বৃহস্পতিবার ● ৮ অক্টোবর ২০২৬
২৩ আশ্বিন ১৪৩৩
কুবিতে ব্লাইন্ড ইভ্যালুয়েশন চালুর দাবি, উদ্যোগের আশ্বাস প্রশাসনের
কুবি প্রতিনিধি :
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:০২ এএম আপডেট: ০৮.১০.২০২৬ ১:৪৯ এএম |


 কুবিতে ব্লাইন্ড ইভ্যালুয়েশন  চালুর দাবি,  উদ্যোগের আশ্বাস প্রশাসনের
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পরীক্ষায় মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে একই বিভাগের শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর পূর্বপরিচয় থাকলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তা মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্লাইন্ড ইভালিউশন বা কোডিং পদ্ধতিতে পরীক্ষার্থীর পরিচয় গোপন রাখা হচ্ছে।
দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ব্যবস্থা চালু থাকলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি) এখনো এর আওতায় আসেনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটিতে পরীক্ষার্থীর নাম-রোল সরাসরি না দেখিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হয়। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি), রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ব্যবস্থায় পরীক্ষার খাতার পরিচয়সংক্রান্ত অংশ মূল্যায়নের আগে আলাদা করে দেওয়া হয়, অথবা খাতায় কোডিং সিস্টেম থাকে। ফলে মূল্যায়নকারী শিক্ষক পরীক্ষার্থীর নাম, রোল বা অন্য পরিচয় জানতে পারেন না। এতে ব্যক্তিগত পরিচয় বা পরিচিতির সম্ভাব্য প্রভাব কমে এবং কেবল উত্তরপত্রের মানের ভিত্তিতে নম্বর দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, শ্রেণিকক্ষে আচরণ বা পূর্বের কোনো বিরোধের কারণে নম্বর প্রদানে সূক্ষ্ম প্রভাব পড়তে পারে। এমনকি ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে প্রাপ্য নম্বর কমিয়ে দেওয়ার মতো অসুস্থ চর্চার অভিযোগও রয়েছে। ফলে কোনো শিক্ষার্থী কম নম্বর পেলে সেটি উত্তরপত্রের মানের কারণে, নাকি ব্যক্তিগত কোনো বিষয়ের কারণে-তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের মতে, এ ধরনের অভিযোগ ও অবিশ্বাস উভয় পক্ষের জন্যই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থার প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতক ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রুবায়েত হোসেন বলেন, "কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দেওয়া থেকে শুরু করে পরীক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে এখনও সনাতনী পদ্ধতি চলমান। এখনো পরীক্ষার উত্তরপত্রে পরীক্ষার্থীকে সরাসরি রোল ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর লিখতে হয় এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময়ও তা দৃশ্যমান থাকে।
এই সনাতন পদ্ধতির কারণে মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মনে নানা সংশয় ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়। শিক্ষার্থীরা প্রায়ই চিন্তা করেন-রোল বা রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেখে শিক্ষক হয়তো যথাযথ মূল্যায়ন করেননি, কিংবা কারো রোল নম্বর দেখে তুলনামূলক বেশি নম্বর দিয়েছেন।আবার রোল নম্বর দেখে কোনো কোনো শিক্ষকের পক্ষপাতমূলক আচরণ দেখা যায়।"
পরিসংখ্যান বিভাগের স্নাতক ২০২২-২০২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফারহানা তাসনিম নেহা বলেন, "সেমিস্টার ফাইনালের উত্তরপত্রে কোডিং পদ্ধতি চালুর প্রস্তাবকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। প্রচলিত রোল বা আইডির পরিবর্তে ওএমআর শিট ও বারকোড ব্যবহারের মাধ্যমে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করা হলে পরীক্ষার গোপনীয়তা ও নিরপেক্ষতা আরও নিশ্চিত হবে। শিক্ষকের কাছে শিক্ষার্থীর পরিচয় গোপন থাকায় পক্ষপাতহীন মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। তাই শিক্ষার মান ও মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সেমিস্টার ফাইনালে ওএমআর পদ্ধতি চালু করা একটি সময়োপযোগী উদ্যোগ বলে আমি মনে করি।"
আইন বিভাগের স্নাতকোত্তর ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী জাফরিনা আলম বলেন, "সেমিস্টার ফাইনালের পাশাপাশি সম্ভব হলে ইনকোর্স পরীক্ষাতেও কোডিং পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়া সময়ের দাবি। এতে শিক্ষার্থীর পরিচয় গোপন থাকায় পক্ষপাতিত্বের সুযোগ কমবে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয় পক্ষই অযাচিত অভিযোগ থেকে সুরক্ষা পাবে। ব্যক্তিগত ক্ষোভের কারণে নম্বর কম দেওয়ার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত চর্চা রোধে প্রতিটি পরীক্ষায় কোডিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে মূল্যায়ন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে।"
