
ইলা মিত্র ছিলেন কলকাতার মেয়ে। কলেজে পড়তেন, খেলাধুলাও করতেন। ১৯৩৫ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত রাজ্য জুনিয়র এ্যাথলেটিক্সে চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। রাজনীতির সাথে জড়িয়ে ছিলেন কলকাতা থাকতেই। তারপর নাচোলে গেলেন জমিদারবাড়ির পুত্রবধূ হয়ে। জমিদারবাড়ির ভেতরেই বন্দিনী হয়ে যাবার কথা ছিল তাঁর। নিয়ম ছিল সেটাই। স্বামী রমেণ মিত্র ছিলেন ঐ সময়ের কমিউনিষ্ট পার্টির লোক। প্রিয়তম স্বামীর সাহায্যে জমিদারবাড়ির গণ্ডি ভেঙে বেরিয়ে এলেন। নিপীড়িত সাঁওতালদের সঙ্গে মিশে গেছেন, তাঁদের একজন হয়ে। অবাক করার বিষয় হচ্ছে যে, ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর হাতে যখন তিনি ধরা পড়েন। তখনও সাঁওতাল রমণীর ছদ্মবেশেই ছিলেন। তিনি স্বামী রমেণ মিত্রের ভালোবাসায় ও সমর্থনে সেই যে রাজনীতিতে এলেন, আর ফিরলেন না। রাজনীতিতে গভীরভাবে জড়াতে গিয়ে উপেক্ষিত হলো পরিবার, বাড়ি-ঘর ও একমাত্র শিশু সন্তান। গৃহত্যাগী বিপ্লবী এই নারী স্বামী সংসারে ফেরেননি। চলে গেলেন কলকাতায়। কলকাতায় গিয়ে এমএ পাস করেছেন প্রাইভেট পরীক্ষা দিয়ে। কলেজের অধ্যাপিকা হয়েছেন, সেখানেও জেল খেটেছেন। পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভায় চারবার সদস্য হয়েছিলেন। জেল-জুলুম অসহনীয় মাত্রায় ভোগ করেও আমৃত্যু থেকেছেন রাজনীতিতে।
স্বামী নরেন মিত্রের বাড়ি পূর্ববঙ্গে। এখানে এসে ইলা মিত্রের একটি বিশেষ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেটি হচ্ছে শিক্ষা সংক্রান্ত। তিনি নিজেকে জমিদার বাড়ির বন্দিনী করে রাখতে প্রস্তুত ছিলেন না। তাই তিনি নির্ভয়ে বেরিয়ে এলেন জমিদার বাড়ির গণ্ডি থেকে। সেখানে স্কুল খুললেন। সেই সাঁতচল্লিশ সালে। সঙ্গে সঙ্গে জমির মালিক যারা, তারা উপরতলার ক্ষমতাবান মানুষ। তারা সবায় তাঁর পেছনে শক্তভাবে লাগলেন। রক্ষী কুকুরের মতো করে মাটি শুকতে শুকতে ইলা মিত্রের দোষ-ক্রুটি খুঁজতে লাগলেন, জোতদার প্রবল পরাক্রমশালী ঐসব লোকেরা। এরা বললেন, স্কুল শরিয়ত বিরোধী, ওখানে নিয়ে বে-পর্দা করানো হচ্ছে মেয়েদেরকে। কোমলমতী মেয়েদেরকে উগ্র করে তোলা হচ্ছে। এসব চলতে দেওয়া যায় না। তখন এর প্রতিবাদে গ্রামের সাধারণ অশিক্ষিত মানুষেরা জড়ো হলেন, পৃথক সারিতে আয়োজিত হলো বড় সমাবেশের। বিপ্লবী ইলা মিত্র ঐ ভুখা, নিরণ্ন মানুষের সমাবেশে দিপ্ত পায়ে দাঁড়িয়ে দৃঢ় চিত্তে বললেন “ঐ যে আমিনা বিবি মিয়া পাড়ার সাহেবদের খামারে বাদীগিরী করে, সে বুঝি মুসলমান নয়? নদীর পানি টেনে টেনে সাহেবদের স্ত্রীদের জন্য যারা গোসলের পানি যোগায়, সে মুসলমান মেয়েরা আল্লাহর কাছে বুঝি সম্পূর্ণ অস্পৃশ্য?’’ কতটা সাহস থাকলে একজন জমিদার পুত্রবধূ জমিদারদের বিরুদ্ধাচারণ করা সম্ভব, তা সেদিন নববধূ ইলা মিত্রের মনের ভিতরে জমানো ক্ষোভের প্রকাশ থেকে অবাক করেছে উত্তর প্রজে¥র মানুষের কাছে।
