নবী সুলাইমান (আ.) ইন্তেকালের পরও কিছু কাল লাঠির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর জিনেরা তিনি জীবিত আছেন মনে করে তার অনুগত থেকে তার নির্দেশিত কাজ কাজ চালিয়ে যেতে থাকে এই ঘটনার সত্যতা কোরআনের আয়াত থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন:
‘যখন আমি সুলাইমানের মৃত্যু ঘটালাম, তখন উই পোকাই জিনদেরকে তার মৃত্যুর বিষয়ে জানাল; যেগুলো সুলাইমানের লাঠি খাচ্ছিল। যখন সুলাইমান মাটিতে পড়ে গেল, তখন জিনেরা বুঝতে পারল যে, ওরা যদি অদৃশ্য বিষয়ে জানত, তাহলে ওরা এত দিন লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না। (সুরা সাবা: ১৪)
কিন্তু এই ঘটনা কখন ঘটেছিল এ ব্যাপারে একাধিক মত পাওয়া যায়। অনেকের মতে এই ঘটনাটি ঘটেছিল বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণের সময়। কিন্তু অনেকের মতে সুলাইমান (আ.) জীবিত থাকতেই বায়তুল মোকাদ্দাস নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছিল।
বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার তখনও এক বছর বাকি। সুলাইমান (আ.) একদিন মৃত্যুর ফেরেশতাকে বলেছিলেন, ‘যখন আমার মৃত্যুর নির্দেশ আসবে, আমাকে জানাবেন।’ একদিন মৃত্যুর ফেরেশতা তার কাছে এসে বললেন, ‘হে সুলাইমান, আপনার ব্যাপারে আমাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আপনার আর অল্প হায়াত বাকি আছে।’
সুলাইমান (আ.) তখন শয়তানদের ডাকলেন। তাদের দিয়ে তিনি কাচের একটি প্রাসাদ নির্মাণ করালেন। প্রাসাদটির কোনো দরজা ছিল না। এরপর তিনি সেখানে প্রবেশ করে নামাজে দাঁড়ালেন এবং একটি লাঠির ওপর ভর করলেন। কিছুক্ষণ পর মৃত্যুর ফেরেশতা এসে তার রুহ কবজ করলেন। কিন্তু সুলাইমান (আ.) আগের মতোই লাঠির ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি মৃত্যুর বিষয়টি জিনদের কাছ থেকে গোপন রাখার জন্যই এমন ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
তাফসিরে বাগাবিতে এসেছে, সুলাইমান (আ.) দীর্ঘ সময় বায়তুল মুকাদ্দাসে একান্তে অবস্থান করতেন। কখনও এক বছর, কখনও দুই বছর; আবার কখনও এক মাস, দুই মাস কিংবা এর চেয়ে কম-বেশি সময়। তিনি নিজের খাবার ও পানীয় সঙ্গে নিয়ে মেহরাবে প্রবেশ করতেন। তার মৃত্যুর সময়ও তিনি এভাবেই বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করেছিলেন।
প্রতিদিন সকালে তার মেহরাবে একটি করে গাছ জন্মাত। সুলাইমান (আ.) গাছটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, ‘তোমার নাম কী?’ গাছটি তার নাম বলত। তিনি আবার জিজ্ঞেস করতেন, ‘তুমি কী কাজে জন্মেছ?’ গাছটি তার কাজের কথা জানাত। এরপর তিনি সেটিকে কেটে ফেলার নির্দেশ দিতেন। যদি গাছটি রোপণের জন্য জন্মাত, তিনি তা রোপণ করতেন। আর যদি কোনো ওষুধের জন্য জন্মাত, তিনি তার নাম ও উপকারিতা লিখে রাখতেন।
এভাবে একদিন তার মেহরাবে একটি অদ্ভূত গাছ জন্মাল। তিনি গাছটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কী?’ গাছটি বলল, ‘আমি খরুবা।’ তিনি বললেন, ‘কী উদ্দেশ্যে তুমি জন্মেছ?’ গাছটি উত্তর দিল, ‘আপনার মসজিদ ধ্বংস হওয়ার জন্য।’
