
যুদ্ধ, সংঘাত, উদ্বাস্তু সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এ সময়ে শান্তি ও মানবতার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তার প্রথম ভাষণে তিনি যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনা, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতাকে পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্বজুড়ে যখন সামরিক শক্তির প্রদর্শন এবং সংঘাতের বিস্তার মানুষের নিরাপত্তাকে ক্রমেই অনিশ্চিত করে তুলছে, তখন বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এমন বার্তা আন্তর্জাতিক পরিসরে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল শান্তির ধারণাকে কেবল যুদ্ধ বন্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানবিক উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা। তার ভাষায়, বাংলাদেশের প্রত্যাশা এমন একটি শান্তিময় বিশ্ব, যেখানে মারণাস্ত্র নয়, বরং যুক্তিতর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা হয়ে উঠবে পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার। বর্তমানে দেশে দেশে যুদ্ধ বিশ্ববাসীকে কঠিন পরিস্থিতির ভেতর ঠেলে দিয়েছে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সমঝোতাপূর্ণ বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বানও জানান তিনি।
ফিলিস্তিন প্রশ্নেও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি বাংলাদেশের সমর্থন এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান হিসেবে মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি তুলে ধরেন। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশ আয়োজিত পৃথক আলোচনায়ও দ্রুত ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য আন্তর্জাতিক রোডম্যাপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।
জলবায়ু ন্যায়বিচার, স্বল্পোন্নত দেশের উত্তরণ, অভিবাসন এবং প্রযুক্তিতে ন্যায্য প্রবেশাধিকারের মতো বিষয়গুলোও তার বক্তব্যে স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল যেন কেবল ধনী ও উন্নত দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং উন্নয়নশীল দেশ ও সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছে যায়-এই প্রত্যাশা বৈশ্বিক বৈষম্য কমানোর বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য পূর্বানুমেয় অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ার প্রভাব দেশে দেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে।
বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের বক্তব্যের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি সুস্পষ্ট প্রত্যাশা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার কথা বলেছেন তিনি। তরুণদের কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন এবং শিশুদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টিও তার বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। দেশের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে তিনি ‘রিকভারি, রেস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন’-তিনটি ‘আর’-এর কৌশলের কথাও তুলে ধরেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আরেকটি ঐতিহাসিক দিক হলো, তারেক রহমানের মাধ্যমে জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা। তার বাবা শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও অতীতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ফলে তার এই ভাষণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি পারিবারিক ধারাবাহিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার-শান্তি, কূটনীতি, মানবিকতা, বহুপক্ষীয়তা, জলবায়ু ন্যায়বিচার, ফিলিস্তিনের অধিকার এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন-একই সূত্রে গাঁথা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের মানুষের ক্ষমতায়ন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুযোগ তৈরির প্রত্যয়ও উঠে এসেছে। বিশ্ব যখন নানা সংকটে বিভক্ত, তখন সংঘাতের বদলে সংলাপ এবং শক্তির বদলে মানবিকতার ওপর জোর দেওয়া বাংলাদেশের কণ্ঠকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে।
