
পদার্থবিজ্ঞানের চোখে ছায়া অস্তিত্বহীন যা সাধারণের চোখে অসার। জাগতিক সকল দর্শনের আধার মূলত মানুষের জৈবিক দেহখানা। এখানেই তার সত্তার অনুরণন হয়।
সম্ভবত এই দর্শন থেকেই শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসে লিখেছিলেন, “যেদিন বুঝবে রূপটাও মানুষের ছায়া, মানুষ নয়। সেদিনই কেবল সত্যিকারের ভালোবাসার সন্ধান পাবে।”
অন্যদিকে সুইস মনোবিজ্ঞানী কার্ল ইয়ুং কি বলে দেখুন, “ছায়া হলো মানুষের ব্যক্তিত্বের সেই অচেতন দিক বা অন্ধকার অংশ, যা মানুষ সাধারণত লুকিয়ে রাখতে চায় বা এড়িয়ে চলে।”
যাইহোক! ছায়া নিয়ে জগতের প্রাত্যহিক নিয়মের ধার ধারতে ইচ্ছে করেনা আমার। হয়তো আমি ব্যতিক্রম। যদি প্রশ্ন করেন, আমি কাকে বেশি ভালোবাসি? আমার কায়া নাকি ছায়া? তৎক্ষনাৎ উত্তর হবে, আমি আমার ছায়াকে বেশি ভালোবাসি। অবাক হয়ে প্রশ্ন করছেন কেনো? কারণ, এই ছায়া দিনমান আচ্ছন্ন রাখে আমাকে। ছায়ায় খুঁজে পাই হাসি আর বিষাদমাখা অতীত। কল্পনাগুলো পেখম মেলে এখানে। যেন সকল ‘আমিত্ব’ ঘুরপাক খাচ্ছে ছায়াকে ঘিরে। স্পর্শ কাতরতার সবটুকু বিরাজ করছে ছায়ায়। আমার ছায়া আমার সঙ্গী বলে বোধহয় আড়াল এতো ভালোবাসি। কখনো ছায়ার কারণে আমার চারপাশে বয়ে যায় অপূর্ব কলধারা।
ছায়া নিয়ে আত্মদর্শন যথেষ্ট হয়েছে। এবার আসুন বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ছায়াকে দেখি। আলোর অনুপস্থিতি হলো ছায়া, অর্থাৎ আলোর গতিপথে কোনো বস্তুর বাধা থাকলেই ছায়া তৈরি হয়। বস্তুর আকার-আকৃতির উপর ছায়ার আকার-আকৃতি নির্ভর করে।
স্থান-কাল যাইহোক না কেনো সূর্যের আলোতে দাঁড়ালে আমরা আমাদের ছায়া দেখতে পাবোই। কিন্তু জানেন কি বাংলাদেশে এমন একটি জায়গা আছে, যেখানে বছরের একটি বিশেষ দিনে সূর্যের আলোয় আপনার কোনো ছায়া তৈরি হবে না।
দাঁড়ান বলছি! আমরা যারা ভৌগোলিক জ্ঞান রাখি তারা অবশ্যই অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশ-এর সাথে পরিচিত। বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর যে কোনো ভৌগোলিক স্থান নির্দিষ্ট করতে অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমা রেখার সাহায্য নিয়ে থাকেন। পৃথিবীতে তিনটি পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত কাল্পনিক রেখা, যথা-কর্কটক্রান্তি, মকরক্রান্তি ও বিষুবরেখা রয়েছে। আর উত্তর-দক্ষিণে একইরকম চারটি রেখা রয়েছে ; যেগুলো ০ ডিগ্রি, ৯০ ডিগ্রি, ১৮০ ডিগ্রি ও ২৭০ ডিগ্রি দ্রাঘিমা হিসেবে পরিচিত।
এই তিনটি পূর্ব-পশ্চিম রেখা ও চারটি উত্তর-দক্ষিণ রেখা পৃথিবীকে মোট বারোটি স্থানে ছেদ করেছে। এরমধ্যে দশটি পড়েছে সাগর আর মহাসাগরে। বাকি দু'টি পড়েছে পৃথিবীর স্থলভাগে। স্থলভাগের একটির অবস্থান সাহারা মরুভূমিতে, যেখানে মানুষ সবসময় যেতে পারে না। আরেকটির অবস্থান বাংলাদেশে। নিশ্চয়ই অবাক হয়ে ভাবছেন সেটি কোন জায়গা? প্রিয় পাঠক, সেই জায়গাটি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গার সদরপুর উপজেলায়। জ্বি আবারো বলছি, সূর্যের