শনিবার ● ২৪ অক্টোবর ২০২৬
৮ কার্তিক ১৪৩৩
দুটি গুণ মানুষকে বেহেশতে নিয়ে যায়
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম |

জান্নাত মুমিনের অতিরিক্ত পুরস্কার। মুমিনের আসল প্রতিদান হলো মহান আল্লাহর সান্নিধ্য বা দিদার। যে ব্যক্তি বা যাদের সঙ্গে মহান আল্লাহর দিদার হবে কিংবা যে মুমিন আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করবে তার জন্য ‘জান্নাত’ অতিরিক্ত পুরস্কার মাত্র।
নবীজিকে একবার  জিজ্ঞেস করা হলো, কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি বেহেশতে নিয়ে যাবে। তিনি উত্তর দিলেন, ‘আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র।’ আর সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বললেন, ‘মুখ ও লজ্জাস্থান।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০০৪)
এই হাদিস পরকালীন সফলতার জন্যসংক্ষিপ্ত ও কার্যকর একটি নির্দেশিকা। বেহেশতে যাবার জন্য প্রয়োজনীয় দুটি গুণের একটির সম্পর্ক আল্লাহর সঙ্গে, অন্যটির মানুষের সঙ্গে।
তাকওয়া বা খোদাভীতির অবস্থান কোথায়, মহানবী (সা.) তা নিজেই দেখিয়েছেন। বুকের দিকে ইশারা করে তিনি তিনবার বলেছেন, ‘তাকওয়া এখানে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
একই হাদিসে আছে, আল্লাহ মানুষের চেহারা ও সম্পদ দেখেন না; তিনি দেখেন অন্তর ও আমল।
কারও মন্দ হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে নিজের মুসলিম ভাইকে হেয় মনে করে। সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪
এ কারণে তাকওয়া সাধারণত প্রকাশ পায় না, বেশভূষা দেখে কারও তাকওয়া বোঝারও উপায় নেই। বাহ্যিক ধার্মিকতার আড়ালে প্রতারণার নজির সমাজে বিরল নয়।
কোরআনের নির্দেশনা তাই স্পষ্ট, ‘তোমরা নিজেদের পবিত্র বলে দাবি কোরো না। কে তাকওয়া অবলম্বনকরেছে, তিনিই ভালো জানেন।’ (সুরা নাজম, আয়াত: ৩২)
তাকওয়া শুধুই আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিষয়; কার তাকওয়া আছে আর কারনেই, সে ফয়সালা একমাত্র মহান আল্লাহর।
তবে কারও মধ্যে তাকওয়া থাকলে তা তার আচরণেও প্রভাব ফেলে। যে হাদিসে বুকের দিকে ইশারার কথা এসেছে, সেখানেই বলা হয়েছে, কারও মন্দ হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে সে নিজের মুসলিম ভাইকে হেয় মনে করে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৪)
কার অন্তরে কতটা তাকওয়া আছে, তা যেহেতু অজানা, তাই বাহ্যিক ধার্মিকতার ভিত্তিতে কাউকে শ্রেষ্ঠ ভাবার কিংবা অন্যকে ছোট করার সুযোগ থাকে না।
তাকওয়া প্রকাশ্য মানদণ্ড না হলেও তাকওয়াবানদের সঙ্গে চলতে ইসলামে উৎসাহ আছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করোএবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ১১৯)
হাদিসে এসেছে, ‘মুমিন ছাড়া কাউকে সঙ্গী কোরো না, আর তোমার খাবার যেন তাকওয়াবান ছাড়া কেউ না খায়।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৮৩২)
এ হাদিস থেকে তাকওয়াবান ছাড়া অন্যকে খাওয়ানো নিষিদ্ধ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। কোরআনে বরং অভাবী, এতিম ও বন্দীকে খাবার দেওয়ার প্রশংসা করা হয়েছে। (সুরা দাহর, আয়াত: ৮)
আচরণের মাধ্যমে মানুষকে খুশি করা যায়, আর এই চেষ্টা আল্লাহর কাছে নেক কাজ হিসেবেই গণ্য। পরকালে তিনি এর জন্য পুরস্কার দেবেন।
হাদিসের ব্যাখ্যাকারদের অনেকে একে ঘনিষ্ঠ আপ্যায়ন ও সঙ্গ নির্বাচনের নির্দেশনা বলে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ নির্দেশটি তাকওয়াবানদের অগ্রাধিকারের জন্য। ভালো মানুষের সান্নিধ্যে পাপের সম্ভাবনা কমে। তাই তাঁদের প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে।
