রণবীর ঘোষ কিংকর।
একসময়ে একটি চিঠি বা একটি টেলিগ্রামের জন্য তীর্থের কাকের মতো বসে থাকতো পত্র প্রাপকরা। প্রিয়জনের লেখা একটি চিঠি হাতে পাওয়ার আনন্দে কেটে যেতো সব কষ্ট। পত্র প্রেরকরাও ছুটতেন ডাকঘর গুলোতে। প্রতিদিন ডাকঘরের ডাকবাক্স খুলে যাচাই-বাছাই করে সেই ডাক নিয়ে শহর-নগর, গ্রাম-গঞ্জের পাড়া- মহল্লায় ছুটতেন ডাক পিয়ন ও রানাররা। চিঠিপত্র বা ডাক নিয়ে এখন আর সেই কর্ম ব্যস্ততা নেই ডাকঘরগুলোতে।
ডিজিটাল যুগে মোবাইল ফোন, ইমেইল, ইন্টারনেট, বিভিন্ন এ্যাপস, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অবাধ ব্যবহারে হারিয়ে গেছে ডাক বিভাগের সেই কর্মচাঞ্চল্য। দিন যত যাচ্ছে ক্রমশই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে ডাক বিভাগের এই কর্মযজ্ঞ।
কুমিল্লার জেলা ডাকঘর এর পাশাপাশি ১৭টি উপজেলার মধ্যে ১২টি উপজেলা ডাকঘর, ৩০টি উপ-ডাকঘর সহ ৩৯১টি শাখা ডাকঘর নিয়ে চলছে জেলার ডাক সেবা কার্যক্রম। ওইসব ডাকঘরে এখন আর আগের মতো যাতায়াত নেই মানুষের। চিঠির খোঁজে আসেন না কেউ। যারা আসেন তারা কেউ সঞ্চয়পত্র বা জীবনবীমার লেনদেন নিয়ে।
আজ বিশ্ব ডাক দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হচ্ছে। অথচ একসময় মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ডাক বিভাগ এখন অনেকটাই তার কার্যক্রম হারিয়েছে। সরকারি কিছু চিঠি ও নথিপত্র চালাচালি ছাড়া ডাকঘরে ডাক নিয়ে আসে না কেউ। ডাকঘর গুলোতে ব্যক্তিগত চিঠিপত্র নেই বললেই চলে। ডাকঘরের সামনে এখন চোখে পড়ে না ডাক বাক্সও। ডাক পিয়ন বা রানারদের দেখলে ছুটে আসেন না এখন আর কেউ। নেই আগের মত ডাকটিকিট বিক্রি।
তবে সঞ্চয়পত্র, জীবনবীমা, পোস্টাল ক্যাশ কার্ড, টাকা পাঠানো এসব আর্থিক লেনদেন করে কোনরকমে টিকে আছে ডাকঘর, উপ-ডাকঘর গুলো। তবে চলতি বছরের শুরুতে সঞ্চয়পত্রের নানা জটিলতায় আর্থিক লেনদেনে ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে গ্রামাঞ্চল ও পাড়া মহল্লার শাখা ডাকঘর।
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার পৌরসভার তুলাতলী গ্রামের বাসিন্দা আবুল কাশেম জানান- ১৯৯৫ সালে আমার বড় ভাই বিদেশ যান। একটি চিঠির জন্য মাসের মধ্যে কতবার যে ডাকঘরে গিয়ে খোঁজ নিতাম তার হিসাব নেই। সাদা খাম (এয়ার মেইল) হাতে নিয়ে যখন দূর থেকে ডাকপিয়নকে (রানার) দেখতাম দৌড়ে ছুটে যেতাম। এখন মোবাইল ফোনের যুগে সেইসব শুধুই স্মৃতি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চান্দিনা ডাকঘরের একজন ডাকপিয়ন জানান- আমাদের ডাকঘরের সামনে বড় একটি ডাক বাক্স ছিল। সাধারণ চিঠি গুলো সেখানে ফেলতো। রেজিষ্ট্রার চিঠি গুলো অফিসে এসে দিতো। প্রতিদিন দুপুর ১২টায় যখন ডাকবক্স খুলতাম শত শত চিঠি বের করে আনতাম । ২০০৫ সালের পর থেকে চিঠি কমতে শুরু করে । ২০১০ সালের পর ওই ডাকবাক্সে পেতাম ১০-১৫টি চিঠি। ২০১২ সালের পর ওই ডাকবাক্সে চিঠির বদলে পেতাম অদরকারি কাগজপত্র । ২০১৭ সালের পর ডাকঘরের সামনের ডাক বাক্সে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এদিকে, ডিজিটালের দাপটে স্থবির প্রায় ডাকঘর গুলোতে গত এক বছর যাবৎ "স্পীড পোষ্ট" নামে পার্সেল সার্ভিস চালু করার পর কিছুটা গতি ফিরতে শুরু করেছে। ওই সার্ভিস চালুর ফলে বেসরকারি বা মালিকানাধীন কুরিয়ার সার্ভিস ও পার্সেল সার্ভিসের চেয়ে অনেক কমে “স্পীড পোষ্টে” পার্সেল সার্ভিস সরবরাহ করছে ডাক বিভাগ। যে কারণে ওই পার্সেল সার্ভিসের কারণে ডাকঘরে ফিরতে শুরু করেছে ডাক কার্যক্রম।
কুমিল্লা জেলা পোষ্ট মাস্টার মো. মনিরুল ইসলাম জানান- ডাকঘরগুলোতে ব্যক্তিগত চিঠি লেনদেন প্রায় বন্ধ হলেও আমাদের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি নেই। শুধুমাত্র ঈদের সময় আমাদের বিদেশি পার্সেল পাঠিয়ে আয় হয়েছে ৮ লক্ষাধিক টাকা। প্রতি মাসে গড়ে রেভিনিউ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২০ লাখ টাকা।
তিনি আরও জানান- চিঠি লেখায় মানুষের আগ্রহ বাড়াতে আমরা বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ব্যক্তিগত চিঠি লেখার উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। ডাক বিভাগ যেহেতু এখন ডিজিটাল করা হয়েছে, পত্র প্রেরক জানতে পারে তার চিঠি এখন কোথায় আছে। আশা করছি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ডাক বিভাগের পূর্বের পরিস্থিতি আবারও ফিরে আসবে।
