শুক্রবার ● ৯ অক্টোবর ২০২৬
২৪ আশ্বিন ১৪৩৩
উম্মতের প্রতি নবীজির (সা.) দরদ ও ওয়াহশির ইসলাম গ্রহণ
প্রফেসর মুশফিক আহমাদ (রহ.)
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৫৭ এএম |


মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ওয়াহশী বিন হারবের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কাছে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে দূত পাঠালেন। এই ওয়াহশী সেই ব্যক্তি, যিনি ওহুদের প্রান্তরে রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সবচেয়ে প্রিয় ও আদরের চাচা হজরত হামজাকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শহীদ করেছিলেন। তখনো তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি, বহু পরে তিনি সাহাবি হয়েছেন। স্বাভাবিক যুক্তিতে প্রিয় চাচাকে যে হত্যা করেছে, তার ওপর মানুষের চরম রাগ ও ক্ষোভ থাকার কথা। মনোভাব এ রকম হওয়ার কথা যে, সে জাহান্নামে যাক এবং আরও কঠিন কোনো আজাবে পতিত হোক। কিন্তু রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চাচার খুনির কাছেও বিশেষ গুরুত্বের সাথে দাওয়াত পাঠালেন।
রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রেরিত দূত যখন তার কাছে পৌঁছলেন, তখন ওয়াহশী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আমি তো কোরআন শরিফের সেই আয়াত সম্পর্কে জানি, যেখানে বলা হয়েছে যে ব্যক্তি শিরক করে, অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করে এবং জিনায় লিপ্ত হয়, সে চিরতরে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে এবং তার আজাব দ্বিগুণ করা হবে। আমি তো এর সবই করেছি। শিরক করেছি, কতল করেছি, জিনাও করেছি। সুতরাং আমার তো জাহান্নামেই যাওয়া অবধারিত, আমার আর ঈমান এনে লাভ কী?
দূত ফিরে এসে রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পুরো বিষয়টি জানালেন। তখন আল্লাহ তাআলা সান্ত¡নার বাণী নিয়ে আয়াত নাজিল করলেন, ‘কিন্তু যে তওবা করেছে, ইমান এনেছে এবং নেক আমল করেছে; আল্লাহ তাআলা তার সমস্ত গুনাহকে নেকি দ্বারা বদলে দেবেন এবং আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
এই আয়াতের বার্তা নিয়ে দূত আবার ওয়াহশীর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কাছে গেলেন। ওয়াহশী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) শুনে বললেন, ঠিক আছে, তওবা তো করতে পারব এবং ইমানও আনতে পারব; কিন্তু আমি তো নিশ্চিত নই যে আমি নিয়মিত নেক আমল করতে পারব কি না! আমার তো এতেও নাজাত হবে না, কারণ নেক আমলের শর্ত পূরণ করা কঠিন।
দূত আবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে এলেন এবং রাসুলকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বিষয়টি অবহিত করলেন। এরপর আল্লাহ তাআলা আবার আয়াত নাজিল করলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তার সাথে শরিক করা ছাড়া অন্য যে কোনো গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন।’
দূত এই সুসংবাদ নিয়ে আবার ওয়াহশীর কাছে গেলেন। ওয়াহশী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, আল্লাহ তাআলা যাকে চান ক্ষমা করবেন ঠিক আছে, কিন্তু আমার ব্যাপারে তিনি আদৌ চাইবেন কি না, তা তো আমি জানি না! এ কথা বলে তিনি এবারও ইমান আনলেন না।
দূত আবার খালি হাতে ফিরে এলেন। তখন আল্লাহ তাআলা পরম করুণাময় ও দয়ালুরূপে সান্ত¡নার চূড়ান্ত বার্তা নাজিল করলেন, ‘হে আমার সেই বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর অবিচার বা সীমাহীন পাপ করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
এই আয়াত নিয়ে যখন দূত আবার উপস্থিত হলেন, তখন ওয়াহশী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে! এবং তিনি ইসলাম গ্রহণ করলেন।
পুরো এই ঘটনাটি গভীরভাবে লক্ষ্য করলে মনে হবে, কোরআনের আয়াত নাজিল হচ্ছে আর আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বারবার দূত পাঠাচ্ছেন এখানে যেন ওয়াহশির বিন্দুমাত্র কোনো ঠেকা নেই, বরং সমস্ত ঠেকা যেন আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! ওয়াহশি একের পর এক শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন আর তাঁরা সেই শর্তের জবাব নিয়ে বারবার হাজির হচ্ছেন। স্বাভাবিক নিয়ম হলো, যার প্রয়োজন বা ঠেকা থাকে, সেই তো শর্ত মানতে বাধ্য হয়। প্রশ্ন জাগতে পারে, ওয়াহশি এত বেপরোয়া ও ঠেকামুক্ত হলেন কীভাবে, আর আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এত ঠেকায় পড়লেনই বা কেন?
