আব্দুল্লাহ ইবনে মাহফুজ ইবনে বায়াহ ।।
কোনো এক কবি মহানবীর (সা.) ব্যাপারে বলেছেন, ‘হে মোস্তফা! আদম (আ.) সৃষ্টির পূর্বেই, যখন এই মহাবিশ্বের কোনো দুয়ার উন্মোচিত হয়নি, তখনই স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা আপনার সুমহান চরিত্রের প্রশংসা করেছেন। তাঁর প্রশংসার পর আর কোনো সৃষ্টির প্রশংসার মুখাপেক্ষিতা থাকে না।’ এরপরও আমরা রাসুলুল্লাহর (সা.) চরিত্র ও মহান গুণাবলীর কথা আলোচনা করি কারণ তা সমগ্র মানবজাতির জন্য একমাত্র নিখুঁত ও পূর্ণাঙ্গ জীবনাদর্শ।পৃথিবীর ইতিহাসে রাসুলুল্লাহর (সা.) মতো এত নিখুঁত, বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গভাবে আর কোনো নবীর জীবনবৃত্তান্ত ও সিরাত লিপিবদ্ধ হয়নি। আমরা জানি হজরত ঈসা (আ.) ছিলেন আল্লাহর প্রেরিত একজন মহান নবী ও রাসুল, রুহুল্লাহ এবং আল্লাহর কালিমা যাকে তিনি মারিয়ামের (আ.) কাছে পাঠিয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত দুনিয়াবিমুখ ও জাহিদ ছিলেন। কিন্তু ইতিহাসে তা বিস্তারিত লিপিবদ্ধ নেই যে তাঁর ইবাদত-বন্দেগি কেমন ছিল।অন্যদিকে প্রিয় নবী রাসুলুল্লাহর (সা.) বিষয়ে আমরা সহিহ হাদিস থেকে নিশ্চিতভাবে জানি যে, তিনি রাতে এত দীর্ঘ সময় ইবাদতে দাঁড়িয়ে থাকতেন যে তাঁর উভয় পা মোবারক ফুলে যেত।আমরা জানি যে ঈসা (আ.) চরম দুনিয়াবিমুখ ছিলেন, কিন্তু ইতিহাসে এটি স্পষ্টভাবে সংরক্ষিত নেই যে তিনি অভাবগ্রস্তদের অভাব দূর করার জন্য কী পরিমাণ দান-সদকা করতেন। পক্ষান্তরে রাসুলুল্লাহর (সা.) ক্ষেত্রে আমরা জানি, তিনি গণমানুষের মাঝে কোনো হিসাব ছাড়াই অকাতরে সম্পদ ও অর্থ বিতরণ করতেন। এমনকি ঘরের মধ্যে সামান্য অর্থ বা সম্পদ গচ্ছিত থাকলে তিনি রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারতেন না।উম্মুল মুমিনীনদের বর্ণিত ঘটনা থেকে জানা যায়, এক রাতে প্রিয় নবী (সা.) কোনোভাবেই ঘুমাতে পারছিলেন না। অতঃপর তিনি বললেন, ‘আমার কাছে থাকা ওই দিনারগুলো (স্বর্ণমুদ্রা) নিয়ে এসো।’ এরপর তিনি সেগুলো এনে তৎক্ষণাৎ গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করে দিলেন এবং তারপর শান্তিতে ঘুমাতে গেলেন। পার্থিব কোনো সম্পদই তিনি নিজের কাছে ধরে রাখতেন না। দুনিয়ার যা কিছু তাঁর কাছে আসত, সবই তিনি মানুষের মাঝে অকাতরে বিলিয়ে দিতেন। সমগ্র পৃথিবীর বিজয়ের দুয়ার যখন তাঁর সামনে উন্মুক্ত হলো, চারদিক থেকে যখন প্রতিনিধি দল তাঁদের ধন-সম্পদ ও প্রাণ উৎসর্গ করতে তাঁর দরবারে আসতে লাগল, তখনও তিনি আগের মতোই জাহিদ ও দুনিয়াবিমুখ থেকে গিয়েছিলেন।বিনয় ও নম্রতার ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অতুলনীয়। তিনি সাহাবিদের মাঝে সাধারণ মানুষের মতো অতি সাধারণ ভঙ্গিতে বসতেন। একদিন এক নারী তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হলেন। রাসুলুল্লাহকে (সা.) এমন সাধারণ বেশে অতীব সাধারণ ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখে তিনি ভয়ে কাঁপতে লাগলেন। প্রিয় নবী (সা.) তখন তাকে অভয় দিয়ে পরম মমতায় বললেন, ‘শান্ত হও, ভয় পেও না! আমি তো কুরাইশের এমন এক সাধারণ নারীর সন্তান, যিনি শুকনো গোশত খেয়ে জীবনধারণ করতেন।’ অর্থাৎ আমাকে দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমি কোনো রাজ-রাজা বা বাদশাহ নই।মুতার যুদ্ধ শেষে যখন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমরসহ (রা.) সাহাবিদের একটি দল মদিনায় ফিরে এলেন, তখন তাঁরা যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত অবস্থান করতে না পারার কারণে অত্যন্ত লজ্জিত ও ভীত ছিলেন। ফজরের সালাতের সময় তারা প্রিয় নবীর (সা.) দরবারে উপস্থিত হলেন। নবীজী (সা.) তাঁদের আশ্বস্ত করে বললেন, ‘তোমরা তো পালিয়ে আসোনি, বরং তোমরা তোমাদের কেন্দ্র বা মূল সেনাদলের কাছে ফিরে এসেছ।’ তারা তখন রাসুলুল্লাহর (সা.) সান্নিধ্যে এগিয়ে এসে তাঁর বরকতময় হাতে চুমো খেলেন এবং তাঁর সামনে সিজদা করার অনুমতি চাইলেন। নবীজি (সা.) সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিষেধ করে পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, ‘সিজদা তো কেবল পরম সত্তা মহান আল্লাহ তাআলার জন্যই নির্দিষ্ট।’প্রিয় নবী (সা.) যখন কোনো মজলিসে প্রবেশ করতেন, তখন সাহাবিদের উঠে দাঁড়াতে নিষেধ করতেন। সাহাবিরাও তাঁর এই অপছন্দের কথা জানতেন বলে তাঁকে দেখে কেউ দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করতেন না।অন্য নবীদের ফাজায়েল ও শ্রেষ্ঠত্ব আমরা জানি, কিন্তু তাঁরা মানবকল্যাণে ও সমাজে কী দান করেছেন তার বিস্তারিত রূপ আমাদের সামনে অনুপস্থিত। তাঁরা জুলুমকে ঘৃণা করতেন, কিন্তু সমাজ থেকে জুলুম কীভাবে উৎখাত করেছেন তা স্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ নেই। অন্যদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো কোনো জালেমকে জুলুম করতে দেননি। তিনি তৎকালীন বিশ্বের প্রতিটি পরাক্রমশালী শাসক ও রাজ-বাদশাহদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল, যেন তারা নিজ প্রজাদের ওপর জুলুম চালানো বন্ধ করে এবং আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করে।রাসুলুল্লাহ (সা.) কেবল সাহসিকতার উপদেশই দেননি, বরং তিনি নিজে ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর ও সাহসী মানুষ। তিনি মানুষকে ক্ষমা করার উপদেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং নিজে ক্ষমাশীলতার সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। কেবল মক্কার দুর্বল অবস্থায়ই নয়, বরং চরম বিজয়ের মুহূর্তেও তিনি ক্ষমার চরম আদর্শ স্থাপন করেছিলেন।যখন ১২ হাজার সাহাবির বিশাল বাহিনী নিয়ে বিজয়ীর বেশে তিনি মক্কায় প্রবেশ করলেন, তখন কুরাইশরা কাবার প্রাঙ্গণে ভয়ে কাঁপছিল। এই কুরাইশরাই একদিন তাঁকে মাতৃভূমি মক্কা থেকে বিতাড়িত করেছিল, তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল, মদিনায় গিয়ে একাধিকবার আক্রমণ চালিয়েছিল এবং তাঁর প্রিয় চাচা ও সাহাবিদের নির্মমভাবে শহীদ করেছিল। সেই শত্রুরা যখন কাবার সামনে নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিণতির জন্য অপেক্ষা করছিল, তখন নবীজী (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজ আমার পক্ষ থেকে তোমাদের সাথে কেমন ব্যবহারের আশা করো?’ তারা লজ্জিত কণ্ঠে বলল, ‘আপনি তো এক মহান ভাই এবং মহান ভাইয়ের সন্তান!’তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) সেই ঐতিহাসিক ক্ষমার ঘোষণা দিয়ে বললেন, ‘যাও, আজ তোমাদের ওপর কোনো অভিযোগ নেই, তোমরা সবাই মুক্ত-স্বাধীন!’ তিনি তাদের জোরপূর্বক ইসলাম গ্রহণের নির্দেশও দেননি, কোনো শর্ত আরোপ করেননি, অতীত অত্যাচার বা নির্যাতনের কথা স্মরণ করিয়ে দেননি। সমস্ত নিপীড়ন, নির্যাতন ও ক্ষোভ তিনি এক মুহূর্তেই নিশ্চিহ্ন করে দিলেন।হুনাইনের যুদ্ধে যাত্রাকালে এক ব্যক্তি গোপনে রাসুলুল্লাহকে (সা.) হত্যার সুযোগ খুঁজছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) দ্রুত তার দিকে তাকালেন এবং তাকে কাছে ডেকে বললেন, ‘আল্লাহ তোমার জন্য কল্যাণ চান, তুমি যা চেয়েছিলে তা থেকে তিনি তোমাকে রক্ষা করেছেন।’ এই বলে নবীজী (সা.) পরম মমতায় তাঁর বরকতময় হাত সেই ব্যক্তির বুকের ওপর রাখলেন। সেই সাহাবি পরবর্তীতে বর্ণনা করেছেন, ‘আল্লাহর কসম! তিনি যখন আমার বুক থেকে হাত মোবারক তুললেন, তখন এই পৃথিবীতে তিনি ছাড়া আমার কাছে আর কেউ প্রিয় ছিল না।’যে ব্যক্তি তাঁকে হত্যা করতে এসেছিল, তাকে তিনি উপহার দিলেন পরম মমতা, উজ্জ্বল এক মুচকি হাসি এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে অন্তরের নিখাদ হেদায়েত ও ভালোবাসা। এটিই ছিল সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসুলুল্লাহর (সা.) সুমহান চরিত্রের বাস্তব রূপ।
