ইতালি নেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে প্রথমে শ্রীলঙ্কা ও পরে মিশরে নিয়ে আটকে রেখে নির্যাতন এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করতো একটি আন্তর্জাতিক মানবপাচার চক্র। গত ১২ বছরে চক্রটি দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে এভাবে বিদেশে নিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে এসআরবি। এ চক্রের অন্যতম মূলহোতা মোহাম্মদ আরজু রহমানকে (৪৭) গ্রেফতার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এসআরবি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান এসআরবি-৪ এর পদাতিক অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান।
গ্রেফতার মোহাম্মদ আরজু রহমানের বিরুদ্ধে মানবপাচারের অভিযোগ রয়েছে। গত সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর বনানীর সি ব্লক এলাকা থেকে এসআরবি-৪ ও এসআরবি-১ এর যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, চলতি বছরের ১৬ জুলাই মানবপাচার চক্রের প্রতারণার শিকার কামরুন্নাহার ফাতেমা মিশর থেকে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা বলে একটি চক্র তাকে মিশরে নিয়ে আটকে রেখেছে।
এ তথ্যের ভিত্তিতে এনএসআই গোয়েন্দা কার্যক্রম শুরু করে। ওই সময় আরজু মিশরে অবস্থান করছিলেন। তাকে দীর্ঘদিন ধরে নজরদারিতে রাখা হয়। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশে আসার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। আগামী বৃহস্পতিবার তার আবার মিশরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল বলে জানান এসআরবি কর্মকর্তা।
তিনি জানান, কামরুন্নাহার ফাতেমা ও তার পরিবারের পাঁচ সদস্যকে ইতালি নেওয়ার কথা বলে আরজু তাদের কাছ থেকে ৮৫ লাখ টাকা নেন। পরে ‘বাংলাদেশ থেকে ভিসা হবে না’ বলে তাদের শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে পরিবারের তিন ছেলে সদস্য পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। পরিবারের দুই নারী সদস্যের মধ্যে আঞ্জুমান আরা পালিয়ে শ্রীলঙ্কার কোনো একটি এলাকায় অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে, কামরুন্নাহার ফাতেমাকে শ্রীলঙ্কা থেকে মিশরে নিয়ে যায় চক্রটি। সেখানে তাকে আটকে রেখে নির্যাতন এবং অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। এসব কাজে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি শরীরের বিভিন্ন অংশে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া হয় বলেও জানান এসআরবি কর্মকর্তা।
জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আরজু প্রায় ১২ বছর ধরে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। এ সময়ে দুই হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে একই ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে পালিয়ে আসা ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী গত সোমবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত এসআরবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। আরজুর বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় অভিযোগও রয়েছে।
এসআরবি জানায়, আরজুর নিজস্ব কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। ‘আরজু ইমিগ্রেশন লিমিটেড’ ও ‘নাফিস এয়ার ইমিগ্রেশন লিমিটেড’সহ বিভিন্ন ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে তিনি গ্রামের সহজ-সরল মানুষকে ইউরোপে পাঠানোর প্রলোভন দেখাতেন। পরে তাদের বিভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া ও অনৈতিক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।
আরজুর মোবাইল থেকে পাওয়া একটি ব্যাংক স্টেটমেন্টের বরাতে এসআরবি জানায়, গত এক বছরে তার হিসাবে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে।
মানবপাচারবিরোধী অভিযান প্রসঙ্গে লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান বলেন, মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। ২০২৫-২৬ সালে এসআরবির অভিযানে এ পর্যন্ত ২২৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী কামরুন্নাহার ফাতেমা ও আঞ্জুমান আরা শ্রীলঙ্কা ও মিশর থেকে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে তাদের দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
গ্রেফতার আরজুকে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে ভাটারা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। তার সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