তাকওয়া অন্তরে থাকে, আর উত্তম আচরণ প্রকাশ পায় মানুষের সামনে। এই আচরণের ওজন আল্লাহর কাছে কম নয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ইমানে সবচেয়ে পরিপূর্ণ মুমিন তিনিই, যাঁর চরিত্র সবচেয়ে সুন্দর। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৬৮২)
এক হাদিসে আছে, কেয়ামতের দিন মুমিনের মিজানে উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী কিছু থাকবে না। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০০২)
আরেক হাদিসে আছে, কেয়ামতের দিন নবীজির সবচেয়ে প্রিয় ও নিকটবর্তী হবেন সর্বোত্তম চরিত্রের মানুষেরা। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২০১৮)
উত্তম আচরণের সূচনা বড় কোনো আয়োজনে নয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, কোনো ভালো কাজকে তুচ্ছ মনে করা উচিত নয়, এমনকি ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে দেখা করাও ভালো কাজ। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৬)
আচরণের মাধ্যমে মানুষকে খুশি করা যায়, আর এই চেষ্টা আল্লাহর কাছে নেক কাজ হিসেবেই গণ্য। পরকালে তিনি এর জন্য পুরস্কার দেবেন। 
হাদিসের দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, দোজখে নিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে যে দুটি অঙ্গের কথা বলা হয়েছে, তার প্রথমটি মুখ বা জিব।
উত্তম আচরণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জিবের হেফাজতের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি মন্দ আচরণ করে কথা দিয়ে: কটূক্তি, গিবত, মিথ্যা, উপহাস ও অপবাদের মত কাজের মাধ্যমে। অথচ জিব দিয়ে ভালো কথা বলার মাধ্যমে মানুষের মন জয় করাও সম্ভব।
তাই মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে, নয়তো চুপ থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৮)
আরেক হাদিসে মুসলিমের পরিচয় দেওয়া হয়েছে এভাবে, যার জিব ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১০)
হাদিসে উল্লিখিত দ্বিতীয় অঙ্গ লজ্জাস্থান। পদস্খলন ও পাপের অন্যতম বড় কারণ জৈবিক চাহিদার অনিয়ন্ত্রণ। এই চাহিদা স্বাভাবিক; বৈধ পথে তা পূরণ করা এবং অবৈধ পথ থেকে নিজেকে সংযত রাখাই লজ্জাস্থানের হেফাজত।
যে ব্যক্তি আমাকে দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিব) ও দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য বেহেশতের নিশ্চয়তা দেব। সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৪
কোরআনে দৃষ্টি অবনত রাখার নির্দেশের সঙ্গে লজ্জাস্থান হেফাজতের কথাও এসেছে। (সুরা নুর, আয়াত: ৩০)
মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আমাকে দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী অঙ্গ (জিব) ও দুই পায়ের মধ্যবর্তী অঙ্গের নিশ্চয়তা দেবে, আমি তার জন্য বেহেশতের নিশ্চয়তা দেব। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৭৪)
জিবের পরীক্ষা ঘটে মানুষের সামনে, আর লজ্জাস্থানের পরীক্ষা বেশির ভাগসময় নির্জনে। তাই প্রথমটিতে উত্তম আচরণ বা ভালো ব্যবহার এবংদ্বিতীয়টিতে তাকওয়ার প্রকাশ ঘটে।
মোটকথা, বেহেশতের জন্য আল্লাহর ইবাদত করা ও তার বিধান মানা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ করা এবং পাপ থেকে বেঁচে থাকা।
তাকওয়া ভেতরের পুঁজি, উত্তম আচরণ তার বাইরের প্রকাশ, আর জিব ও লজ্জাস্থানের হেফাজত এই দুই গুণকে অক্ষত রাখে। উল্লিখিত হাদিস এই সকল বিষয়ের সমন্বয়।














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২