বিকেল তখন গড়িয়ে যাচ্ছে। বিদ্যালয়ের কোলাহলও অনেকটা থেমে গেছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের নিয়ে ব্যস্ততা থামেনি কুমিল্লার লালমাই উপজেলার হরিশ্চর ইউনিয়ন হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ডা. সালেহ আহমেদের।
যেসব শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে না, শ্রেণিকক্ষে মনোযোগী নয় কিংবা গত এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছে—তাদের খুঁজে বের করতে তিনি ছুটছেন এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে। উদ্দেশ্য একটাই—কোনো শিক্ষার্থী যেন মাঝপথে হারিয়ে না যায়, কোনো স্বপ্ন যেন ঝরে না পড়ে।
বুধবার ৭ অক্টোবর বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হরিশ্চর, ভোরা, রসুলপুর, মোহনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলছেন তিনি। জানতে চাইছেন, সন্তান কেন বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাচ্ছে না, পড়ালেখায় মন বসছে না কেন, কোথায় তার সমস্যা।
কখনো হয়তো কোনো অভিভাবকের কাছে সন্তানের পড়াশোনার খোঁজ নিচ্ছেন, আবার কখনো অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর সাহস দিচ্ছেন। অভিভাবকদেরও বোঝাচ্ছেন—একটি পরীক্ষায় ব্যর্থতা মানেই জীবনের শেষ নয়; বরং সঠিক পরিচর্যা, উৎসাহ ও নিয়মিত চেষ্টায় সেই শিক্ষার্থীও সফল হতে পারে।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সালেহ আহমেদের এই উদ্যোগে যেন শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতার এক সুন্দর সেতুবন্ধন তৈরি হয়েছে। কারণ একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার্থীর সমস্যার জায়গায় পৌঁছে তাকে আবারও শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনাও সেই দায়িত্বের অংশ।
অনেক সময় একটি সন্তানের অনিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া বা পড়ালেখায় অমনোযোগের পেছনে থাকে নানা বাস্তবতা। পারিবারিক সমস্যা, অভিভাবকের অসচেতনতা, আর্থিক সংকট কিংবা পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা—কারণ হতে পারে অনেক কিছু। সেই কারণটি জানতে হলে শুধু বিদ্যালয়ে বসে থাকলেই হয় না, যেতে হয় শিক্ষার্থীর ঘরের দরজায়।
আর সেই কাজটিই করছেন ডা. সালেহ আহমেদ।
তিনি মনে করেন, একজন শিক্ষার্থীকে হারানো মানে শুধু একজন ছাত্রকে হারানো নয়; হারিয়ে যেতে পারে একটি পরিবারের স্বপ্ন, একটি সমাজের সম্ভাবনা।
তাই অকৃতকার্য শিক্ষার্থীকে ব্যর্থতার তকমা না দিয়ে তাকে আবারও বই-খাতার কাছে ফিরিয়ে আনতে চান তিনি। অনিয়মিত শিক্ষার্থীর অনুপস্থিতির কারণ জানতে চান, অমনোযোগী শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়াতে চান এবং অভিভাবকদেরও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও সচেতন করতে চান।
ডা. সালেহ আহমেদ বলেন, “একটি শিশু বা শিক্ষার্থী কোনো কারণে পিছিয়ে পড়লে তাকে বাদ দেওয়া নয়, বরং তার কাছে পৌঁছে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করে তাকে আবারও এগিয়ে নেওয়াই আমাদের দায়িত্ব।”
তার এই উদ্যোগে অভিভাবকদের মধ্যেও তৈরি হচ্ছে নতুন আশাবাদ। কারণ বিদ্যালয়ের সভাপতি যখন নিজে শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে পড়ালেখার খোঁজ নেন, তখন একজন অভিভাবকের কাছেও সন্তানের শিক্ষার গুরুত্ব নতুন করে ধরা দেয়।
শিক্ষা নিয়ে এমন উদ্যোগ হয়তো বড় কোনো আয়োজন নয়, নেই কোনো জাঁকজমকও। আছে শুধু একজন মানুষের আন্তরিকতা—‘আমার বিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী যেন হারিয়ে না যায়।’
হরিশ্চর ইউনিয়ন হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার এই প্রচেষ্টা তাই হয়ে উঠেছে একটি নীরব মানবিক আন্দোলন—যেখানে লক্ষ্য শুধু ভালো ফলাফল নয়, বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীকে স্বপ্ন দেখার এবং সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করে দেওয়া। এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রভাষক পারভেজ আলম, সহকারী প্রধান শিক্ষক মো : লোকমান হোসেন মজুমদার,অভিভাবক সদস্য মো: আবদুল কাদের, কামরুল ইসলাম বাবু,জাফর মোল্লা, শাহীন আলম প্রমুখ।
