
কুমিল্লায় অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রেশ ধরে দ্বিতীয় দফায় একযোগে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে ২৫৪ জনকে আটক করা হয়েছে। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬ থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত মাত্র ৬ ঘন্টায় জেলার ১৮ থানা ও ডিবি পুলিশের কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে তাদের আটক করা হয়। এর আগে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের ৬ দিনের মাথায় গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) একইভাবে কুমিল্লা জেলার ১৮ থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। পরে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে মুচলেকা নিয়ে ৪৫১ জন কিশোরকে পরিবারের জিম্মায় এবং ১৭৩ জনকে বিভিন্ন মামলায় আদালতে সোপর্দ করে পুলিশ।
তবে দুই দফা কিশোর গ্যাংবিরোধী পুলিশি অভিযানে ৮৭৮ জনকে আটক করা হলেও তাদের গ্যাং লিডার এবং পেছনের নেতৃত্বদাতারা থেকে যাচ্ছেন পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাহিরে। স্থানীয় রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠা এসব গ্যাং লিডারদের নেতৃত্বে কুমিল্লা মহানগরীতে ২৪টির বেশি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। মহানগরীর পাড়া, মহল্লা, অলিগলি এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘিরে এদের বিচরণ। জড়িয়ে পড়ছেন ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ডাকাতি, হত্যার চেষ্টা, খুন ও ধর্ষণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। এছাড়া নানান সময় আধিপত্যের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন সংঘর্ষে; করছেন দেশি-বিদেশি নানা অস্ত্রের ব্যবহার। দল ভারী করতে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সাথেও মিশছেন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। তাদেরকে দিয়েও করাচ্ছেন ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, হত্যার চেষ্টা, খুন ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। আর যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসছে; সে দলে মিশছে এসব কিশোর গ্যাংয়ের লিডাররা। ফলে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে কিশোর গ্যাং নেতৃত্ব দেওয়ায় পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাহিরেও থাকেন অপরাধীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুমিল্লা জেলা পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের সঙ্গে তাদের নেতৃত্বদাতা গ্যাং লিডারদের আটকের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বড় বাঁধা। তাদেরকে লালন পালনের মূল কারণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে সুযোগ বুঝে এসব কিশোর গ্যাংগুলো ব্যবহার করে থাকেন। তাই পুলিশ চাইলেও অনেক সময় আটক করা সম্ভব হয় না।
দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর অপ্রতীম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লা মহানগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য ও দৌরাত্ম্য এখানকার নাগরিকদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। ভুক্তভোগী নাগরিকদের অভিযোগ মহানগরীতে এসব কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ কর্মকাণ্ডের নানা ভিডিও ফুটেজ, ছবি এবং গ্রুপের নাম ও নেতৃত্বদাদের পরিচয় নিশ্চিত করে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ করার পরেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। এতে আরো সক্রিয় হয়ে উঠে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।
সবশেষ অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ও মামলার প্রধান আসামি সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) কুমিল্লা মহানগরীর কোটবাড়ির একটি সক্রিয় কিশোর গ্যাংয়ের অন্যতম সদস্য ছিলেন বলে স্থানীয় নাগরিকরা অভিযোগ করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার এ ধরনের অ্যাক্টিভিটিজের বহু প্রমাণও রয়েছে গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে। কিন্তু অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে তুহিনকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী রেকর্ডের পরেও তুহিন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য এবং নেতৃত্বের বিষয়টি পরিষ্কার না করে এড়িয়ে যাচ্ছেন পুলিশ। অন্যদিকে গ্ৰেফতার অপ্রতিমের অন্য দুই আসামি মোজাম্মেল হোসেনের ফাহাদ (১৫) ও মোঃ কামরুল হাসান (১৮) ছিলেন কিশোর গ্যাং 'কোটবাড়ি বাইকার গ্ৰুপ'-এর সদস্য। এ কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে রয়েছেন আলী সাইমন ও সোহাগ নামে দুই কিশোর। আর গ্রুপের সেকেন্ড এন্ড কমান্ড হচ্ছেন মোহাম্মদ হানজালা নামে আরো এক কিশোর। আলী সাইমন, সোহাগ ও মোহাম্মদ হানজালার নেতৃত্বে সক্রিয় 'কোটবাড়ি বাইকার গ্ৰুপ' কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বিভিন্ন সময় অপ্রতিমকে সাথে নিয়ে আড্ডা এবং শোডাউনের বহু গ্ৰুপ ছবি নিজেদের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করার বহু তথ্য প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরপাক খাচ্ছে। এত তথ্য প্রমান থাকার পরেও গ্যাং লিডার আলী সাইমন, সোহাগ ও মোহাম্মদ হানজালা এখনও রয়েছে পুলিশের ধরা খাওয়ার বাহিরে। নাগরিকদের দাবি, অভিযুক্তদের আটক করে জিজ্ঞাসা করলেই অপ্রতিম হত্যার আরও রহস্য উদঘাটন হবে।
