বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় দারিদ্র্য মোকাবিলা করা এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক সংকট এ ধরনের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য বিমোচনের দিকে সরকারের নজর থাকলেও তা খুব একটা কাজে আসছে না; বরং দারিদ্র্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। যুদ্ধ-সংঘাত, জ্বালানি ও খাদ্যসংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং কর্মসংস্থানের অভাবে নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে কোটি কোটি মানুষ। সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ যথেষ্ট পরিমাণে না হওয়ায় কর্মসংস্থান কমেছে এবং সেই সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। অর্থনীতির ধীরগতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দারিদ্র্য ও বৈষম্য পরিস্থিতির ওপর। মৌলিক অধিকারের বহুমুখী অভাবে মানুষ আজ দিশেহারা। আর্থিক নিরাপত্তা হারানোর শঙ্কায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্তরাও। এ ছাড়া অসহনীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা গোষ্ঠী হয়ে যাচ্ছে দরিদ্র। জনসংখ্যার বড় একটা অংশ নিম্নবিত্ত থেকে নেমে যাচ্ছে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে। এদের সংখ্যা ৬ কোটিরও বেশি; যা মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। ফলে ক্রমেই দারিদ্র্যের চক্রে এগোচ্ছে দেশ।
সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনীতির হালনাগাদ চিত্র নিয়ে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন মতে, এক বছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন। দেশে মোট দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন ৫ কোটি ১৩ লাখ। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে চরম দারিদ্র্য বেড়ে ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দৈনিক তিন ডলারের কম ব্যয় করলে দারিদ্র্যসীমার আওতায় পড়েন।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) বহুমাত্রিক দারিদ্র্য সূচক- এমপিআই অনুযায়ী বাসস্থান, পুষ্টি, সুপেয় পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা- এই মৌলিক সুযোগ-সুবিধার অভাবেই তৈরি হয় বহুমাত্রিক দারিদ্র্য। আর এর প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিশুরা।
আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি- তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা সম্প্রতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সংকুচিত হয়ে আশির দশকের পর্যায়ে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে, যা পুরো দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান অর্থনীতির মধ্যে সর্বনিম্ন। পাকিস্তান ছাড়া বাংলাদেশের মতো এমন অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো দেশই নেই। এতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে দারিদ্র্যের হার আবার বাড়ছে।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রফেসরিয়াল ফেলো ও অর্থনীতিবিদ সেলিম জাহান বলেন, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য কমানোর জন্য যেসব কার্যক্রম প্রয়োজন, সেগুলোতে একধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। এর ওপর যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে দারিদ্র্য কমার ক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
দেশে দারিদ্র্য বাড়ার প্রবণতা খুবই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে গত চার বছরে এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট ও সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে চরম বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে। এ বৈষম্যের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন সাধারণ ও নিম্ন আয়ের মানুষ। তাই সরকারকে এ সংকট অবস্থা থেকে উত্তরণে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সম্প্রতি আইএমএফের প্রতিবেদন বলছে, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার। তাই বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। অর্থনীতির গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বৈষম্য কমিয়ে আনা জরুরি। কী কারণে দারিদ্র্য বাড়ছে, সেসব বিষয় পর্যালোচনা করে সরকার একটি সমন্বিত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, এটাই প্রত্যাশা।
