কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ডঃ নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা মানগরজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য ও দৌরাত্ম্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এ কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম নিয়ন্ত্রণে আনতে নড়ে-চড়ে বসেছে প্রশাসনও। অপরাধে জড়িয়ে পড়া এসব কিশোর-তরুণদের গ্রেপ্তারে চলছে একের পর এক অভিযান। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে অপ্রতিম হত্যায় কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার বিষয়ে সরাসরি কিছু না বলা হলেও আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে গ্রেফতার সকলেই কিশোর গ্যাং গ্রুপের সক্রিয় সদস্য বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। আলোচনায় উঠে আসছে তাদের সাম্প্রতিক অপরাধ কর্মকাণ্ডের নানান তথ্য।
স্থানীয়রা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের স্থান কোটবাড়ি এলাকার বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বিরুদ্ধে আগে থেকেই নানা অভিযোগ ও তথ্য-প্রমাণ থাকার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাদের তৎপরতা বেড়েছে। এ হত্যায় প্রধান অভিযুক্ত তুহিন ওই এলাকার সক্রিয় গ্যাং গ্রুপের সঙ্গে জড়িত। কিশোর বয়স থেকেই বখাটেপনায় জড়িত তুহিনের বিরুদ্ধে বাই চুরি, মানুষের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেওয়া, বিকট আওয়াজ তুলে বাইক চালানোসহ রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। অপর দুই অভিযুক্ত ফাহাদ এবং কামরুলের বিরুদ্ধেও রয়েছে কিশোর গ্যাং গ্রুপে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেলে বাসা থেকে ঘুরতে বের হয়ে নিখোঁজ হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছেলে এবং বর্ডার গার্ড স্কুলের ৭ম শ্রেণির ছাত্র ইশায়াত শাহারিয়ার অপ্রতিম (১৩)। পরদিন শনিবার দুপুরে কোটবাড়ি সালমানপুর এলাকার লালমাই পাহারের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তুহিন, ফাহাদ, কামরুল এবং সিয়াম নামে চারজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর মধ্যে তুহিন, ফাহাদ এবং কামরুল হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দী দিয়েছে। পরে বয়স বিবেচনায় ফাহাদ এবং কামরুলকে সংশোধনাগারে এবং তুহিন ও সিয়ামকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কাগারে প্রেরণ করা হয়েছে।
আলোচিত এ হ্যাকাণ্ড ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের পর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিলো- অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি ছিনিয়ে নিতেই মর্মান্তিক এ হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে। গ্রেপ্তার আসামিদের আগের কোনো অপরাধের বিষয়ে পুলিশের কাছে কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু এরপর থেকেই অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার প্রধান তিন আসামির কিশোর গ্যাং গ্রুপে এবং বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আসতে থাকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ও মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) কুমিল্লা মহানগরীর কোটবাড়ি এলাকার একটি সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কথিত গ্যাং-সম্পৃক্ততার বিভিন্ন ছবি ও কর্মকাণ্ডের তথ্য রয়েছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীরা। হত্যাকাণ্ডের আগের দিন পর্যন্ত বিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাংলোর সামনে ‘এনজয়’ নামে একটি ক্যাফেতে ছিলো তার আড্ডা। সেখানে বসেই সাত-আট জনকে সাথে নিয়ে স্টানবাজি, বিভিন্ন জনের টাকা তুলে দেওয়া-নেওয়া, মোটর বাইক নিয়ে বিকট আওয়াজ তুলে ছোটাছুটি এইসবই তার কাজ। এছাড়াও তুহিনের বিরুদ্ধে ২ লাখ টাকা দামের একটি মোটরসাইকেল চুরি করে নিয়ে যাওয়ারও অভিযোগের কথা শোনা গেছে এলাকাবাসীর কাছ থেকে।
এছাড়া এ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার অপর দুই আসামি মোজাম্মেল হোসেনের ফাহাদ (১৫) ও মো. কামরুল হাসান (১৬) ‘কোটবাড়ি বাইকার গ্রুপ’ নামে পরিচিত একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিলো। স্থানীয়দের দাবি, আলী সাইমন ও সোহাগ নামে দুই কিশোর ওই গ্রুপের নেতৃত্বে রয়েছে। মোহাম্মদ হানজালা নামে আরও এক কিশোরকে গ্রুপটির ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নেতৃত্বে গ্রুপটির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ছবি এবং অপ্রতিমের সঙ্গে আড্ডা ও শোডাউনের ছবিও ছড়িয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে- এই গ্যাং গ্রুপের চক্রের কারণেই প্রাণ দিতে হয়েছে স্কুল ছাত্র অপ্রতিমকে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে আলী সাইমন, সোহাগ ও মোহাম্মদ হানজালাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