ভারতবর্ষের আন্দোলন-সংগ্রামে যে কয়জন বিপ্লবী নারী ইতিহাসের পাতায় জ¦ল জ¦ল করছে, তাঁদের মধ্যে ইলা মিত্র কিংবদন্তিতুল্য নায়িকা। তাঁর কর্মে, সৃজনে, চিন্তায়, মেধায়-মননে তিনি জাগ্রত এক সাহসী নারী। বেগম রোকেয়া থেকে প্রীতিলতা, শান্তি ও সুনীতি থেকে নবাব ফয়জুন্নেসা এসব বীরদের সাথে ইলা মিত্রের জীবন ও কর্মের নানাদিক নানাভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন ১৯৫০ এর জানুয়ারিতে। পুলিশি নির্যাতনের কথাটা তাঁর জবানবন্দী থেকেই জানা যায়। আদালতে দিয়েছিলেন তিনি ওই জবানবন্দী। কারাগারে অমানসিক নির্যাতনে প্রায়-মরণাপন্ন ইলা মিত্র একটি জবানবন্দী দিয়েছিলেন আদালতে। সেটি কোনো খবরের কাগজে কিংবা বেতারে প্রচার পায়নি। শুধু তাঁর দল কমিউনিষ্ট পার্টি ইস্তেহার করে ছাপিয়ে গোপনে বিলি করেছিল। তাঁর জবানবন্দী তে কি ছিল তা সাধারণ মানুষ জানতে পেরেছিল লোকের মুখের কথোপকথন থেকে। ইলা মিত্রের উপর অমানসিক নির্যাতনের পরে ও জবানবন্দীটি ছিল সাদামাটা। সাহিত্যিক সৌন্দর্য বলতে এতে কিছুই ছিল না। একে বারেই সহজ-সরল একটি বিবরণ।
ইলা মিত্রের উপর অমানবিক পুলিশি নির্যাতনের সূত্রপাত হয় যেখান থেকে, সেটি হচ্ছে-নাচোল থানার ভারপ্রাপ্ত দারোগা একদল পুলিশ নিয়ে একটি গ্রামে গিয়েছিলেন টহল দেবার ও সালামি আদায়ের জন্য। ঐ অঞ্চলে তখন ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন চরমে উঠে। ইলা মিত্র সেই আন্দোলনের নেত্রী। দারোগাসহ পুলিশের ঐ দলটি নির্যাতন করেছিল গ্রামবাসীদের উপর। তখন তারই তীব্র পতিক্রিয়ায় তীর বল্লম নিয়ে শত শত সাঁওতাল কৃষক ঘিরে ফেলে পুলিশকে। পুলিশ গুলি ছোঁড়ে। কৃষকেরা হতাহত হয়। তাতে উত্তেজনা আরও বাড়ে। পরিণামে পুলিশের দলটি নিখোঁজ হয়ে যায়। পরে শুরু হয় তাণ্ডব। সেদিন সমস্ত এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছিল। নির্বিচারে হত্যা করা হয় আন্দোলনরত মানুষকে। পুলিশের সরাসরি গুলিতে কমপক্ষে ১৫০ জন কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতী মানুষ নিহত হন। গ্রেফতার করা হয়েছিল শত শত মানুষকে সাথে ইলামিত্রকেও।
পুলিশ ইলামিত্রের স্বীকারোক্তি চেয়েছিল। না তিনি রাজী হননি। তারপরেই অত্যাচার। সেই অত্যাচারের কোনো পরিমিতিই ছিল না। বর্ণনাতীত নির্যাতনের কথা মস্তিষ্কের কল্পনাকেও হার মানিয়েছিল। বেদনা-বিষাদে বিগলিত চোখ, রক্তঝরা গোপন সংবেদনশীল অঙ্গও পুলিশের হাত থেকে রেহাই পাননি।
