বর্তমান সময়টা যেমন গোটা বিশ্ব জুড়ে কতৃত্ববাদের জোয়ার তেমনি ভাবে ৫০ এর দশক আর ষাটের দশক ছিলো সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জোয়ার। ’৪৭-এর দেশভাগের আগে ভারতবর্ষ বামদের জন্য এক উর্বর ভূমি হলেও পাকিস্তান কায়েমের পর ’৪৮ সনে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে জড়িত হয়ে শুরুতেই কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে যায়। তাদের উপর নেমে আসে এক অবর্ণনীয় নির্যাতন। ফলে কমিউনিস্ট পার্টিকে আন্ডার গ্রাউন্ডে থাকার পাশাপাশি শ্রমিক, কৃষক সাংস্কৃতিক সংগঠনের পরিচয়ে সংগঠিত হতে হয়েছে। এমনকি তারা কিছু দিন আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরেও কাজ করেছে। এমনিতর প্রেক্ষাপটে সময়ের দাবীতে বিপ্লবী কৃষক নেতা সত্যেন সেন ১৯৬৮ সনের ২৯ অক্টোবর মাসে প্রতিষ্ঠা করলেন সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী। তার সাথে সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন রণেশ দাশগুপ্ত। সত্যেন সেন প্রথম জীবনে কৃষক নেতা ছিলেন। আন্দোলন করতে যেয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ১৭ বছর কারাবরণ করেন। তার জন্ম মুন্সীগঞ্জ জেলার বিক্রমপুর উপজেলার সোনারং গ্রামে। এখানে প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে রাখি অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বিক্রমপুরের সোনারং গ্রাম থেকে একদল বিপ্লবী ইংরেজ গোয়েন্দাদের তাড়া খেয়ে কুমিল্লার উত্তর চর্থা এলাকায় এসে জমি ক্রয় করে আবাস গড়েন। সেই বাড়ীটিই হচ্ছে মুন্সেফ বাড়ী সোনারং কম্পাউন্ড। এ-ই বাড়ীতে বসবাস করতেন বিপ্লবী অতীন্দ্র মোহন রায়। কালক্রমে কুমিল্লার সোনারং কম্পাউন্ডটিও বিপ্লবীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিলো। সে অন্য ইতিহাস। উদীচী নামটি বেশ অর্থবহ। এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে উত্তরাকাশের উজ্জল তারা। যে জ্বল জ্বলে তারাটি সমস্ত অন্ধকারকে বিতাড়িত করে আলোক শিখা প্রজ্জলিত করবে। অধিকার, স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং সাম্য ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়ে গঠিত উদীচী বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী চেতনার আন্দোলনে এক ভ্যানগার্ডের ভূমিকা রেখে চলেছে। উদীচী প্রতিষ্ঠার সময়কে যদি আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখবো তখন একদিকে সমাজতান্ত্রিক শিবির চীনপন্থী রাশিয়াপন্থী দুই শিবিরে বিভক্ত অপরদিকে ছয়দফা ঘোষণার পর শেখ মুজিবের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধীকার আন্দোলন প্রবল বেগে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ছায়ানট তখন বাঙালি বোদ্ধাদের মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে। বলাই বাহুল্য রবীন্দ্র চর্চার নিষিদ্ধকরণ এর প্রতিবাদ করতে যেয়ে ছায়ানট ততদিনে জাতীয়তাবাদী ধারার প্রধানতম সাংস্কৃতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। কমিউনিস্টদের সাংস্কৃতিক সংগঠন গণনাট্য সংঘের আদলে এসময় সত্যেন সেন গড়ে তুললেন উদীচী। বামধারার সংগঠন হলেও চীনপন্থীদের খুব একটা উপস্থিতি আমরা এখানে দেখতে পাইনা। রাশিয়ান ব্লকের অনুসারীরাই এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলো। বাঙ্গালীর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ছায়ানট এবং উদীচী সহ সকল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন এসময় এক কাতারে মিলিত হয়। ছায়ানট রাজধানী কেন্দ্রীক হলেও উদীচী ছড়িয়ে পরে সারা দেশময়। বিশেষ করে তাদের গণসঙ্গীত সমূহ এসময় আন্দোলনের অগ্নিশিখার মতো কাজ করে। উদীচী যখন প্রতিষ্ঠিত হয় তখন কলকাতায় চারু মজুমদারের নকশালবাড়ী আন্দোলনের তুমুল প্রতাপ। সলিল চৌধুরী, হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর ভূপেন হাজারিকার গান তখন দুই বাংলার মানুষের মুখে মুখে। সুকান্ত আর সুভাষের কবিতায় মানুষ খুঁজে ফিরছে মুক্তির দিশা। তার ঢেউ এখানেও আছড়ে পরবে এটাই স্বাভাবিক। এসময়টুকু সত্যিকার অর্থেই আমাদের সাংস্কৃতিক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের সময়। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন তখন প্রথা বিরোধী ভাবে দুর্ভিক্ষের ছবি একে চিত্র কর্মকে নিয়ে গেছেন জনতার কাতারে। সুফিয়া কামাল, ওয়াহিদুল হক, সনজিদা খাতুনরা যেমন জাতীয়তাবাদী চেতনার জাগরণের মধ্য দিয়ে বাঙ্গালীর সাংস্কৃতিক ভীতকে প্রস্তুত করছেন তেমনিভাবে উদীচীর মাধ্যমে সত্যেন সেন, শহীদুল্লাহ্ কায়সার, জহির রায়হান, কামরুল হাসান, সুখেন্দু চক্রবর্তী, কুলেন্দু দাসরা বিপ্লবী ঝান্ডাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। গণ অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে শেখ মুজিব মুক্ত হলে সকল পথ সকল মত বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনের আকাংখায় এক মোহনায় মিলিত হয়। তখন জাতীয়তাবাদী চেতনা আর বিপ্লবী চেতনা একে অপরের পরিপূরক। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই ঘটে সাংস্কৃতিক জাগরণ। তাদের সম্মিলিত প্রয়াসের ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে উদীচীর নিজস্ব গানের অনেক গানই প্রচার হতো নিয়মিত ভাবে। বিশেষ করে কুমিল্লার ফেরদৌস হোসেন ভুইয়ার লেখা “হায়রে কিষাণ, তোদের এই শীর্ণ দেহ” বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। রবীন্দ্র-নজরুল চর্চার পাশাপাশি সুকান্ত, ডি এল রায়, চারণ কবি মুকুন্দ দাস, রাহাত খান, সত্যেন সেন, কেজি মুস্তাফা, রণেশ দাশ গুপ্তের গান কে উদীচী ছড়িয়ে দিয়েছে মাঠে ঘাটে। আইপিটিএ (ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার এসোসিয়েশন) এর বিপ্লবী গান সমুহ এই সংগঠনের সদস্যদের মুখে মুখে।
৫৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এবারের প্রতিপাদ্য স্লোগান হচ্ছে “সংগ্রাম শুরু করো মুক্তির, দিন নেই তর্ক ও যুক্তির”। সময়ের বিবেচনায় একেবারেই যথার্থ এবং সময়োপযোগী। আমাদের মনে রাখতে হবে রাজনীতি সংস্কৃতির একটা অংশ মাত্র। একটা মানুষের সামগ্রিক জীবন প্রণালীই হচ্ছে সংস্কৃতি। সংস্কৃতি-ই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। ’৫২ থেকে সাংস্কৃতিক জাগরণ তৈরী না হলে কখনোই ’৭১ আসতোনা। সাম্প্রতিক সময়ের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামোর পরিবর্তন ইপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারার কারণ ও একই। আজকের দিনে ধর্মতন্ত্র বা মৌলবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সময়ের দাবী। দার্শনিক লুকাসের একটি কথা এখানে প্রাসঙ্গিক “পঁষঃঁৎব রং ঃযব বহফ, ঢ়ড়ষরঃরপং রং ড়হষু ঃযব সবধহং” অর্থাৎ সংস্কৃতিই আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকতে হবে, রাজনীতি হবে সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করার একটি বাহন মাত্র। ১৯৪৮ থেকে সেই ধারাবাহিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফসল ’৭১ এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। আওয়ামীলীগ তার সাংস্কৃতিক চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলেই মৌলবাদের বিস্তার ঘটেছে, তাদের পতন হয়েছে।
সামনে ঘোর অন্ধকার। মৌলবাদ ধেয়ে আসছে। একে এখনই রুখতে না পারলে আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এজন্য উদীচীর প্রতিটি সদস্য কে এখনই মাঠে নামতে হবে। প্রস্তুতি নিতে হবে আসন্ন লড়াইয়ের। এই লড়াই দিন বদলের এই লড়াইয়ে জিততে হবে। কবি গুরুর ভাষায়
“যদি গহন পথে যাবার কালে কেউ ফিরে না চায়, তবে পথের কাঁটা ও তুই রক্ত মাখা চরণ তলে একলা দলো রে”
লেখক পরিচিতি
ইতিহাসবিদ, সাংস্কৃতিক সংগঠক