আলোতে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় আপনার ছায়া তৈরি হলেও এই স্থানটিতে হবে না। অবশ্য বছরের একটি বিশেষ দিনে শুধু এমনটা হয়; সারাবছর নয়। প্রতিবছর ২১ শে জুন দুপুর বারোটায় এই অঞ্চলে কারো ছায়া মাটিতে পড়ে না। মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য ঠিক মাথার উপর থাকলেও কারো ছায়ার টিকিটিও চোখে পড়ে না। রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষ ঠিকই নির্দিষ্ট দিনে চলে যান ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গার সদরপুর উপজেলায়।
এবার চলে যাই ছায়ার এক রোমহষর্ক ঘটনায়। জানিনা এই ঘটনার নিষ্ঠুরতা পাঠক কতটা নিতে পারবেন।
“ঐঁসধহ ঝযধফড়ি ঊঃপযবফ রহ ঝঃড়হব” অর্থাৎ “পাথরে খোদাই করা মানুষের ছায়া” হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি এতিহাসিক ও মর্মান্তিক স্মারক যা বর্তমানে জাপানের হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি জাদুঘরে সযত্নে সংরক্ষিত আছে। এটি এমন একজন ব্যক্তির ছায়া বলে মনে করা হয় যিনি হিরোশিমার উপর পারমাণবিক বোমা ফেলার সময় সুমিতোমো ব্যাংকের হিরোশিমা শাখার প্রবেশদ্বারে বসে ছিলেন।
দিনটি ১৯৪৫ সালের ৬ই আগস্ট, হিরোশিমা শহরে সকাল ৮:১৫ তে, পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। তখন ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে হয়েছিল ৩০০০ থেকে ৪০০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জাদুঘরের তথ্যমতে, ব্যক্তিটি পাথরের সিঁড়িতে বসে ব্যাংক খোলার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। আশেপাশের মানুষ ধরে নিয়েছিল, বিস্ফোরণের ফলে যে পরিমাণ তাপ সৃষ্টি হয়েছে তাতে মানুষটির দেহ বাষ্পীভূত হয়েছে আর সেই মানুষের দেহের শেষচিহ্ন হিসেবে সিঁড়িতে গাঢ় ছায়া তৈরি হয়েছে।
কিন্তু জাদুঘরের তথ্যমতে, তীব্র তাপে মানব শরীরের সম্পূর্ণ বাষ্পীভবন অসম্ভব। পারমাণবিক বিস্ফোরণের ভয়ঙ্কর তাপে মানব শরীরের হাড় ও কার্বনাইজড অঙ্গগুলো থেকে যাবে।
আসলে কোনো এক মানুষের দেহের আকার অনুসরণে সিঁড়িতে থাকা মানবছায়া তৈরি হয়েছিল। অধিক তাপ আর তেজস্ক্রিয়তার ফলে সিঁড়ির সব অংশ বিবর্ণ হয়ে গেলেও সিঁড়ির উপর একজন মানুষের অবস্থানের কারণে সিঁড়ির নির্দিষ্ট স্থানের পদার্থ বিবর্ণ না হয়ে তার স্বাভাবিক বর্ণ ধরে রাখে। ওই স্বাভাবিক বর্ণ ধারণকারী অংশটি একজন মানুষের ছায়া হিসেবে প্রতীয়মান হয়। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ মানবছায়াটিকে ৪২ বৎসর বয়সী এক নারীর ছায়া হিসেবে তথ্য প্রদান করেন। বিস্ফোরণের পর কি পরিণতি হয়েছিল তা নিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি আজ অবধি। এই ছায়া-টি মানুষের ‘মৃত্যুর ছায়া’ বা ‘ব্লাস্ট শ্যাডো’ নামেও পরিচিত।
এর ইতিহাস খুবই হৃদয়বিদারক! অবশ্যই এটি সভ্যতার গায়ে কলঙ্কের দাগ। পৃথিবীর বুকে একটুকরো পাথরে খোদিত এই ছায়া এতোটাই ভারী যে পৃথিবীর সকল মানুষের অশ্রু তা মুছে দিতে অক্ষম।
লেখক: কবি ও কথাশিল্পী
