
এইচআইভি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জাতিসংঘ-ঘোষিত বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ২০২৫ সালের মধ্যে এইচআইভি শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং ভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে ৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা থাকলেও তিনটি সূচকের কোনোটিতেই কাক্সিক্ষত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি। দেশের সম্ভাব্য এইচআইভি আক্রান্তদের মাত্র ৬৯ শতাংশ শনাক্ত হয়েছেন। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে চিকিৎসার আওতায় এসেছেন ৭১ শতাংশ। আর চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের ৮৯ শতাংশের ভাইরাল লোড নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অর্থাৎ প্রথম ধাপে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ধাপে ২৪ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এই পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থায়নের সংকট। দেশের এইচআইভি প্রতিরোধ কর্মসূচির বড় অংশ পরিচালিত হয় দ্য গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে। এর বাইরে সরকারের অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমেও কর্মসূচির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হতো। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২৪ সাল পর্যন্ত চতুর্থ অপারেশন প্ল্যানের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু অপারেশন প্ল্যান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মসূচির আওতা সংকুচিত হয়েছে। অথচ এইচআইভি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ধারাবাহিক উদ্যোগের বিকল্প নেই। অর্থের অভাবে পরীক্ষা, কাউন্সেলিং, চিকিৎসা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম সংকুচিত হলে দীর্ঘদিনের অগ্রগতিও ব্যাহত হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এইডস/এসটিডি কর্মসূচির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে গত কয়েক বছরে নতুন এইচআইভি শনাক্তের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। দেশের ১২টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগার হাসপাতালে বন্দিদের মধ্যেও এই সংখ্যা বেড়েছে। তবে পরীক্ষার পরিধি বৃদ্ধি, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অধিকসংখ্যক পরীক্ষা পরিচালনার কারণেও শনাক্তের সংখ্যা বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তাই এই বৃদ্ধিকে শুধু সংক্রমণ বিস্তারের সূচক হিসেবে দেখলে চলবে না। একই সঙ্গে কত মানুষ পরীক্ষার বাইরে রয়েছেন এবং শনাক্ত হওয়ার পর কতজন নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
এইচআইভি নিয়ন্ত্রণের পথে বড় বাধা সামাজিক বৈষম্য ও কলঙ্কের ভয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হিজড়া জনগোষ্ঠীর অনেকে পরিবার ও সমাজে বৈষম্যের শিকার হন। হাসপাতালেও চিকিৎসা নিতে গিয়ে তাদের অপমানজনক আচরণের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকে সংক্রমণের বিষয়টি গোপন করেন এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে দূরে থাকেন। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এইচআইভি শনাক্ত হওয়ায় তাদের জন্যও পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিক ব্যবস্থা প্রয়োজন।
অরক্ষিত যৌন সম্পর্ক, পরীক্ষাবিহীন রক্ত সঞ্চালন, একই সুই বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তির ব্যবহার এবং আক্রান্ত মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমণ–এসব ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। যৌনকর্মী, পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষ, হিজড়া জনগোষ্ঠী ও শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের জন্য সহজলভ্য, গোপনীয়তা-সুরক্ষিত ও বৈষম্যহীন সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু রোগ শনাক্ত করাই যথেষ্ট নয়; নিয়মিত চিকিৎসা, ভাইরাল লোড পরীক্ষা এবং কাউন্সেলিংয়ের সুযোগও নিশ্চিত করা জরুরি।
৯৫-৯৫-৯৫ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব না হলেও এইডস নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা থামিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই; বরং অর্থায়নের ঘাটতি পূরণ, সরকারি কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করা, বিদেশি সহায়তার বিকল্প উৎস অনুসন্ধান এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসাকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমে বিনিয়োগ কমানো যাবে না। কারণ সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা অনেক বেশি কার্যকর। বিশেষজ্ঞরা জানান, পরীক্ষা, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ-চার ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
