পথিকৃৎ কুমিল্লা শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির পাদপীঠ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শহর। কুমিল্লা জনসংখ্যা এবং আয়তনে বাংলাদেশের ১১তম বৃহত্তম মহানগর, যেখানে কম বেশি ৮ লক্ষ মানুষের বসবাস। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে গোমতী নদীর তীরে অবস্থিত কুমিল্লা শহর অনেক আগে থেকেই ভৌগোলিক ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে ছিল খুবই সমৃদ্ধ জনপদ। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের পাশে অবস্থিত কুমিল্লা পুরো দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কুমিল্লায় একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল আছে; যেখানে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। কুমিল্লার কোটবাড়ীতে রয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)। কুমিল্লায় আছে একটি শিক্ষা বোর্ড, সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ৫টি মেডিকেল কলেজ। এ মহানগরে অনেক নামকরা স্কুল কলেজ রয়েছে। একদা ব্যাংক ও ট্যাংকের শহর খ্যাত কুমিল্লা বিদেশে কর্মী পাঠানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় একটি জেলা; প্রতি বছর স্থানীয় পরিবার ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে, যা জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়তা করে। কুমিল্লাতে বহুসংখ্যক পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে। কোটবাড়ীর শালবন বৌদ্ধবিহার, নৈসর্গিক লালমাই ও ময়নামতি পাহাড়, ময়নামতি জাদুঘর, ইকোপার্ক, ঐতিহ্যবাহী ধর্মসাগর, নানুয়াদিঘী, রানীরদীঘি, জগন্নাথদিঘী পর্যটকদের কাছে সবসময়ই আকর্ষণীয় স্থান। কুমিল্লার খাদি, তাঁতশিল্প, কুটিরশিল্প, বিজয়পুরের মৃৎশিল্প, মাতৃভান্ডারের রসমালাই ও ময়নামতির শীতলপাটির খ্যাতি রয়েছে বিশ্ব জুড়ে। কুমিল্লায় সিটি করপোরেশন, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা হয়েছে। কিছুদিন বাদে কুমিল্লা বিভাগ হতে যাচ্ছে। এতো সব অর্জনের কারনে কুমিল্লার নাগরিকরা এখন অন্য অনেক শহর/জেলার নাগরিকদের কাছে ঈর্ষার পাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
শিক্ষা সংস্কৃতির শহর কুমিল্লা একটা সময় সুপরিকল্পিত ও স্বস্তিকর জীবনের প্রতিশ্রæতি নিয়ে গড়ে উঠেছিল। ঝাউতলা, বাগিচাগাঁও, বাদুরতলা, তালপুকুরপাড়, নজরুল এভিনিউ, নানুয়াদিঘীর পাড়, রানীরদিঘীর পাড়, ধর্মসাগর পাড় এ নামগুলো নিলেই মনের গহীনে কোথায় যেন কবিতার সুর বেজে উঠতো। অন্যদিকে কান্দিরপাড়, রাজগঞ্জ বাজার, ছাতিপট্টি, চকবাজার নামগুলো এ শহরের ব্যবসা- বাণিজ্যের ছবিটা চোখের সামনে তুলে ধরতো। কিন্তু বর্তমানে কুমিল্লা শহর বলতে আমরা বুঝি ট্রাফিক জ্যাম, ধুলোবালি, গাড়ির হর্ন আর বড় বড় দালানকোঠার প্রাণহীন লোকালয়। অনেকেই ইদানীং কুমিল্লাকে অটোরিকশার শহর হিসেবে আখ্যায়িত করছে। এ যেন লোভ এবং লাভের চক্রযানে আটকে যাওয়া এক অস্থির জীবনের প্রতিচ্ছবি। বড় বড় এ্যাপার্টমেন্ট, শপিংমল হচ্ছে, কিন্তু অবকাঠামো করতে গিয়ে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি কতটুকু বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে সেটা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। কুমিল্লার রাস্তাঘাট প্রশস্ত হচ্ছে না, ড্রেন ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ বা ড্রেনে ময়লা ফেলে ভরাট করার কারণে অল্প বৃষ্টিতেই শহর পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। কুমিল্লা শহরে প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষ বিভিন্ন কাজে আসেন। কাজ সেরে দিনের শেষে আবার শহর ছেড়ে যান। সেসব মানুষদের ব্যবহারের জন্য কোন বিশ্রামাগার এবং গণশৌচাগার সুবিধা এ শহরে নেই। এতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও কষ্ট পান, বিব্রত হন। কুমিল্লায় আমরা এখনো কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। অটোরিক্সা, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের