
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার দৌরাত্ম্য বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে অনিয়ন্ত্রিত বিধিবহির্ভূতভাবে চলাচল করা ব্যাটারিচালিত রিকশা নিয়ন্ত্রণে ই-রিকশা চালুর উদ্যোগ নেয় ডিএনসিসি। উদ্দেশ্য ছিল বুয়েটের মাধ্যমে ই-রিকশার একটি মানসম্মত নকশা তৈরি করে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে পরিচালনা করা। বহুল আলোচিত এ উদ্যোগের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও ই-রিকশা চালুর কার্যক্রমের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বরং ই-রিকশা চালু হওয়ার আগেই বরাদ্দের বড় একটি অংশ খরচ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ছাড়া ই-রিকশার নামে বরাদ্দ দেওয়া ২০ কোটি টাকা কোথায় কীভাবে খরচ হয়েছে, তা নিয়ে রয়েছে অস্পষ্টতা। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার ক্ষেত্রেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ই-রিকশার নকশা ও মান নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সম্পৃক্ততার কথা বলা হলেও কার্যক্রমের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ই-রিকশা চালু না হলেও এ খাতে কোটি কোটি টাকা ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ ব্যয় হয়েছে প্রশিক্ষণ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন এবং ল্যাপটপ কেনার পেছনে। আলোর মুখ না দেখায় পুরো টাকা ভেস্তে গেছে। সূত্রমতে, ২০ কোটি টাকার শুরুতেই দক্ষিণ সিটিকে দেওয়া হয়েছে ৫ কোটি টাকা। উত্তর সিটি রেখেছে বাকি ১৫ কোটি টাকা। রিকশাচালকদের প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ডিএনসিসি ৩০০টি ল্যাপটপ কিনেছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি ল্যাপটপের গড় মূল্য ১ লাখের বেশি। এ ছাড়া রিকশাচালকদের প্রশিক্ষণের জন্য উত্তরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ কোটি টাকা। দক্ষিণ সিটিতেও একই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় পাঁচটি করে মোট ১০টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়।
পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ই-রিকশার বিষয়টি শুরু থেকেই অস্পষ্ট ও উদ্দেশ্যহীন। নীতিমালা প্রণয়ন না করে নতুন করে ই-রিকশা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকায় আগে থেকেই বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচল করছে। তাই এ খাতে এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অটোরিকশা নামানো এবং প্রশিক্ষণের পেছনে কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় পর্যায়েও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে অর্থবহ কোনো আলোচনা করা হয়নি। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে ই-রিকশার ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়ার চেষ্টা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও বাস্তবায়ন নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো কার্যকর আলোচনা নেই। তবে গত ২৬ জুলাই ই-রিকশা কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হলেও আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। শুধু ই-রিকশা খাত দেখিয়ে যে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তাতে কোটি কোটি টাকা নামে-বেনামে খরচ দেখানো হয়েছে। এখানে বড় ধরনের সরকারি অর্থের নয়ছয় হয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে। সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে তৎকালীন কর্তৃপক্ষ চরম অস্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে। আশা করছি, সরকার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ই-রিকশা কার্যক্রমে কোটি কোটি টাকা লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