জানা গেছে, কোটবাড়ি এলাকায় আরো কয়েকটি কিশোর গ্যাং গ্রুপ রয়েছে। সেখানকার বড় ধর্মপুরের রায়হান (১৯), ফাহাদ (১৯), ফকির মুড়ার শান্ত (১৮), ইমরান (২১), সানি (১৮) রাকাশের পাড় এলাকার সায়মন (১৮) তারাও বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। নানা সময়ে তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেইজে অস্ত্র হাতে বিভিন্ন প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাদের পরিচয় প্রকাশ করেন। বিভিন্ন সময় তাদের অপরাধমূল কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয়রা পুলিশ ও গণমাধ্যমে তাদের তথ্যগুলো সরবরাহ করেছেন। অপ্রতিম হত্যার পর পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান শুরু হলে গা ঢাকা দিয়েছে চিহ্নিত এসব কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা।
‘অপ্রতিম হত্যার নেপথ্য কারণ জানতে চাই’:
অপ্রতিমের বাবা ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার কুমিল্লার কাগজকে বলেন, শুধুই কি আইফোনের জন্য আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে? নাকি এর পেছনে অন্য কোন কারণ রয়েছে; কোন গ্যাং গ্রুপ রয়েছে- তা পুলিশকে বের করতে হবে। জেলা পুলিশ সুপারকেও আমি বলেছি, কি কারণে আমার ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো তার পুরো তথ্য আমি জানতে চাই। এসব তথ্যই যেন সঠিকভাবে চার্জশিটে উঠে আসে। পুলিশ সুপার আমাকে আশ্বস্ত করেছেন। আমরা এখন চার্জশিট এবং বিচার শুরু হওয়ার অপেক্ষায় আছি।
তিনি বলেন, শুধু অপ্রতিম নয়; এর আগেও বিভিন্ন সময় কুমিল্লায় অন্তত আরো ১২ জন শিশু-কিশোর এ ধরণের নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে বলে জানতে পেরেছি। সেগুলোর কোন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ার কারণেই অপ্রতিমের মতো শিশুদেরকে প্রাণ দিতে হচ্ছে। কেউ অপরাধ করবে আবার বয়স বিবেচনায় পার পেয়ে যাবে তা মেনে নেওয়া যায় না। বয়সের দোহাই দিয়ে এসব অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে এ ধরণের হত্যার ঘটনা আরো ঘটবে। কেবল অপ্রতিমের বাবা হিসেবে নয়; আগামী প্রজন্মকে নিরাপদ ভাবে বাঁচিয়ে তুলতে যে কোন অপরাধের বিষয়ে এখনই কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।
অপরাধীর বয়স নয়; অপরাধ বিবেচনায় শাস্তির দাবী জানিয়েছেন তিনি।
অপ্রতিম হত্যার পর কিশোর আপরাধ দমনে সাঁড়াশি অভিযানে পুলিশ:
এদিকে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা জড়িত কি-না সে বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও জেলা পুলিশ এক যুগে সাঁড়াশি নেমেছে কিশোর অপরাধ দমনে। এ নিয়ে টানা তিন দিনের অভিযানে আটক করা হয়েছে ১২৯৩ জন কিশোর তরুণকে। এর মধ্যে অপরাধ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ায় ৪১৯ জনকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়েছে। বাকি ৮৭৪ জনকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুলিশের অনুসন্ধানে কুমিল্লায় অন্তত ২৪টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং গ্রুপের তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে কুমিল্লা মহানগরীর ‘কোটবাড়ি বাইকার গ্রুপ', 'রতন গ্রুপ বা আর স্কোয়াড', ঈগল গ্রুপ, র্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিবিক, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, বস, রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, আরজিএস, সিএমসি, কিং স্কোয়াড ও ক্রাইম সেটআপ ও কেবি গ্যাং উল্লেখযোগ্য। ২০১৬ সাল থেকেই কুমিল্লা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় এসব কিশোর গ্যাংগুলো তৎপর রয়েছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। নানান সময় এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র বহন, হত্যাচেষ্টা ও হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। ঘটেছে বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর অপরাধ দমনে জেলা জুড়ে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়াও আলোচনায় থাকা ‘কোটবাড়ি বাইকার গ্রুপের’ বিষয়ে আমাদের তদন্ত চলমান রয়েছে। এসব গ্যাংয়ের কার্যক্রম নিয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আরো অভিযান হবে- অপরাধী কেউ ছাড় পাবে না।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোঃ আনিসুজ্জামান বলেন, গত কয়েকদিন কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। এসব অভিযানে গ্যাং গ্রুপের সদস্যদের পাশাপাশি গ্যাং লিডারদের আটক করা হয়েছে। বহু গ্যাং লিডার আমাদের নজরে রয়েছে; তাদেরকেও আমরা আটক করবো।
কিশোর গ্যাং বর্তমানে সমাজের একটি নতুন ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কুমিল্লায় কতগুলো কিশোর গ্যাং সক্রিয়, তারা কোথায় অবস্থান করে এবং বিভিন্ন সময় কোথায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়, সে বিষয়ে পুলিশ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জেলার বিভিন্ন হটস্পটে অভিযান পরিচালনা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