মানুষ যে কতটা হিংস্র ও অমানুষ হতে পারে তা আমরা নিকট অতীতের ৭১ এ দেখেছি। কিন্ত সেটা দিয়েছিল পাঞ্জাবীরা। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে ইলা মিত্রের উপর নির্যাতন কারীরা কেহই পাঞ্জাবী ছিলেন না। এরা সবাই ছিলেন বাঙ্গালি এবং লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে তখন ৭১ এর আদলে কোনো যুদ্ধ ও চলছিল না। জমিদারদের ইশারায় ঠাণ্ডা মাথায় এসব ঘৃণ্য অত্যাচার করেছে তাঁদের উপর? তাঁদের পরিচয় তারা জানতো। বিশেষ করে একজন রাজবন্দী যিনি চোর কিংবা ডাকাত নয়, যিনি মহিলা উচ্চ শিক্ষিতা, জমিদারবাড়ির পুত্রবধূ এবং যিনি একেবারেই অসহায়। স্বামী-সংসার ও শিশু সন্তানের মায়া ত্যাগ করে একজন একাকী দেশপ্রেমিক বিপ্লবী নারী। বাঙ্গালি পুলিশই সেদিন নির্মম যে অত্যাচার করেছিল। কারাগারের অন্ধকার প্রকৌষ্ঠে ও তারা তাঁকে রেহাই দেয়নি। পুলিশ বলছে তিনি হিন্দু রাষ্ট্রদ্রোহী। ইলা মিত্রের বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, জেলের ভিতর অনশনকারী রাজবন্দীদের ওপরও গুলি করেছে পুলিশ বাহিনী।
ইলা মিত্রের নেতৃত্বগুণ ছিল চোখে পড়ার মতো। আন্দোলনের সাথীরা ছিল সাধারণ কৃষক। তারা সকলে ইলা মিত্রকে রানীমা বলে সম্বোধন করতেন। আন্দোলনকারী সাধারণ কৃষকদের মধ্যে কেহই তাঁর বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দেয়নি। রাণীমা (ইলা মিত্র) তাঁদের শিখিয়ে দিয়েছিল পুলিশ মারতে, এই কথাটা আদায় করার জন্য বন্দীদের উপর এমন কোনো নির্যাতন নেই যা করা হয়নি। এমনকি মারতে মারতে একজনকে মেরেই ফেলা হলো অন্য বন্দিদের চোখের সামনে। উদ্দেশ্য যাতে এরা ভয় পায়। না ভয় পায়নি। মুখ খোলেননি। সেদিন ইলা মিত্রের বিরুদ্ধে একজন রাজসাক্ষীও জোগাড় করতে পারেনি পুলিশ। এতেই প্রমাণিত হয়, তিনি আন্দোলনকারী সাধারণ কৃষকদের কতটা গভীরভাবে ভালোবাসতে পেরেছিলেন। কতটা অধিকার আদায়ে এইসব নিরণ্ন মানুষদের সংগঠিত করতে পেরেছিলেন। সাঁওতাল কৃষকেরা নিজেদের প্রাণনাশের চিন্তা না করে, করেছিলেন নেত্রী ইলা মিত্রের জীবনের কথা।
ইলা মিত্রের রাজনীতি জ্ঞান ছিল প্রখর। তিনি ভাবতেন সাঁওতাল কৃষকের কথা, শ্রমিকের কথা-মজুরের কথা। তাঁর উপর যে জুলুম নির্যাতন করা হয়েছিল, মনে দ্বিধা ছিল জবানবন্দী দিতে। জবানবন্দীটি পড়লে যে কারো বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সহ-রাজবন্দী মহিলারা তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন যা ঘটেছে তা আদালতকে বলতে, যেন দেশাবাসী জানতে পারে। তবুও সংকোচ ছিল ইলা মিত্রের। তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় কোনো নারী কি চান তাঁর নির্যাতনের কথা, গ্লানির কথা মুখ ফুটে বলতে? এইসব পারিপাশির্^কতার নানাবিধ কারণে তিনি চাননি। কিন্তু যখন জানানো হলো যথাযথ বিবরণ না দিলে পার্টির সদস্যপদ কাটা যাবে। পার্টির সদস্যপদ টিকিয়ে রাখতে তিনি রাজি হলেন। তিনি বিশ^াস করতেন এবং ধারণ করতেন যে, পার্টির বাহিরে কোনো জীবন ছিল না তাঁর। যাদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন, তাদের কারোরই কোনো শাস্তি হয়নি। শাস্তি হয়েছে ঠিকই সেটি ইলা মিত্রের। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এমনকি ফাঁসি হয়ে যেত, নেহায়েত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে।
