নিজস্ব প্রতিবেদক: ‘সব লোকে কয় কি জাত সংসারে, লালন বলে, জাতের কী রূপ দেখলাম না এ নজরে’—মানবতাবাদী সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের এই কালজয়ী দর্শনকে ধারণ করে কুমিল্লায় পালিত হয়েছে তাঁর ১৩৬তম তিরোধান দিবস।
জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ ও সামাজিক বৈষম্যের ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের বার্তা ছড়িয়ে দিতে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেল ৪টায় কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমির বহিরাঙ্গনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় কুমিল্লা জেলা প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ছিল কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমি।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজী আক্তারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ইউসুফ মোল্লা টিপু।
সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন জেলা কালচারাল অফিসার এস এম টি কামরান হাসান।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা মহানগর জাসাসের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল হক সোহেল, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মশিউর রহমান ভূঁইয়া, কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত বাবুল এবং মহানগর বাসাসের সহসভাপতি ইসতিয়াক আহমেদ পল্লবসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
ফকির লালন সাঁইয়ের দর্শনের মূল কথা মানুষ। তাঁর গান ও সাধনায় জাতপাত, ধর্মীয় পরিচয়, বর্ণবিভেদ ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের পরিবর্তে মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তা, মানবিক মর্যাদা ও সাম্যের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, সহনশীলতা ও সমতার যে শিক্ষা তিনি দিয়েছেন, তা আজও সমাজের জন্য প্রাসঙ্গিক।
‘সব লোকে কয় কি জাত সংসারে’ গানে লালন প্রচলিত জাতপরিচয় ও সামাজিক বিভাজন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বাহ্যিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রকৃত সত্তাকে উপলব্ধি করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ধর্ম, বর্ণ কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে বৈষম্য সৃষ্টি না করে প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করার বার্তা রয়েছে তাঁর দর্শনে।
আলোচনা সভার পাশাপাশি অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় লালন সাঁইয়ের মরমি গান। কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমির শিক্ষার্থীরা সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন। লালনের গানের সুর, দর্শন ও বাংলার লোকজ ঐতিহ্যনির্ভর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।
আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে লালনের মানবতাবাদী দর্শন, বাউল সাধনা ও বাংলার লোকসংগীতের ঐতিহ্য তুলে ধরার গুরুত্বও উঠে আসে। তাঁর সৃষ্টিকর্মে প্রেম, আত্মসন্ধান, সাম্য ও মানবিকতার পাশাপাশি সমাজে প্রচলিত বিভেদ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে।
