নিজস্ব প্রতিবেদক: নির্মূল না পর্যন্ত কুমিল্লায় পুলিশের কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। কিশোর গ্যাং বিরোধী অভিযানে কোনো ব্যক্তি বা মহল চাপ দেওয়ার চেষ্টা করলে প্রয়োজনে গণমাধ্যমে তাদের নাম পরিচয় প্রকাশের করা হবে জানিয়েছেন কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোঃ আনিসুজ্জামান।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নাগরিক সেবামূলক সফটওয়্যার ‘আমার কুমিল্লা’ উদ্বোধনের আগে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান।
তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং বর্তমানে সমাজের একটি নতুন ব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে। কুমিল্লায় কতগুলো কিশোর গ্যাং সক্রিয়, তারা কোথায় অবস্থান করে এবং বিভিন্ন সময় কোথায় দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেয়, সে বিষয়ে পুলিশ গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জেলার বিভিন্ন হটস্পটে অভিযান পরিচালনা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার জানান, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে আগে অভিযান চালানো হলেও কাঙ্ক্ষিত সফলতা পাওয়া যায়নি। তবে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ড. নাহিদা বেগমের ছেলে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে নতুন করে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করে পুলিশ।
আনিসুজ্জামান বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের একটি তালিকা তৈরির পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালানো হয়। ওই অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় ২৬ সেপ্টেম্বর আরও ২৫৫ জনকে আটক করা হয়েছে। পরদিনও অভিযান চালিয়ে রাত শেষ হওয়া পর্যন্ত ৪৮৭ জনকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে যারা অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে, তাদের গ্রেপ্তার করে মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হচ্ছে।
পুলিশ সুপার বলেন, কুমিল্লা নগরীসহ জেলার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও পথচারীরা বিভিন্ন সময় কিশোর গ্যাংয়ের কারণে ছিনতাই, দস্যুতা, ধর্ষণ ও ডাকাতির মতো অপরাধের শিকার হয়েছেন। বিভিন্ন মামলা ও অপরাধের তথ্য পর্যালোচনা করে পুলিশ মনে করছে, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নির্মূল করা সম্ভব হলে কুমিল্লা শহরসহ পুরো জেলা মানুষের বসবাসের জন্য আরও নিরাপদ হবে।
তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে। কোনোভাবেই এতে বিরতি দেওয়া হবে না। নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ডের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলোতে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
অভিভাবকদের সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে পুলিশ সুপার বলেন, সন্তানদের সন্ধ্যার পর অপ্রয়োজনে বাইরে আড্ডা দিতে দেওয়া যাবে না। অনেক সন্তান রাত ১০টা, ১১টা এমনকি ১২টা পর্যন্ত পড়াশোনার বাইরে আড্ডায় সময় কাটায়। এভাবে তারা কিশোর গ্যাংয়ের সংস্পর্শে গিয়ে বিপথগামী হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
তিনি জানান, অভিযানে আটক অনেক কিশোরকে যাচাই-বাছাই করে নির্দোষ ও শিক্ষার্থী হিসেবে শনাক্ত হলে অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়া হচ্ছে। এ সময় তাদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের বিষয়টিও পর্যালোচনা করে অভিভাবকদের বাস্তব পরিস্থিতি জানানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, সন্তান রাতের বেলায় মোবাইল ফোনে কী করছে, সে বিষয়ে অভিভাবকরাই অবগত নন।
কিশোর গ্যাংয়ের কথিত সেকেন্ড ইন কমান্ডকে আটকের পর তার মা ছেলেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, তদন্তে পরে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। তাই শুধু সন্তানের প্রতি আবেগ দিয়ে নয়, তার চলাফেরা, বন্ধু ও যোগাযোগের বিষয়েও অভিভাবকদের নজর রাখতে হবে।
অভিযানে আটক কিশোরদের অভিভাবকের জিম্মায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, এ কার্যক্রম অনলাইন ক্যামেরার মাধ্যমে করা হচ্ছে এবং পুলিশ নিজেদের ব্যবস্থায় তা পর্যবেক্ষণ করছে। কোনো পুলিশ সদস্য অভিভাবকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন এমন অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
তিনি আরও বলেন, কোনো অভিভাবক যদি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ পান, তাহলে সরাসরি তার কাছে অভিযোগ করতে পারবেন। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্যের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে তিনি এক পা-ও পিছপা হবেন না।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশন ও নগরবাসীর সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে পুলিশ সুপার বলেন, মেয়রসহ নগরবাসীর অনেক অভিভাবক পুলিশকে সহযোগিতা করছেন। গণমাধ্যমও এ বিষয়ে সহযোগিতা করছে। কিশোর গ্যাং নির্মূলে এ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কোনো বড় ভাই বা প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে কোনো বড় ভাই বা অভিভাবকের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।
অভিযান নিয়ে তার ওপর কোনো ধরনের চাপ এসেছে কি না জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, এখন পর্যন্ত তার ওপর কোনো চাপ আসেনি। বরং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পুলিশের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে কোনো ব্যক্তি বা মহল কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ বা শিথিল করার জন্য চাপ দেওয়ার চেষ্টা করলে প্রয়োজনে তাদের নাম প্রকাশ করা হবে।