কারণে মহানগরীতে হাঁটার উপায় নেই, এমনকি রাস্তা পারাপারেও অনেক বেগ পেতে হয়। স্কুল গামী ছাত্র-ছাত্রীরা, বয়স্ক মানুষ ও নারীরা এ কষ্টের ভুক্তভোগী। পুরো শহর জুড়ে যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং এবং নিয়ম না মেনে যন্ত্রযান চালানোর প্রবনতা সবার জন্যই বিপদজনক হয়ে পড়েছে। কুমিল্লা জনসংখ্যা অনুপাতে ছাত্র-ছাত্রীদের ভালো মানের স্কুলের সংখ্যা বাড়েনি। কুমিল্লা মহানগরে শিশু, নারী ও বয়স্কদের সময় কাটানোর জন্য বা হাটাহাটি করার মতো উন্মুক্ত জায়গা নেই বললেই চলে। কুমিল্লায় পারিবারিক বিনোদনের সুযোগের অভাবে শিশু-কিশোরদের পরিপূর্ণ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। প্রকৃতির সান্নিধ্য, সবুজ গাছপালা, আর নির্মলতার মূল আবেদন আমরা ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি। আমরা ভুলেই গেছি যে সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য আমাদের গাছপালা, শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণবিহীন শান্তিময় পরিবেশ কতটা প্রয়োজন। এসবের অভাবে আমাদের জীবনীশক্তি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে, আমাদের রক্তচাপ বাড়ছে, অল্পবয়সেই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছি। ব্যক্তির, পরিবারের, রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যখাতে খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
একটি আদর্শ ও মানবিক শহরের মূল ভিত্তিই হলো তার অন্তর্ভুক্তিমূলক নকশা। শহরগুলোর উচিত তাদের কাঠামো এমনভাবে করা যাতে তা পরিবেশবান্ধব হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে। একটি টেকসই শহর হলো এমন একটি নগর ব্যবস্থা, যা পরিবেশ, সমাজ ও অর্থনীতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদা পূরণ করে। একটি আদর্শ, বসবাসযোগ্য, আধুনিক ও পরিকল্পিত শহরের মূল বৈশিষ্ট্য হলো সেখানে সুপরিকল্পিত অবকাঠামো, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা এবং সহজ যাতায়াত ও সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থা থাকবে। পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান এবং ব্যবসা-বাণিজ্য বান্ধব পরিবেশ তরুণ ও উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করে শহরের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখবে। মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার সহজ প্রাপ্যতা, এবং সবুজ পার্ক, লেক, খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, মিউজিয়াম এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাÐের সুযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের সহজলভ্যতা শহরটিকে মানুষের কাছে বসবাসের জন্য আকর্ষনীয় করে তুলবে। পর্যাপ্ত পার্ক, খেলার মাঠ এবং উন্মুক্ত সবুজ স্থান একটি সুস্থ সমাজ, উন্নত জীবনযাত্রা এবং পরিকল্পিত নগর গড়ার অন্যতম প্রধান শর্ত। এগুলো ইট-পাথরের শহরকে প্রাণবন্ত করে তোলে - শিশুদের বিকাশ, প্রবীণদের সুস্থতা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। মিউজিয়াম এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শহরের ঐতিহ্য ও বৈচিত্রকে টিকিয়ে রাখে এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সহজ প্রাপ্যতা এবং উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা নাগরিকদের প্রতিদিনের জীবনকে সহজ ও চাপমুক্ত করে। একটি শহর যখন শিশুবান্ধব, নারীবান্ধব ও প্রবীণবান্ধব হয়; নারী, শিশু ও প্রবীণরা যখন কোনো ভয় ছাড়া দিন বা রাত যেকোনো সময় নিরাপদে চলাচল করতে পারেন, তখন শহরের গণপরিবহন ও রাস্তাঘাট সবার জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ হয়ে ওঠে। ফুটপাত হুইলচেয়ার বা শিশু-গাড়ির উপযোগী হওয়া, গণশৌচাগার ও পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকা একটি শহরের বাসযোগ্যতা বহুলাংশে বাড়িয়ে দেয়।