প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)। ফলে বাধ্য হয়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে থাকতে হচ্ছে মেস ভাড়ায়। এতে করে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছয় হাজার ২১৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র রয়েছেন তিন হাজার ২২৪ জন এবং ছাত্রী দুই হাজার ৯৮৯ জন।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে শিক্ষার্থীদের জন্য পাঁচটি আবাসিক হল রয়েছে, এরমধ্যে মধ্যে ছেলেদের তিনটি এবং মেয়েদের দুইটি। ছেলেদের তিনটি হলের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম হলে ১৬০টি, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলে ১৪৮টি, বিজয়-২৪ হলে বর্তমানে আসন রয়েছে ৪৫২টি। এ ছাড়া মেয়েদের নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলে ৩০২টি এবং সুনীতি-শান্তি হলে ৩৬৮টি আসন রয়েছে। ফলে পাঁচ হল মিলিয়ে আবাসন সুযোগ নিশ্চিত হচ্ছে মোট ১৪৩০ জন শিক্ষার্থীর।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬ হাজার ২১৩ জন। ফলে মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ২৩ দশমিক ০১ শতাংশ আবাসন সুবিধা পাচ্ছেন। বাকি প্রায় ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী বঞ্চিত হয়ে আসছেন আবাসন সুবিধা থেকে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ছেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং হলে আসন সংখ্যা অনুযায়ী, মাত্র প্রায় ২৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ ছেলে শিক্ষার্থী আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে মেয়েদের মাত্র ২২ দশমিক ৪২ শতাংশ আবাসিকতার সুযোগ গ্রহণ করতে পারছেন। বাকিদের বাধ্য হয়ে শহরে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে মেসে থাকতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্প আসনের হলগুলোতেও রয়েছে নানান সমস্যা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, হলে সহজে সিট পাওয়া যায় না। দ্বিতীয় বর্ষে সিট পেলেও নানান ভোগান্তির শিকার হতে হয়। আর স্নাতকোত্তরে হলে সিট পেতে দৌড়ঝাঁপ করা লাগে। এরপরও সবাই পান না। অন্যদিকে মেয়েদের তৃতীয় কিংবা চতুর্থবর্ষ পর্যন্তও এক সিটে দুইজনকে অবস্থান করতে হয়।
এদিকে, আবাসন সংকটের কারণে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের পার্শ্ববর্তী মেস কিংবা বাসা ভাড়া করে থাকছেন। এই সংকট কাজে লাগিয়ে ক্যাম্পাসের আশপাশের এলাকাগুলোতে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে মেস ও ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়ার রমরমা ব্যবসা।
অনাবাসিক শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের ভাড়া বাড়ি বা মেসে থেকে আসা-যাওয়া করেন। তাদের অনেকেই বলেছেন, বাড়ি ও মেসের ভাড়া অনেক বেড়ে গেছে। খরচ জোগাতে গিয়ে তাদের হিমশিম খেতে হয়। এ ছাড়া মেসে খাবারের মানও তেমন ভালো নয়।
মার্কেটিং বিভাগের অনাবাসিক শিক্ষার্থী সাবিবা আফরোজ বলেন, "ক্যাম্পাসে এসেছি প্রায় এক বছরেরও বেশি কিন্তু এখনো আবাসিকতা পায়নি। আবাসিকতা না পাওয়ায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে মেসে হচ্ছে। হলের সিট পেলে খরচ অনেকটা কমতো।"
ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম বলেন, "আবাসিকতা না পাওয়ায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে মেসে থাকতে হচ্ছে। পাশাপাশি মেসের পরিবেশ নিয়েও অনেক সমস্যা হয়। হলে থাকলে আবাসন সংক্রান্ত খরচটা লাগতো না।"
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এনামুল হক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর আমারও স্বপ্ন ছিল হলে থাকার। কিন্তু আবাসন সংকট ও গণরুম সংস্কৃতির কারণে সেই সুযোগ হয়নি। এখন মেসে থেকে ভাড়া, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট ও খাবারসহ নানা খরচ বহন করতে হচ্ছে, যার অনেক কিছুই একজন আবাসিক শিক্ষার্থীর লাগে না। তাই আমি চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত হোক, যাতে সব শিক্ষার্থী সমান সুযোগ-সুবিধা পায়।
আইসিটি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফয়সাল বিন ফরিদ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের মেসগুলোতে প্রায়ই লোডশেডিং হয়। আবার কার্ড মিটারে আলাদাভাবে বিদ্যুতের খরচ বহন করতে হয়। সুযোগ-সুবিধার তুলনায় ভাড়াও বেশি। এত খরচের পরও প্রত্যাশিত পরিবেশ পাওয়া যায় না, যা পড়াশোনায় প্রভাব ফেলে।”
তবে ইতোমধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের মেস গুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক দপ্তরে এসে সেগুলোর নাম-ঠিকানা লিপিবদ্ধ করানোর কথা বলা হয়েছে। প্রশাসন কেবল লিপিবদ্ধ থাকা মেস গুলোতেই শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য উৎসাহিত করবে বলে জানায়।
এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, "আমরা আগামী সপ্তাহের সোমবার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, আসেপাশের মেস মালিক, কুমিল্লার প্রশাসন মিলে একটা আলোচনা সভার আয়োজন করেছি। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি এই আলোচনায় মেসের ভাড়া কিভাবে একটা নির্দিষ্ট রেঞ্জে আনা যায় তা নিয়ে কথা বলব।"
তিনি আরো বলেন, "নতুন ক্যাম্পাস চালু হলে আমাদের আবাস সংকট অনেকটাই কমবে। আমরা আশাবাদী শীঘ্রই নতুন ক্যাম্পাসর কাজ শেষ হবে।"