প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ৪১ হাজার ৯০ কোটি টাকার পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচিসহ (পিইডিপি-৫) ১৩টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)।
অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পগুলোর মোট ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশিই এই একটি কর্মসূচির। পুলিশের জন্য যানবাহন কেনা ও তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে দুটি নতুন কূপ খননের প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পগুলো অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ষষ্ঠ এবং বর্তমান সরকারের ১১তম একনেক সভা। অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে ১১টি নতুন, বাকি ২টি সংশোধিত।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ১৩টি প্রকল্পের মোট ব্যয় ৫৮ হাজার ৮৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা বলা হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রকল্পভিত্তিক তালিকা যোগ করলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৫৮ হাজার ২৬৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা। তিতাসের কূপ খনন প্রকল্পে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) নিজস্ব অর্থায়নের ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা মোট হিসাবে ধরা হয়নি।
মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে আসবে ৫০ হাজার ৪১ কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রকল্প ঋণ ৭ হাজার ৯৭৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ ঋণের পরিমাণ মোট ব্যয়ের ১৪ শতাংশের কম। বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে দেবে ২৫০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
প্রাথমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বড় বরাদ্দ
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর পঞ্চম প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে। চলতি বছরের জুলাই থেকে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদের এই কর্মসূচিতে সরকার দেবে ৩৩ হাজার ২০৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা। বাকি ৭ হাজার ৮৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা আসবে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণ থেকে। আজ অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মোট ঋণের প্রায় ৯৯ শতাংশই এই কর্মসূচির।
২০১৮ সালে শুরু হওয়া চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির (পিইডিপি-৪) ব্যয় ছিল ৩২ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। সে তুলনায় পঞ্চম কর্মসূচির ব্যয় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। ১৯৯৭ সাল থেকে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ধাপে ধাপে এ ধরনের খাতভিত্তিক কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের যানবাহনে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা
বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বাড়াতে যানবাহন কেনার দুটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এর একটির আওতায় বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হবে, ব্যয় ২ হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অন্যটিতে অপারেশনাল যানবাহন কেনা হবে, ব্যয় ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। দুই প্রকল্পেমোট ব্যয় ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা, যা আজকের মোট অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ১১ শতাংশ। পুরো টাকাই দেবে সরকার। প্রকল্প দুটি চলতি অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে।
তিতাসে দুই কূপ খনন
তিতাস গ্যাসক্ষেত্রে তিতাস-৩২ ও তিতাস-৩৩ নামে দুটি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন করবে বিজিএফসিএল। পেট্রোবাংলার এই কোম্পানির প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ৪১৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা, আর বিজিএফসিএল দেবে ১৭৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ চলতি অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
স্থানীয় সরকারের পাঁচ প্রকল্প
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। এগুলোর মোট ব্যয় ৮ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার বেশি।
এর মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলে নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রকল্পে ব্যয় হবে ১ হাজার ২০৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন খালের পাড় সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার ও পুনঃখননের প্রথম পর্বে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৩০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সিটি করপোরেশন নিজে দেবে ৭৩ কোটি ৭ লাখ টাকা।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বাস্তবায়ন করবে তিনটি প্রকল্প। সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে (এসআইডিপি) ব্যয় ২ হাজার ৫৬৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ‘ইনোভেশন ফর ক্লাইমেট স্মার্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পে ব্যয় ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, যার পুরোটাই আসবে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে।
দুই প্রকল্পে মেয়াদ বাড়ল ৬-৭ বছর
তৃতীয় দফা সংশোধনের মাধ্যমে ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩’-এর ব্যয় ৩ হাজার ৯৫১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৪৭৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। ২০২০ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৬ হাজার ৪৭৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ মূল ব্যয়ের তুলনায় খরচ বেড়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ। প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে, অর্থাৎ মূল মেয়াদের চেয়ে সাত বছর বেশি।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের ‘গ্রামীণ রাস্তায় ১৫ মিটার দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সেতু/কালভার্ট নির্মাণ প্রকল্প’ও তৃতীয়বারের মতো সংশোধন করা হয়েছে। এতে ব্যয় বেড়েছে ৫২৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। মূল ব্যয় ছিল ৬ হাজার ৫৭৮ কোটি ২০ লাখ টাকা। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। এখন মেয়াদ বেড়ে হয়েছে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত।
অন্য প্রকল্প
বাকি প্রকল্পগুলোর মধ্যে দেশের পাঁচটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) স্থাপনে ব্যয় হবে ৫৩৫ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
এছাড়া ঢাকার জিগাতলার গাবতলা কলোনিতে সরকারি কর্মচারীদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণে ব্যয় হবে ২০০ কোটি ১২ লাখ টাকা। ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোড আবাসিক এলাকায় সেনা কর্মকর্তাদের ‘বি’ টাইপ বাসস্থান নির্মাণে ব্যয় হবে ১৭৭ কোটি ২০ লাখ টাকা।
সভায় পরিকল্পনামন্ত্রীর আগেই অনুমোদন দেওয়া ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের পাঁচটি প্রকল্পের বিষয়ে একনেককে জানানো হয়। এগুলো হলো দিনাজপুরের জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হৃদ্রোগ চিকিৎসাসেবা আধুনিকীকরণ, শিশু-কিশোরসহ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়নসহ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত), ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ (প্রথম সংশোধিত) এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক যান-যন্ত্রপাতি সংগ্রহ।
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ডাক, টেলিযোগাযোগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকিসহ সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