ব্যবস্থাপনা শিক্ষা বিভাগের স্নাতক ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী মো: রাহীম বলেন, "শিক্ষকরা মানুষ, তাই অবচেতনভাবেই পূর্বধারণা বা পক্ষপাতিত্ব কাজ করতে পারে। যেমন কোনো শিক্ষার্থী ক্লাসে কেমন পারফর্ম করে, তার উপস্থিতি কেমন, কিংবা শিক্ষকের সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কেমন তার ভিত্তিতে আইডি দেখে নম্বর দেওয়ার সূক্ষ্ম একটি প্রভাব পড়তে পারে। ব্লাইন্ড সিস্টেম এই সুযোগ বন্ধ করে দিয়ে কেবল উত্তরের মান অনুযায়ী নম্বর নিশ্চিত করে।যখন একজন শিক্ষার্থী জানে যে তার খাতা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে, তখন পরীক্ষার ফলাফলের প্রতি তার আস্থা বহুগুণ বেড়ে যায়। "স্যার আমাকে পছন্দ করেন না তাই কম মার্কস দিয়েছেন" এই ধরনের হতাশা বা সংশয় দূর হয়। ব্লাইন্ড ইভ্যালুয়েশন সিস্টেম চালু হলে একজন শিক্ষার্থীর খাতা কেবল তার মেধা ও উত্তরের মানের ভিত্তিতেই মূল্যায়িত হবে, অন্য কোনো বাহ্যিক উপাদানের ভিত্তিতে নয়। এটি ক্যাম্পাসে একটি সুস্থ, স্বচ্ছ এবং বৈষম্যহীন একাডেমিক পরিবেশ তৈরিতে ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে।"
পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ নুরুল করিম চৌধুরীর কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমরা আগেও একবার এটি চালুর চেষ্টা করেছিলাম, পূর্বের ভিসি স্যারের সময়ে। কিন্তু তখন তা সম্ভব হয়নি।
এখন শিক্ষার্থীরা আবেদন করলে সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি ভিসি স্যারকে সহজেই জানানো যাবে। তবে এমনিতেও আমি স্যারকে বিষয়টি জানাব।"
বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. সজল চন্দ্র মজুমদার বলেন, "এই ব্যবস্থা আমাদের এখানে চালু হলে তা অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ হবে। এর ফলে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে।
শিক্ষকেরা সবসময় নিরপেক্ষভাবে কাজ করার চেষ্টা করেন। তারপরও কোনো প্রশ্ন বা অভিযোগ তৈরি হলে, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের অভিযোগ আর না ওঠে, সে জন্য এই ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই এই ব্যবস্থা ইতিমধ্যে চালু রয়েছে।
আমি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখি। এখানে পক্ষপাতিত্ব বা কোনো ধরনের অনিয়মের প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থাকবে না।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাস্যুরেন্স সেল (আইকিউএসি)-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সৈয়দুর রহমানের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আমি চাই চূড়ান্ত পরীক্ষা খাতাও দেখানো হউক এবং আমি স্ক্রুটিনিংয়ের পক্ষে। 
কোডিং হলে কোন অসুবিধা নাই, কোডিং করা যেতে পারে।তবে,এই কোডিং করার অর্থই হচ্ছে শিক্ষকদের ট্রাস্ট নিয়ে প্রশ্ন করা। তাহলে এটার প্রেকটিস হয় দেখেই হয়তো শিক্ষার্থীরা কোডিং চাচ্ছে।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকারের কাছে এই পদ্ধতি চালু করার বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন,"পরীক্ষার খাতায় এখন রোল নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকে। বিষয়টা নিয়ে আমি আগে থেকেই ভেবেছিলাম। তবে আমরা সবসময় নীতি ও নৈতিকতার জায়গা থেকে ভেবেছি। আমাদের বিশ্বাস, শিক্ষকেরা নৈতিকভাবে সৎ থাকবেন এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে নিরপেক্ষ থাকবেন। তবু কিছু ঘটনা ঘটে যায়, আর তা এড়ানোর জন্য কোডিং-ডিকোডিং একটি ভালো পদ্ধতি।
তিনি আরও বলেন, তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে। শিক্ষক নৈতিকভাবে ঠিক না থাকলে যত কোডিং-ডিকোডিংই করা হোক, লাভ হবে না। কেউ প্রিয় শিক্ষার্থীকে বলে দিতে পারেন শেষ পাতায় নাম লিখে রাখতে, অথবা কোনো চিহ্ন, লোগো, মার্জিন, বক্স কিংবা লেখার স্টাইল দিয়ে খাতা চেনানো যেতে পারে। এই অনৈতিক চর্চা কেউ করলে তাকে ঠেকানো কঠিন। তবে এই ব্যবস্থায় অন্তত কিছুটা স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা আসবে। শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট করে বলে দিতে হবে, খাতায় যেন নাম, চিহ্ন, মার্জিন বা বক্স জাতীয় কিছু না থাকে। তাহলে এসব চর্চা অনেকটা কমে আসবে।
আমি জানি, অনেক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ করতে চায় না, কিন্তু তাদের মনে অভিযোগ থাকে যে পক্ষপাতের কারণে ফলাফল খারাপ হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তাই আমি এটি নোট করে রেখেছি। এটি বিভাগ থেকে শুরু করতে হবে, আর আমি কন্ট্রোলার ও অ্যাসিস্ট্যান্ট কন্ট্রোলারের সাথে বসে কোডিং-ডিকোডিং আনার চেষ্টা করব।"














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২