অন্যদিকে সদর দক্ষিণের বড় ধর্মপুরের রায়হান (১৯), ফাহাদ (১৯), ফকির মুড়ার শান্ত (১৮), ইমরান (২১), সানি (১৮) রাকাশের পাড় এলাকার সায়মন (১৮) তারাও বিভিন্ন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। নানা সময়ে তাদের নিজস্ব ফেসবুক পেইজে অস্ত্র হাতে বিভিন্ন প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাদের পরিচয় প্রকাশ করেন। বিভিন্ন সময় তাদের অপরাধমূল কর্মকাণ্ডের কারণে স্থানীয়রা পুলিশ ও গণমাধ্যমে তাদের তথ্যগুলো সরবরাহ করেন।
এদিকে অনুসন্ধানে দেখা যায়, কুমিল্লা মহানগরীর 'কোটবাড়ি বাইকার গ্রুপ', 'রতন গ্রুপ বা আর স্কোয়াড', ঈগল গ্রুপ,র্যাক্স, এক্স, এলআরএন, সিবিক, মডার্ন, রকস্টার, ডিস্কো বয়েজ, বস, রয়েল বেঙ্গল, সিজলিন, জে অ্যান্ড জে, বিগ ব্রাদার, টুইস্ট, ব্ল্যাক স্টার, ডার্ক, আরজিএস, সিএমসি, কিং স্কোয়াড ও ক্রাইম সেটআপ ও কেবি গ্যাং-সহ বিভিন্ন নামে ২৪টির বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রায় ২০১৬ সাল থেকে কুমিল্লা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় এসব কিশোর গ্যাংগুলো তৎপর রয়েছে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে। নানান এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র বহন, হত্যাচেষ্টা ও হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
মহানগরীর টমছমব্রিজ, সালাহউদ্দিন রোড, ঠাকুরপাড়া, বিসিক এলাকা, ধর্মপুর, রেইসকোর্স, কাঠের পুল, হাউজিং এস্টেট, দক্ষিণ চর্থা, মুরাদপুর, কাপ্তানবাজার, অশোকতলা, পার্ক রোড, মোগলটুলি, নবাববাড়ি রোড, ইপিজেড রোড, মেডিকেল কলেজ রোড, শাসনগাছা, কাটাবিল, নুরপুর, কুমিল্লা কোটবাড়ি, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, জাদুঘর রোড, সালমানপুর ও সানন্দাসহ এসব উল্লেখিত এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া মহানগরীর বাহিরে জেলার সদর দক্ষিণ, বুড়িচং, দাউদকান্দি, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, লাকসাম ও চৌদ্দগ্রাম উপজেলায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের দৌরাত্ম ও নানান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে রয়েছে স্থানীয় নাগরিকদের।
এদিকে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রেশ ধরে দ্বিতীয় দফায় কুমিল্লা মহানগরীতে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে কুমিল্লা কোতয়ালী থানা এলাকায় ৩৭ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কিশোর গ্যাং ‘রতন গ্রুপ’ বা ‘আর স্কোয়াড’-এর 'সেকেন্ড ইন কমান্ড' হিসেবে পরিচিত আনিসুর রহমান ওরফে আনিকে (১৯) গ্ৰেফতার করা হয়। এছাড়া একই অভিযানে রতন গ্ৰুপের মোঃ তারেকসহ আরও চার কিশোর গ্যাং সদস্যকে আটক করে। এছাড়া আরেক অভিযানে কুমিল্লা নগরীর সুজানগর এলাকা থেকে অস্ত্রসহ ফাহিম নামে এক কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে আটক করা হয়।
কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, রতন গ্রুপের সেকেন্ড এণ্ড কমান্ড আনিসুর রহমান ওরফে আনিক কুমিল্লা নগরীর ছোটরা মফিজাবাদ কলোনির আবুল কাশেমের ছেলে এবং রতন গ্রুপের প্রধান ইমরান হোসেন ওরফে রতনের আপন ভাগনে। রতন বর্তমানে আত্মগোপনে থাকায় আনিকই মূলত এই গ্যাংয়ের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। আনিক ২০২২ সালের একটি আলোচিত হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন এবং গ্রেপ্তার হয়ে জামিনে বেরিয়ে পুনরায় গ্যাংয়ের নেতৃত্বে যুক্ত হন। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রতন গ্ৰুপের ৫ জনকে আদালতে সোপর্দ করেছি।
কিশোর গ্যাং সদস্যদের আটক করা হলেও গ্যাং লিডাররা ধরা না অভিযোগ নাগরিকদের প্রশ্নের জবাবে কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, গত কয়েকদিন ৮৩৯ কিশোর গ্যাং সদস্যদের পাশাপাশি গ্যাং লিডারদেও আটর করা হয়েছে। বহু গ্যাং লিডার আমাদের নজরে রয়েছে; তাদেরকেও আমরা আটক করবো। তবে গোপনীয়তার স্বার্থে কিছু জানানো যাচ্ছে না।
অন্যদিকে অতিরিক্ত পুলিশ (প্রশাসন) লুৎফর রহমান বলেন, রতন গ্ৰুপের সেকেন্ড এন্ড কমান্ড আনিসুর রহমান ওরফে আনিকসহ বেশকিছু কিশোর গ্যাংয়ের লিভারকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া আলোচনায় থাকা কোটবাড়ি বাইকার গ্ৰুপের বিষয়ে আমাদের তদন্ত চলমান রয়েছে। কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে।
