারখানার জন্য আরও দুই ঘণ্টা ওভারটাইম বাড়িয়ে দেয়। সেই ছয় মাস এখনো শেষ হয়নি। অর্থাৎ এখন আইনিভাবেই একজন শ্রমিক দিনে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য হতে পারেন, তাহলে সপ্তাহে কাজ করতে হয় ৭২ ঘণ্টা। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, একজন শ্রমিক মাসে আইনের চেয়ে ২৮ ঘণ্টা বেশি কাজ করেন এবং অর্ধেকের বেশি সপ্তাহে তারা আইনি সীমা ৬০ ঘণ্টার চেয়েও বেশি সময় কারখানায় থাকেন।
পোশাকশ্রমিকের মাসিক বেতন কত? সরকারের সর্বশেষ মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে একজন প্রারম্ভিক পোশাকশ্রমিকের সর্বনিম্ন মোট মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। সাতটি গ্রেডে মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছিল। গ্রেড-১-এ সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ৩৫ টাকা। ইপিজেডের ক্ষেত্রে এটি দাঁড়ায় ১২ হাজার ৮০০ টাকা। এই মজুরি দিয়ে কেমন জীবনযাপন করা যায়? অনেকে বলেন, ওভারটাইম করে কেউ কেউ ১৯ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পান, কিন্তু তারা বিবেচনা করেন না, এর জন্য দিনে শ্রমিকদের কত ঘণ্টা কাজ করতে হয়। দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করলে জীবন বলতে আর কিছু কি থাকে?
গাজীপুর, আশুলিয়া ও সাভারে এক রুমের টিনশেড বাসার ভাড়াই এখন ৭ হাজার টাকা। মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা অর্থাৎ দিনে ৪১৬ টাকা।
বাসাভাড়া বাদ দিলে থাকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা বা দৈনিক হাতে থাকে ১৮৩ টাকা। বাজারে এক কেজি মোটা চালের দাম ৭০ টাকা। এক কেজি চাল কেনার পর হাতে থাকে ১১৩ টাকা। মাসে বিদ্যুতের বিল, রান্নার খরচ, যাতায়াত খরচ, মোবাইল বিল ইত্যাদি কত খরচই না আছে! সেগুলো মেটাবে কীভাবে?
এক কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ২১০ টাকা। অন্য মাছ বাদ দিয়ে এক কেজি পাঙাশ মাছের দাম ২০০ টাকা। অর্থাৎ, এক দিনের পুরো মজুরি দিয়েও এক কেজি মুরগি বা পাঙাশ মাছ কেনা কঠিন। এক ডজন ডিমের দাম ১৪৫ টাকা। মসুর ডালের দাম কেজিপ্রতি ১৪০ টাকা, আর এক লিটার তেলের দাম ১৭৫ টাকা। তাহলে সপ্তাহে এক দিন মাছ বা মুরগি খেতে চাইলেও সংসারের অন্যান্য খরচ অনেক কমাতে হয়।
অর্থনীতিতে দয়ামায়া বলে কিছু নেই। এখানে আছে শুধু অঙ্কের হিসাব। যে গতিতে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ছে, শ্রমিকের মজুরি সে অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে মূল্যবৃদ্ধি ও মজুরির ব্যবধান বেড়েছে ক্রমাগত।
এই ব্যবধান কমাতে হবে। দমনপীড়ন নয়, ষড়যন্ত্র খোঁজা নয়, সংকটের সমাধান করতে হবে। মজুরি যুক্তিসংগত করা, শ্রমিকদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা করা, সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করা আর মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। যে গার্মেন্ট খাত দেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশ জোগান দেয়, তাকে আর কতদিন সস্তা শ্রমিক, অদক্ষ শ্রমিকের খাত বলে বিবেচনা করা হবে? অসন্তোষের মূল কারণ স্বল্প মজুরি, অতিরিক্ত পরিশ্রম আর বৈষম্য বৃদ্ধি। নজর দিতে হবে এখানে।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