এর মূল কারণ হলো, ওয়াহশি বেপরোয়া ছিলেন তাঁর নিজের জাহেলিয়াত বা অজ্ঞতার কারণে। নেশাগ্রস্ত মানুষ যেমন নিজের ভালোমন্দ বোঝে না এবং পরিণতি নিয়ে বিন্দুমাত্র পরোয়া করে না, জাহেল বা অজ্ঞ মানুষও তেমনি নিজের আসল ক্ষতি বুঝতে পারে না। পক্ষান্তরে, আল্লাহর রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই ব্যাকুলতা ও ঠেকা ছিল অগাধ ভালোবাসার কারণে। পিতা-মাতা সন্তানের প্রতি যত কষ্টই পাক না কেন, সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসার কারণে তারা কখনোই তাকে ধ্বংসের মুখে ছেড়ে দিতে পারে না। হয়তো রাগ করে সাময়িকভেবে ‘যা দূর হয়ে যা’ বলে, কিন্তু পরক্ষণেই আবার বুকে টেনে নেয়, তার মুক্তির জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়ে এবং অন্যের সাথে পরামর্শ করতে থাকে কী করা যায়।
এ থেকেই প্রমাণিত হয়, দাওয়াত কেবল কিছু কথা বলে দায় সারার নাম নয়। দাওয়াতের আসল প্রাণ হলো অন্তরের এমন এক তীব্র অনুভূতি, যেখানে হিদায়াতপ্রার্থীর নাজাতের জন্য নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ব্যাকুলতা কাজ করে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের পেছনে মেহনত করেছেন, যাদের দ্বারে দ্বারে দূত পাঠিয়েছেন, যাদের জন্য কেঁদেছেন এবং দোয়া করেছেন, সেই কাফের ও পথভ্রষ্ট মানুষগুলো তো নিজেদের মধ্যেও ছিল বেপরোয়া; কিন্তু নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সেই অকৃত্রিম ভালোবাসাই পরবর্তী সময়ে তাদেরকে মহান সাহাবিতে রূপান্তরিত করেছে।
ইবাদতের আসল প্রাণ যেমন ইখলাস বা আল্লাহর একক সন্তুষ্টি ও ভালোবাসা, তেমনি দাওয়াতের প্রাণ হলো মানুষের প্রতি নিখাদ দরদ ও মহব্বত। ইখলাসের কারণে ছোট আমলও আল্লাহর দরবারে পাহাড়সম মর্যাদাসম্পন্ন হয়ে যায়। ঠিক তেমনি দাওয়াতের মধ্যে যত বেশি এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও হিদায়াতের আকুতি থাকবে, সেই দাওয়াত তত বেশি প্রভাবশালী ও ফলপ্রসূ হবে। এর ব্যতিক্রম কেবল বাহ্যিক কথার ফুলঝুরি ও লোকদেখানো কসরত মাত্র, যার ভেতরে কোনো আধ্যাত্মিক প্রাণ বা কার্যকারিতা থাকে না।
পূর্বসূরি নবী-রাসূলগণ তাদের নিজ নিজ জাতির কাছে প্রেরিত হয়ে তাদের প্রতি বুকভরা ভালোবাসা ধারণ করেছিলেন। তারা কওমের অকল্যাণ নয়, বরং কল্যাণ চেয়েছেন। সাধারণ মানুষের গালাগালি ও নির্যাতন সত্তে¡ও তাঁরা বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। পবিত্র কোরআনে তাদের এ বক্তব্য বর্ণিত হয়েছে, ‘আমি তোমাদের কাছে এর বিনিময়ে কোনো প্রতিদান চাই না।’ মানুষ যখন খাঁটি ভালোবাসার টানে কোনো কাজ করে, তখন সে কোনো পার্থিব প্রাপ্তির আশা রাখে না; তার একমাত্র চাওয়া থাকে, হে আমার আপনজন, তুমি যেন হিদায়াত পাও, তুমি যেন চিরকালের আজাব থেকে মুক্তি পাও।
দাওয়াতের এই মহৎ দায়িত্ব যিনিই পালন করতে চাইবেন, তাকে প্রথমে নিজের অন্তরে এই গভীর ভালোবাসা ও দরদ তৈরি করতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) ঠিক এই শিক্ষাটাই রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সান্নিধ্য থেকে লাভ করেছিলেন।
গ্রন্থনা: মুসআব আব্দুল্লাহ














http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২