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) ২০১১ সালে কুমিল্লা পৌরসভা ও কুমিল্লা সদর দক্ষিণ পৌরসভা একত্রিত করে এর ২৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত হয়। কুমিল্লার নাগরিকদের আরো ভালোভাবে সেবা দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬ সালে কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কুউক) ও কুমিল্লা ওয়াসা গঠন করা হয়েছে। তিনটি সংস্থার সেবা দান প্রক্রিয়া ও কাজের পরিধি ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য একটাই। আর তা হলো কুমিল্লা মহানগরের নাগরিকদের জীবনকে আরো আরামদায়ক ও সহজ করে তোলা- কুমিল্লাকে বাসযোগ্য করে তোলা। একটি নিরাপদ, টেকসই নগর নির্মাণে সিটি করপোরেশনের মতো অন্যান্য সেবা সংস্থারও ভূমিকা রয়েছে। কুমিল্লাকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন এবং পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন (কুসিক), কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কুউক), কুমিল্লা ওয়াসা-সহ বেসরকারি পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সকলকে নিয়ে একসাথে কাজ করা অপরিহার্য। উদ্দেশ্য যদি হয় শহরটাকে গড়ার, তাহলে কাজের পরিধির ভিন্নতা কোন সমস্যা তৈরি করবে না। নগর পরিকল্পনায় প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, সামাজিক সচেতনতা, প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার এবং প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ। সরকারি ও বেসরকারি খাতকে একযোগে কাজ করতে হবে। পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হলো বাস্তবতা স্বীকার করে সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়া। একটি শহর নিয়ে পরিকল্পনা করলেই হয় না, সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য থাকতে হয় একাধিক প্রতিষ্ঠান, তাদের মধ্যে সুস্পষ্ট দায়িত্ববন্টন ও সহযোগিতা। যেকোনো উন্নয়ন কার্যক্রম কার্যকর ও টেকসই করতে জোরালো সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি, কারণ এটি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং কাজের পুনরাবৃত্তি রোধ করে। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকলে তহবিলের অপচয় কমে। নিয়মিত এবং স্পষ্ট তথ্য শেয়ারিং বা যোগাযোগের মাধ্যমে ভুল বোঝাবুঝি এড়ানো যায়। যৌথ তদারকির মাধ্যমে কাজে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধি পায়, কাজের মান বাড়ে, অনিয়মের সুযোগ কমে যায়।
একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নগর গুলোকে আবাসন, অবকাঠামো, পরিষেবা, নাগরিক সুবিধাদি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব ও নগর দুর্যোগ মোকাবিলায় অধিকতর প্রস্তুতি নিতে হবে। স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে পানির অপচয় রোধ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা, গণপরিবহনের পরিবেশবান্ধবীকরণ, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার, এবং শহরের গাছপালা রক্ষার সুনিশ্চিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, হোল্ডিং ট্যাক্স ইত্যাদি সেবা সমন্বয় করতে হবে। দৈনন্দিন জীবনে বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ কমাতে হবে। বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের/নাগরিকের নগর সেবা চাহিদার ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকাই স্বাভাবিক। সবার চাহিদাকে যথাসম্ভব গুরুত্ব দিয়ে নগরকে সাজানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নগর ব্যবস্থাপনার আধুনিক ধারণা কাজে লাগাতে হবে। তাই কুমিল্লা মহানগরের উন্নয়নে যে সকল উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে সেগুলো যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা পূরণের দৃষ্টিকোন থেকে গ্রহণ করা হয়। নাগরিকদের সেবা নিশ্চিত করতে হলে সবার সমন্বিতভাবে কাজের কোনো বিকল্প নেই। সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া একটা অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়া সম্ভব নয়।
জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশ বাস করবে শহরগুলোয়। তখন বর্তমানের সংকটগুলো আরো প্রকট হবে। বিশেষ করে শহরগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আমাদের দেশে গড়ে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ৩০০ জন বসবাস করে। বাংলাদেশের নগর এলাকার জনঘনত্ব ও জনসংখ্যা বিশ্বের অধিকাংশ বাসযোগ্য শহরের তুলনায় অত্যন্ত বেশি। সীমিত অবকাঠামো, আবাসন ও সেবামূলক ব্যবস্থার তুলনায় মানুষের সংখ্যা অতিরিক্ত হওয়ায় শহরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। অধিক জনসংখ্যার কারণে শহরে যানজট, জলাবদ্ধতা, বায়ুদূষণ, জনস্বাস্থ্য বিপর্যয় প্রভৃতি সমস্যা বাড়তে চলেছে। ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি মানুষ অর্থাৎ প্রায় ৫৪% মানুষ শহরে থাকবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কুমিল্লা মহানগরকে সাজাতে হবে।
একটি শহরকে বাসযোগ্য ও সুন্দর করে তুলতে নাগরিকদের সচেতনতা এবং নগরবান্ধব আচরণ অত্যন্ত জরুরি। কুমিল্লার নাগরিকদেরও শপথ নিতে হবে ট্রাফিক আইন মেনে চলার, ফুটপাতে প্রতিবন্ধকতা তৈরী না করার, বিল্ডিং কোড মেনে ইমারত/অবকাঠামো নির্মাণের, শহরকে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখার, শব্দ ও পরিবেশ দূষণ রোধ করার, গাছপালা রক্ষা করার, নাগরিক সম্পদ ও সেবা পানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া এবং অপচয় রোধ করার এবং সর্বোপরি আইনশৃঙ্খলা মেনে নাগরিক জীবন যাপন করার। মনে রাখতে হবে এ শহরকে বাসযোগ্য করে তোলার দায়িত্ব কারো একার নয়, এ দায় আমাদের সবার। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে ধীরে ধীরে নির্মিত হতে পারে এক নতুন শহর-যেখানে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ থাকবে, প্রবীণদের জন্য থাকবে হাঁটার পথ, কাজ শেষে মানুষ ফিরবে নির্মল বাতাসে শ্বাস নিতে নিতে। এমন একটি শহর নিঃসন্দেহে সবার পরম কাক্সিক্ষত।
কুমিল্লা মহানগরীতে যে তিনজন ব্যক্তিত্ব কুমিল্লার নাগরিকদের সেবা প্রদানকারী তিনটি সংস্থার প্রধান হিসেবে সরকার কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছেন উনাদের কাজের সক্ষমতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতা যথেষ্ট ভালো, খুবই প্রশংসনীয়। উনাদের এবার সুযোগ এসেছে বড় পরিসরে নাগরিকদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে কাজ করার। আমার বিশ্বাস উনারা সেটা মনপ্রাণ দিয়ে করার প্রচেষ্টা চালাবেন। উনাদের এ প্রচেষ্টা সফল হবে তখনই যখন তিনটি সংস্থা সম্মিলিতভাবে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে কার্যকর আলাপ আলোচনার মাধ্যমে কাজে নামবেন। কুমিল্লার অনেক নাগরিক দেশ-বিদেশে বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থায় কর্মরত আছেন। তাদের অভিজ্ঞতাকে এক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে। সবার আগে প্রয়োজন অংশীজন আলোচনার আয়োজন করা। এ মহানগরীতে বাস করার আনন্দ, কষ্ট, হতাশা, ভবিষ্যৎ প্রত্যাশার কথা শুনতে হবে নাগরিকদের নিজেদের বয়ান থেকেই। সে আয়োজনে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। পরিকল্পনা যত বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে তত বেশি তার সফল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একটি শহর যাকে বলে ‘কমপ্লিট টাউনশিপ’ তা একদিনে/একমাসে/একবছরে গড়ে উঠে না, ধাপে ধাপে সময় নিয়ে বিভিন্ন জনের কর্মের ফলে গড়ে উঠে। প্রতিটি ধাপই অংশ হয় ভবিষ্যৎ শহরের। কুমিল্লার নাগরিকদেরও স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে আমরা একটি টেকসই ও বাসযোগ্য কুমিল্লার প্রত্যাশা করতে পারি। শুরু হোক আমাদের পথচলা আলেকিত আগামীর অন্বেষায়।
লেখকঃ সমাজকর্মী, গবেষক, কলাম লেখক এবং কুমিল্লা মহানগরীর একজন সাধারণ নাগরিক।
