মো. হাবিবুর রহমান ।।
রাস্তা আছে, কিন্তু তাতে ইট কিংবা ঢালাইয়ের দেখা মেলেনি। পুকুর দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, অথচ নেই ঘোষিত গাইড ওয়াল। বাস্তবে কাজের কোনো অস্তিত্ব না থাকলেও সরকারি নথিপত্রে প্রতিটি প্রকল্পের কাজ নাকি ‘শতভাগ সম্পন্ন’! কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ১৯ নম্বর দারোরা ইউনিয়নে সামনে এসেছে এমনই এক অভিনব ও 'ভূতুড়ে' উন্নয়নের চিত্র।
অভিযোগ উঠেছে, ১৪টি ভুয়া বা কাল্পনিক প্রকল্প দাঁড় করিয়ে সরকারি বরাদ্দের প্রায় ২৯ লাখ ১৭ হাজার টাকা পকেটে পুরেছেন ইউপি চেয়ারম্যান ও উপজেলা কৃষক লীগের সভাপতি কামাল উদ্দিন খন্দকার। এ বিষয়ে খোদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) তদন্তের নির্দেশ দিলেও গত ৩ মাস ধরে রহস্যজনক কারণে তদন্ত থমকে রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
অভিযোগ ও নথিসূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছর: ১২টি কাল্পনিক প্রকল্পের বিপরীতে মোট ২৭ লাখ ৭৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সরজমিনে কোনো কাজ না করেই সমুদয় টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই কৌশলে ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও দুটি ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে ৪ লাখ ১৭ হাজার ৪০০ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু নির্দিষ্ট কিছু প্রকল্পই নয়; টি-আর, কাবিখা ও কাবিটার মতো সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচিতেও একই স্থানে বারবার প্রকল্পের নাম বদলে টাকা তুলে নেওয়ার 'মহোৎসব' চলছে।
সংরক্ষিত ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আয়েশা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কাজিয়াতল এলাকার একটি রাস্তায় গাইড ওয়াল নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছিলেন তিনি। চুক্তির পর তাকে জানানো হয় প্রকল্পটি বাতিল করা হয়েছে। অথচ পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, বাতিলের অজুহাত দেখিয়ে স্রেফ কাগজে-কলমে হিসাব মিলিয়ে পুরো টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে।
গত ১৫ জুলাই জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) সরজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় (স্মারক নং: ৬৬৫)।
তবে অভিযোগকারী ইউপি সদস্য রমিজ উদ্দিনের দাবি, ডিসির নির্দেশ সত্ত্বেও গত তিন মাস ধরে তদন্তের নামে স্রেফ সময়ক্ষেপণ ও তামাশা চলছে। কোনো অজ্ঞাত কারণে তদন্তকারী কর্মকর্তা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না। তদন্তে 'তামাশা' ও ডিসির আদেশ উপেক্ষিত হয়ে আছে।
অভিযুক্ত চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন খন্দকার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, "কাজগুলো পূর্বের অর্থবছরেই সম্পন্ন করা হয়েছে। সাম্প্রতিক অর্থবছরে টাকা আত্মসাতের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা একেবারেই সঠিক নয়।"
অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তাও উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা সফিকুল ইসলাম কালক্ষেপণের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি দৈনিক কুমিল্লার কাগজকে জানান, অতি দ্রুতই সরজমিনে তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবিএম সারোয়ার রাব্বির সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও মোবাইল ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এমনকি ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া শব্ধ মিলেনি।
সরকারি তহবিলের এমন অবাধ লুটপাট ও 'উন্নয়নের ভেলকিবাজি' বন্ধে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
