
নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে রাজধানীর ৯৫টি কেন্দ্রে সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। গত শনিবার পরীক্ষা শুরুর মুহূর্তে হঠাৎ বাতিল হওয়ায় চাকরিপ্রত্যাশীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। পরীক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে পড়েন। এতে সড়কে যান চলাচলে ব্যাঘাত ঘটে। অনেক স্থানে যানজট হয়। মাত্র ২৪২ পদের জন্য প্রায় ৩ লাখ পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিতে না পারায় সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন তারা। বিক্ষোভ জানাতে তাদের একটি অংশ রাজধানীর সড়ক অবরোধ করেন। চাকরিপ্রত্যাশীদের চাপে কর্তৃপক্ষ নতুন করে পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা করেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়।
চাকরিপ্রত্যাশীদের মতে, শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা স্থগিতের খবরে তারা মানসিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকে ধারদেনা করে দূর-দূরান্ত থেকে রাজধানী ঢাকায় এসেছেন পরীক্ষায় অংশ নিতে। তারা পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছেন। দাবিগুলো হলো প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িতদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার, ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ, প্রশ্নপত্রের অন্তত চারটি সেট তৈরি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের মতো স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রশ্ন প্রণয়ন এবং পরীক্ষা স্থগিত হলে অন্তত ১০ দিন আগে পরীক্ষার্থীদের জানানোর ব্যবস্থা করা। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি পূরণ না হলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা।
সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন কীভাবে ফাঁস হয়েছে, তা অনুসন্ধান করা জরুরি। তথ্য বলছে, রাজধানীর দিলকুশায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের একটি কক্ষে সারা রাত প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও ছাপানোর কাজ চলে। দায়িত্বপ্রাপ্তরা প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত ওই কক্ষেই ছিলেন। নিয়োগ কমিটির পাঁচ সদস্য প্রশ্নপত্রতৈরি করেন। তাদের কাজে সহায়তা করার জন্য কক্ষটিতে ছিলেন ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের ২০ জন কর্মী। তাদের সবার কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া হয়। সেখানে ইন্টারনেট সংযোগও বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়। এর পরও রাতে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। এখন প্রশ্ন উঠেছে, এত গোপনীয়তার মধ্যেও কীভাবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো। এ জন্য নিয়োগ কমিটির সদস্য নাকি প্রশ্নপত্র ছাপানোর কাজে যুক্ত ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা দায়ী। নাকি এর মধ্যে অন্য কোনো দুর্বলতা ছিল-বিষয়গুলো জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখতে হবে। জানা গেছে, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা করেছে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগও কাজ করছে। প্রশ্নপত্রের যে ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে স্পষ্ট হয়েছে একজনের হাতের ওপর রেখে প্রশ্নপত্রের ছবিটি তুলেছেন। সেখানে কারও আঙুলের সামান্য অংশও স্পষ্ট হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবানবন্দি ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক পরীক্ষার্থী অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তাই শুধু প্রশাসনিক তদন্তে সীমাবদ্ধ না থেকে ফৌজদারি মামলা করে অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে দুর্নীতি দমন কমিশনকে তদন্তকাজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যারা এ অপরাধে যুক্ত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারি চাকরির জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিতে হলে একজন প্রার্থীর দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়। দূরবর্তী জেলা থেকে যারা ঢাকায় আসেন, তাদের ব্যয় অনেক বেশি। নতুন তারিখে আবার পরীক্ষা দিতে হলে একই ধরনের ব্যয় ও প্রস্তুতি প্রয়োজন। চাকরির পরীক্ষাগুলো বিভাগীয় পর্যায়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তা ছাড়া এ ধরনের ঘটনা যদি প্রায়ই ঘটে, সে ক্ষেত্রে তরুণদের মধ্যে হতাশা বাড়বে। চাকরিপ্রার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে সড়কে প্রতিবাদ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে তারা প্রতিবাদ করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এমন ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর পেছনে অর্থ লেনদেনের যে অভিযোগ উঠেছে, তা খতিয়ে দেখতে হবে। একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সে জন্য সরকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করবে, এটাই প্রত্যাশা।