সুলাইমান (আ.) কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন। তারপর বললেন, ‘আমি জীবিত থাকা অবস্থায় আল্লাহ এই মসজিদ ধ্বংস করবেন না। তুমিই আমার মৃত্যুর এবং বায়তুল মুকাদ্দাস ধ্বংস হওয়ার নিদর্শন।’
তিনি গাছটি তুলে নিজের একটি দেয়ালের পাশে রোপণ করলেন। এরপর আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, ‘হে আল্লাহ! জিনদের কাছ থেকে আমার মৃত্যুর বিষয়টি গোপন রাখুন, যাতে মানুষ জানতে পারে, জিনেরা গায়েব জানে না।’ কারণ জিনেরা মানুষের কাছে দাবি করত, তারা গায়েবের কিছু বিষয় জানে এবং আগামীকাল কী ঘটবে, তাও তারা জানে।
এরপর সুলাইমান (আ.) মেহরাবে প্রবেশ করলেন। লাঠির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে লাগলেন। এ অবস্থাতেই তার ইন্তেকাল হলো। মেহরাবের সামনে ও পেছনে কয়েকটি জানালা ছিল। জিনেরা বাইরে থেকে তাকে দেখতে পেত। তারা মনে করত, সুলাইমান (আ.) জীবিত আছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মেহরাবে অবস্থান করে নামাজ পড়তেন বলে তার এভাবে ভেতরে অবস্থান করাকে তারা অস্বাভাবিক মনে করল না।
এভাবে কয়েক মাস কেটে যাওয়ার পরও জিনেরা আগের মতোই সুলাইমানের (আ.) জন্য কঠিন কাজ করে যেতে থাকে। তারা জানত না, যাকে জীবিত মনে করে তারা কাজ করছে, তিনি আসলে অনেক আগেই মৃত্যুবরণ করেছেন। প্রায় এক বছর কেটে যাওয়ার পর ঘুণপোকা বা উইপোকা তার লাঠির ভেতর ঢুকে সেটি খেতে শুরু করল। এক সময় লাঠিটি দুর্বল হয়ে ভেঙে গেল। সুলাইমান (আ.) মাটিতে পড়ে গেলেন। তখনই জিনেরা জানতে পারল, সুলাইমান (আ.) আর জীবিত নেই।
দ্বিতীয় মত
সুলাইমানের (আ.) জীবদ্দশাতেই বায়তুল মুকাদ্দাসের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এরপর তিনি বারো হাজার ষাঁড় এবং এক লাখ বিশ হাজার ভেড়া কোরবানি করেন। তিনি যেদিন নির্মাণকাজ শেষ করেছিলেন, সেই দিনকে উৎসবের দিন হিসেবে নির্ধারণ করেন। ইমাম কুরতুবির (রহ.) মতে এটিই সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য মত, সহিহ হাদিস থেকে এই মতের পক্ষে দলিল পাওয়া যায়।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘সুলাইমান ইবনে দাউদ (আ.) যখন বায়তুল মাকদিসের নির্মাণকাজ শেষ করলেন, তখন তিনি আল্লাহর কাছে তিনটি জিনিস চাইলেন: এমন বিচারবোধ, যা তার (আল্লাহর) বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে; এমন রাজত্ব, যা তার পর আর কারও জন্য উপযুক্ত হবে না; এবং যে ব্যক্তি কেবল নামাজের উদ্দেশ্যে এই মসজিদে আসবে, সে যেন তার পাপ থেকে এমন অবস্থায় বের হয়, যেন সেদিনই তার মা তাকে জন্ম দিয়েছেন (অর্থাৎ সে সম্পূর্ণ পাপমুক্ত হয়ে বের হয়)।’ এরপর রাসুল (সা.) বলেন: ‘প্রথম দুটি তো তাকে দেওয়া হয়েছিল, আর আমি আশা করি তাকে তৃতীয়টিও দেওয়া হয়েছে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ১৪০৮)
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট যে বায়তুল মুকাদ্দাস নির্মাণকালে নবী সুলাইমানের (আ.) ইন্তেকাল হয়নি। বরং তার ইন্তেকাল ও লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে থাকার ঘটনা অন্য কোনো ভবন নির্মাণের সময় হয়েছিল।
