মঙ্গলবার ● ২০ অক্টোবর ২০২৬
৪ কার্তিক ১৪৩৩
মূল্যস্ফীতির হিসাব আর মানুষের জীবনের ফারাক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ এএম আপডেট: ২০.১০.২০২৬ ১:২৮ এএম |

মূল্যস্ফীতির হিসাব আর মানুষের জীবনের ফারাকশোয়েব সাম্য সিদ্দিক ।।
প্রতি মাসে মূল্যস্ফীতির নতুন হিসাব প্রকাশিত হয়। কখনো বলা হয়, মূল্যস্ফীতি কমেছে। কিন্তু বাজারে গিয়ে চাল, ডাল কিনতে মানুষকে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। এখানেই সরকারি হিসাবের সঙ্গে মানুষের জীবনের ফারাক। কারণ মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়, দাম বাড়ার গতি কমে আসা। আগের বাড়তি দামে পণ্য কিনতে গিয়ে মানুষকে যে চাপ সামলাতে হচ্ছে, তা থেকেই যাচ্ছে।
সরকারি হিসাবে, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অগাস্টে তা নেমে এসেছে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে। টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি কমা ইতিবাচক খবর। কিন্তু গত বছরের অগাস্টে এই হার ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কমেছে মাত্র শূন্য দশমিক ০৩ শতাংশ। দাম কমেনি, শুধু বাড়ার গতি সামান্য কমেছে। তাই মূল্যস্ফীতি কমার খবর এলেও সাধারণ মানুষের সংসারে স্বস্তি ফেরার মতো পরিবর্তন এখনো দেখা যাচ্ছে না।
সমস্যা শুধু নিত্যপণ্যের দামেও সীমাবদ্ধ নেই। বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসার খরচ বেড়ে গেলে সংসারের বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। খাদ্যপণ্যের দাম মৌসুমি সরবরাহের কারণে কখনো কমতে পারে, কিন্তু বাড়িভাড়া বা যাতায়াতের খরচ সহজে কমে না। ফলে বাজারে কিছুটা স্বস্তি এলেও পরিবারের মোট ব্যয় আগের মতোই রয়ে যায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আয় ও মজুরির ব্যবধান। অগাস্টে মজুরি প্রবৃদ্ধি ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, অথচ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষের আয় বাড়ার হারও মূল্যবৃদ্ধির হারের চেয়ে কম। গত বছর ১০০ টাকার পণ্য কিনতে এ বছর ১০৮ টাকা ২৬ পয়সা লাগলে, আয় বেড়ে ১০৮ টাকা ৫ পয়সা হলেও আগের মতো পণ্য কেনা সম্ভব হবে না। এই ব্যবধান এক বছরে সামান্য মনে হতে পারে, কিন্তু বছরের পর বছর চলতে থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। তখন সংসারের খরচ মেটাতে খাবার, চিকিৎসা কিংবা সন্তানের পড়াশোনার ব্যয়ে কাটছাঁট করতে হয়।
এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতির জন্য শুধু মানুষের বাড়তি চাহিদাকে দায়ী করা যায় না। জ্বালানি, আমদানি, পরিবহন ও উৎপাদন খরচও পণ্যের দাম বাড়ায়। বাজারে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা প্রতিযোগিতা কম থাকলে ওই চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই সুদহার বাড়িয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে।
সরকার চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু একটি পূর্বাভাসে এ বছরের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। একই পূর্বাভাসে ভারতের মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশ, নেপালের ৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৮ দশমিক ৩ শতাংশের কথা বলা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যানের সময়কাল ও ভিত্তি যাচাই করা জরুরি। তবে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকার আশঙ্কা দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর দিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতিও স্বস্তির নয়। ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা জ্বালানি ও পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন, কৃষি ও শিল্পের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের বাজারে ওই চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে। বিশ্ববাজারের ধাক্কা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে আমদানির উৎস বহুমুখী করা এবং দেশের ভেতরের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা গেলে তার প্রভাব কিছুটা কমানো যায়।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রেখেছে বলে সংশ্লিষ্ট মুদ্রানীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। সুদহার বেশি থাকলে ঋণ নেওয়া ব্যয়বহুল হয় এবং বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা কমতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ও বিনিয়োগের খরচও বাড়ে। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল থাকলে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই শুধু সুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা যথেষ্ট নয়। ঋণ কোন খাতে যাচ্ছে, উৎপাদন কতটা বাড়ছে এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহ কেমন, ওদিকেও নজর দিতে হবে।
সরকারের রাজস্ব ও ব্যয়ের চাপও বিবেচনায় রাখা জরুরি। জ্বালানি ও বিদ্যুতে ভর্তুকি দিলে বাজেটের ওপর চাপ পড়ে, আবার ভর্তুকি কমিয়ে দাম বাড়ালে সাধারণ মানুষের খরচ বেড়ে যায়। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়লেও নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লে তাদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, কিন্তু উৎপাদন ও সরবরাহ না বাড়লে অতিরিক্ত চাহিদা দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই বেতন, বাজেট ও বাজারের সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বাজারের সরবরাহব্যবস্থায়। কৃষকের কাছ থেকে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছাতে কত খরচ হচ্ছে, কোথায় অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে এবং পরিবহন ও সংরক্ষণে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। চাল, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ ও ডিমের বাজারে কারসাজি থাকলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক সাময়িকভাবে কমানো এবং দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে আমদানির সুবিধা যেন ভোক্তার কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কৃষককে ন্যায্য দাম দিতে হবে, যাতে কম দামের সুবিধা দিতে গিয়ে উৎপাদক লোকসানে না পড়েন।
ব্যাংক খাতের দুর্বলতা কাটানো, খেলাপি ঋণ কমানো এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করাও গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য টিসিবির কার্যক্রম, খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি ও সামাজিক সুরক্ষা ভাতা আরও কার্যকর করা দরকার। কারণ যাদের আয় বাজারদরের তুলনায় কম বাড়ছে, তাদের জন্য শুধু মূল্যস্ফীতির হার কমার অপেক্ষায় থাকলে চলবে না। তাদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় সরাসরি সহায়তাও প্রয়োজন।
আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি কোন দিকে যাবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, দেশীয় কৃষি উৎপাদন, আমদানি ব্যয় এবং বাজারে পণ্যের সরবরাহের ওপর। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে মূল্যস্ফীতি আরও কমতে পারে। কিন্তু তেলের দাম বাড়লে কিংবা সরবরাহে বাধা তৈরি হলে ওই অগ্রগতি থেমেও যেতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ে মূল্যস্ফীতি একটি নির্দিষ্ট হারে নামবেই, এমন নিশ্চয়তা দেওয়ার চেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং তার অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করাই বেশি জরুরি।
শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি শুধু একটি অর্থনৈতিক সংখ্যা নয়। এর প্রভাব পড়ে মাসের বাজার, বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচে। দাম বাড়ার গতি কমলেও যদি মাসের শেষে মানুষের হাতে টাকা না থাকে, তাহলে ওই স্বস্তির অর্থ সীমিত। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সাফল্য বিচার করতে হলে পণ্যের দামের পাশাপাশি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার পরিবর্তনও দেখতে হবে। সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কমেছে কি না, তার উত্তর পরিসংখ্যানে পাওয়া যাবে। কিন্তু মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরেছে কি না, তার উত্তর মিলবে মাসের খরচ মেটানোর পর হাতে কত টাকা থাকছে, ওই হিসাবে।
লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২