বুধবার ● ২১ অক্টোবর ২০২৬
৫ কার্তিক ১৪৩৩
বেসামাল দ্রব্যমূল্যে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে
অধ্যাপক ডাঃ মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ ।।
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম আপডেট: ২০.১০.২০২৬ ১:২৯ এএম |

বেসামাল দ্রব্যমূল্যে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে
মাস দুয়েক কিছুটা স্থির ছিল চালের বাজার। জ¦ালানি তেলের দর বাড়ার পর চালের দামেও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পরিবহন ভাড়া বাড়ার ছুতায় চালের দাম বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে বেশি বিপদে পড়েছেন স্বল্প আয়ের ভোক্তারা। তাদের খরচের ফর্দ আরও লম্বা হচ্ছে। বাজার ভেদে ও মানভেদে প্রতি কেজি মোটা চাল ৫০ থেকে ৫৪, মাঝারি চাল ৫৮ থেকে ৬৪, সরু চাল ৬৮ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া নাজিরশাইল চালের কেজি ৮০ থেকে ৮৫ টাকার বিক্রি হতে দেখা যাচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষের আর্থিক দৈন্যের শেষ নেই। বেসামাল বাজার পরিস্থিতি সব শ্রেনি পেশার মানুষকে ফেলে দিয়েছে চরম সংকটে। এর মধ্যে দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে পড়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো। তাদের আয় বাড়েনি, বেড়েছে কেবল ব্যয়। এসব পরিবারের গল্প এমন জায়গায় ঠেকেছে, কেউ কেউ অভাবের কথাও বলতে পারছেন না। অনেক পরিবারে মেহমানদারিও বন্ধ হয়ে গেছে। কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে আগের মত আর বিয়ের অনুষ্ঠানও হচ্ছে না। এ সংকট যে গত এক বছরের, এমনটি নয়। কয়েকবছর ধরেই এমন নাজুক পরিস্থিতির উপর দিয়ে যাচ্ছে এসব পরিবারের জীবন। এছাড়া যারা দিন এনে দিন খান, তাদের কষ্ট বর্ণনা করার মত নয়।
১৬ই অক্টোবর গেল বিশ^ খাদ্য দিবসে এ বছর দিবসের প্রতিপাদ্য হল ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামীদিনের পুষ্টি’। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বিশ^ব্যাপী খাদ্য উৎপাদান ও সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নিরাপদ ও পুষ্টির খাবারের প্রাপ্যতা এবং পরিবেশ সুরক্ষার উপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার চিত্র বলছে, খাদ্য উৎপাদন ও প্রাপ্যতার পাশাপাশি মানুষের খাবার কেনার সামর্থ্য নিয়েও বড় ধরণের উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। ডব্লিড এফ পি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে গত আগষ্টে ২০২৬। এতে খাদ্য সংকটের পাশাপাশি শিশুকে অপুষ্টি, কৃষি জমির ক্ষতি, রোহিঙ্গা শরাণার্থীদের খাদ্যসহায়তা এবং মানবিক কার্যক্রমে অর্থের ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। ডঋচ এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষ চার মাস (সেপ্টেম্বরÑডিসেম্বর) পর্যন্ত ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষের জন্য খাদ্যসংকট ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বছরের শেষ ভাগে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আরও বাড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ডঋচ এর পরিসংখ্যান বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির ক্রমাবনতির একটি গুরুতর সংকেত। বছরের শুরুর দিকে যেখানে ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে ঝুঁকিতে ছিল, সেখানে কয়েক মাসের ব্যবধানে এ সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছানো প্রমান করে যে, খাদ্য প্রাপ্যতা ও মানুষের খাদ্য কেনার সক্ষমতার মধ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষের জরুরি খাদ্য সংকটে পড়ার আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়, খাদ্য সংকট ও পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুদের বেড়ে উঠা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া এবং খাবারে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উৎপাদনের অভাব শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চার শিশুর একজন খর্বকায় (বয়সের তুলনায় উচ্চতায় কম) এবং ১১ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায় (উচ্চতার তুলনায় ওজন কম) আর পাঁচটি পরিবারের দুটিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অপুষ্টির ঘাটতি রয়েছে। খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকির কারণ হিসাবে ডঋচ এর মূল্যায়নে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, বৈশি^ক পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে।
বেড়েছে গ্যাস-বিদ্যুৎ, জ¦ালানি, পরিবহন ও চিকিৎসা ব্যয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আগষ্টে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। সেটা সেপ্টেম্বরে বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮.৩৪ শতাংশের বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৭.৯০ শতাংশ। সেপ্টেম্বর মাসের খাদ্য মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্য বহির্ভূত মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ মূহুর্তে খাদ্য সংকটের ঝুঁকি মোকাবেলায় সরকারের উচিত হবে, সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা। নিম্ন আয়ের পরিবার, দিন মজুর, কৃষিশ্রমিক, নারী প্রধান পরিবার এবং দূর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য খাদ্য সহায়তা, ন্যায্যমূল্যে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি এবং লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তার পরিধি বাড়াতে হবে। বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও কারসাজি প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারি এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জাতীয় জনগুরুত্ব সম্পন্ন বিষয়।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২