
ঢাকায় গত কয়েক দিনে চারটি প্রতিষ্ঠান ও ভবনে রাতের অন্ধকারে আকস্মিক সশস্ত্র হামলা, মব ও ভাঙচুর করা হয়েছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, পরে সেই জমিগুলোতে টানানো হয় নতুন দখলদার বা ‘মালিকানা’র সাইনবোর্ড। আমরা সচরাচর দেখে থাকি, কোনো প্রতিষ্ঠানে কেউ ভাঙচুর করতে গেলে পুলিশ এসে বাধা দেয় এবং হামলাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু গত কয়েক দিনে মানুষের সম্পদ রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজধানীর মিরপুরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া, আদাবরে বাড়ি দখলের চেষ্টা এবং ইসিবি চত্বরে একটি হাউজিংয়ে একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটরের স্টুডিওসহ কয়েকটি বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মানুষ নিজেকে কোনোভাবেই নিরাপদ মনে করতে পারছে না।
ইসিবি চত্বর এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওসহ আশপাশে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় শুরুতেই ভুক্তভোগীরা চাঁদাবাজির ঘটনা হিসেবে অভিযোগ করেন। তবে স্থানীয় পুলিশের দাবি, চাঁদাবাজির ঘটনা নয়, মূলত নিউগিনি প্রপার্টিজের জমির মালিকানা নিয়ে আগের বিরোধের সূত্র ধরে সেখানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রশ্ন হলো, চাঁদাবাজি কিংবা জমির বিরোধ যা-ই হোক না কেন, মব সৃষ্টি করে দুর্বৃত্তরা কেন নাগরিকের সম্পদ ধ্বংস করবে! এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কী?
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া লুটপাট, ভাঙচুরের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, বরং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের জন্য অশনিসংকেত বলে উল্লেখ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি এসব ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সারা দেশে দলের আত্মশুদ্ধি অভিযানের আহ্বান জানিয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনায় দুটি সাধারণ লক্ষণ বা অভিযোগ সামনে এসেছে, তা হচ্ছে চাঁদাবাজি বা দখলবাজি। ফলে ঘটনাগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছেন তারা। তাদের মতে, পরিকল্পিতভাবে প্রায় একই কায়দায় ওই সব ভবন বা অবকাঠামোয় সংঘবদ্ধ হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। ফলে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা নতুন ‘ইস্যু’ বা আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ প্রায় সবখানে এসব ঘটনার নেপথ্যের মদদদাতা হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের নাম সামনে এসেছে। ধারাবাহিকভাবে যখন প্রায় একই ধরনের ঘটনা বা অপরাধ প্রবণতা দেখা যায়, তখন বিষয়গুলোকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এসব বিষয় সমাজের আইনশৃঙ্খলাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এ বিষয়গুলোকে কঠোরভাবে দেখার পাশাপাশি আইনি পদক্ষেপের জন্য পুলিশের আরও বেশি সক্রিয় ও আন্তরিক ভূমিকা জরুরি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, গত কয়েক রাতে বা বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রসহ যেসব ভবনে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে, সেগুলোর ধরন এবং অভিযোগ প্রায় একই রকমের। অর্থাৎ চাঁদাবাজি বা দখলবাজির সূত্র ধরে এসব ঘটনা ঘটেছে। যে কারণেই ঘটুক, সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এ ধরনের অভিযোগ বা ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। দল-মতের চিন্তা না করে বরং পুলিশকে নৈতিক ও পেশাদারি আচরণ করতে হবে। দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ ঘটনায় পুলিশের সাহায্য চেয়েও ভুক্তভোগীরা যথাসময়ে সহায়তা পাচ্ছেন না। এতে অপরাধ প্রবণতা বাড়তে থাকবে। ফলে এসব বিষয় কঠোরভাবে দেখতে হবে। অন্যথায় সরকার বা পুলিশ দায় এড়াতে পারবে না।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয় এবং মব সহিংসতা সে সময় বাড়তে থাকে। সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সাড়ে সাত মাস পার করলেও এখনো সে ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে, যা খুবই উদ্বেগজনক। এ ধরনের অপরাধ দমনে রাজনৈতিক সদিচ্ছা খুবই জরুরি। তাই এখন থেকেই সরকার কঠোর হস্তে অপরাধ দমন করতে না পারলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। এখনো লক্ষ করা যাচ্ছে, রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, ক্ষমতার প্রভাব খাটানোর জন্য পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে; যা গণতান্ত্রিক দেশে কখনোই কাম্য নয়। আমরা মনে করি, পুলিশ নিরপেক্ষভাবে যদি আইন প্রয়োগ করতে পারে, তাহলে অপরাধ ও অপরাধীদের তৎপরতা অনেকাংশে কমে যাবে।
