
নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন-এই প্রতিপাদ্য ধারণ করে এবার পালিত হয়েছে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস। কিন্তু রাষ্ট্রের নাগরিকদের প্রয়োজনের সময় এই সেবা পেতে ভোগান্তির শেষ নেই। কোথাও সার্ভার জটিলতা, কোথাও অনলাইনে ওটিপি না আসা, আবার কোথাও তথ্য সংশোধন ও বাবা-মায়ের নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা। এসব কারণে দিনের পর দিন দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে নাগরিকদের। অথচ নাগরিকের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ও আইনি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে জন্ম-মৃত্যু সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, বিয়ের নিবন্ধন, ভোটার তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ব্যাংক হিসাব, টিআইএন, জমি ও যানবাহন নিবন্ধন, ড্রাইভিং ও ট্রেড লাইসেন্সসহ ১৯টি ক্ষেত্রে প্রয়োজন। নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষণ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তি হস্তান্তরসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে মৃত্যু নিবন্ধনেরও গুরুত্ব তৈরি হয়েছে।
নাগরিকদের অভিযোগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এলাকার বাসিন্দাদের পরিচয় ও পারিবারিক তথ্য সম্পর্কে অবগত থাকায় অনেক ক্ষেত্রে যাচাই সহজ হতো। বর্তমানে সেই স্থানীয় যোগাযোগের ঘাটতিতে বিভিন্ন সনদ ও নিবন্ধন নিতে নাগরিকদের অতিরিক্ত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। নতুন নিবন্ধনের পাশাপাশি পুরোনো সনদের তথ্য সংশোধনেও রয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। নাম, জন্মতারিখ কিংবা বাবা-মায়ের নামের তথ্য ভুল হলে সংশোধনের আবেদন নিয়ে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে ছুটতে হয় বলে অভিযোগ নাগরিকদের। জন্মনিবন্ধনে বাবা-মায়ের তথ্য ও সংযুক্ত করার বিষয়টিও অনেকের জন্য জটিলতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন না থাকলে কিংবা তারা মারা গেলে সন্তানের নিবন্ধন করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। এদিকে সরকারি সেবায় দীর্ঘসূত্রতার সুযোগ নিয়ে দালাল-নির্ভরতা বাড়ছে। নাগরিকদের দাবি, সরকারি কার্যালয়ের বাইরে থাকা কম্পিউটারের দোকান বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দ্রুত কাজ করিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
আইন অনুযায়ী জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জন্মের ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন করার কথা থাকলেও সচেতনতার অভাব ও নানা জটিলতায় অনেকে তা করতে পারেন না। পরে নিবন্ধন করতে গিয়ে অতিরিক্ত কাগজপত্র ও যাচাই-বাছাইয়ের মুখোমুখি হতে হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, দেশে ৬৭ শতাংশের মতো শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জন্ম নেয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে জন্মের পরপরই শিশু নিবন্ধনের দায়িত্ব বাধ্যতামূলকভাবে দিলে ভুলের হার ও ভোগান্তি কমে আসতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা হলো সার্ভার ও অনলাইন সেবার জটিলতা। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে গিয়ে অনেক নাগরিককে শুনতে হচ্ছে ‘সার্ভার ডাউন’। আবার অনলাইনে একাধিকবার চেষ্টা করে ওটিপি না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে একটি সনদের জন্য বারবার অফিসে যেতে হচ্ছে নাগরিকদের। স্থানীয় সরকার, পল্লি উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মইন খান গত বুধবার রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের বলরুমে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আলোচনা সভায় বলেছেন, শুধু কম্পিউটার বা প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের সেবা নিশ্চিত করা যাবে না। প্রযুক্তির পেছনে থাকা মানুষকেই দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি সাধারণ জন্ম সনদ নিতে কোনো নাগরিককে যেন ইউনিয়ন পরিষদে বারবার যেতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের সেবা করাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব।
রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের (জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন) তথ্য অনুসারে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে জন্মনিবন্ধন হয়েছে ৫৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি। এ সময়ে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে জন্মনিবন্ধন সংশোধিত হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ। মৃত্যুনিবন্ধন হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজারের বেশি এবং সংশোধন হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার। গত বছর জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সনদ সংশোধন হয়েছে প্রায় ৭৯ লাখ ১৭ হাজার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’-এর যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে জন্মনিবন্ধন সম্পৃক্ত। ফলে সরকারের ডিজিটালাইজ সুশাসনের সুবিধা তারাই পাবে, যাদের জন্মনিবন্ধন নির্ভুল হবে। এ জন্য নাগরিকদের সচেতন হওয়া দরকার। নিজের বা সন্তানের আবেদন অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে না করিয়ে নিজে করলে ভুল কম হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তি বেড়েছে। প্রশাসকনির্ভরব্যবস্থায় জন্মনিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ ও ট্রেড লাইসেন্সের মতো সেবা নিতে নাগরিকদের দিনের পর দিন ঘুরতে হচ্ছে। এ সুযোগে কিছু অসাধু কর্মচারী ও দালাল চক্রের ঘুষ এবং অতিরিক্ত অর্থ ছাড়া ফাইল আটকে রাখার প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে তদারকি ও জবাবদিহি বাড়ানোর পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে সেবা দিতে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অভিযোগ জানানোর জন্য কার্যকর হট লাইনের পরামর্শ দেন তিনি।
জন্ম ও মৃত্যু সনদ বর্তমানে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক সময় এ সনদের ভুল নিয়ে জটিলতায় পড়তে হয় নাগরিকদের। এ সুযোগে কিছু দালাল বা অসাধু চক্র সমস্যাকে পুঁজি করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে থাকে। তাই জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আশা করছি, সরকার নাগরিকের ভোগান্তি লাঘবে কার্যকরী উদ্যোগ নেবে।