পুলিশ বাহিনীর সবায় যে তাঁর উপর নির্যাতন করেছে তা কিন্তু নয়। যেমন একজন ছিলেন নবাবগঞ্জ থানার ওসি। ইলা মিত্র লিখেছেন ‘‘ওসি রহমান সাহেব রাতে সবার অলক্ষ্যে সেলে এসে আমার মাথা ধুইয়ে দিতেন। ফল খাইয়ে দিতেন। সে মহানুভতার কথা আমি ভুলব না। ০৭ দিন ছিলাম নবাবগঞ্জ থানায়। ০৭টি রাত্রই তিনি সেবা করেছিলেন, ঔষধ খাইয়ে ছিলেন। নতুবা আমি মরে যেতাম। অনেকে আমাকে সেলের ভিতর মারতে এসেছিল। কিন্ত ওসি সাহেব সকলকে থামিয়ে ছিলেন এই বলে যে, কোর্টে বিচারাধীন ওর গায়ে কেউ হাত তুলতে পারবে না। অন্যরা তখন চাপ দিচ্ছিল মনগড়া স্বীকারোক্তিতে তাঁর সই নিতে। ইলা মিত্রের কানে কানে তখন ওসি সাহেব বলেছিলেন ‘‘ওরকম কাগজে সই দিতে নেই।’’ ইলা মিত্র তাঁর উপলদ্ধি থেকে বললেন ‘‘মৃত্যুর পাশাপাশি জীবন ও সভ্যতা এই দূতেরা না থাকলে আমার জীবন অবশ্যই নিশ্চিন্ন হয়ে যেতো।’’
সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সমস্ত যুগের সংগ্রামী মানুষের মহৎ ঐতিহ্যের আমরা একমাত্র উত্তরাধিকারী। আজকের দুনিয়ায় যারা নির্যাতিত মানুষ। তারা নির্যাতিত সংগ্রামী মানুষ। যে নির্যাতনকারী সে কোনো মহৎ ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হতে পারে না। বলতে দ্বিধা নেই যে, সকল মহৎ সংগ্রামের, মহৎ ঐতিহ্যের একমাত্র উত্তরাধিকারী হচ্ছেন নির্যাতিত মানুষ।
ইলামিত্রের উপর যত আলোচনাই করা হোক না কেন, আমার কাছে সীমিত বলে মনে হবে। কারণ যিনি সামান্য গৃহবধূ থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অধ্যাপিকা, অধ্যাপিকা থেকে পশ্চিম বঙ্গের বিধান সভায় চারবার সদস্য নির্বাচিত হওয়া, নারী শিক্ষায় অন্যতম সংগঠক এবং ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলনের সম্মুখ সারির নেত্রী। এতকিছু করতে গিয়ে তিনি কখনো নিজের সুখের কথা ভাবেন নি। বিশেষ গুণ ছিল যেটি, সেটি হচ্ছে- তেভাগা আন্দোলনের সেই কৃষকদেরই একজন হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁদের সকলের স্বার্থ এক ও অভিন্ন হয়ে গিয়েছিল সঙ্গে ইলা মিত্রের স্বার্থও। আর সেখানেই মনের জোরটা ছিল তাঁর।
তিনি আমাদের কাছে যে উদাহরণ ও উত্তরাধিকার রেখে গেলেন তা আমাদের স্মৃতির মানসপটে জ¦ল জ¦ল করবে ক্রমাগতভাবে অনন্তকাল। ইলা মিত্রের জীবন ও কর্মের নানাদিক আমাদের সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনে প্রবাহিত রক্তের মতো কাজ করবে যুগে যুগে। তিনি আমাদের জীবনবোধে ও চেতনায় একটা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন পরম আস্থার সোঁপান হিসেবে। ইলা মিত্রের মতো এমন জীবনব্যাপী অঙ্গীকারবদ্ধ বিপ্লবী নারী আমাদের নিকট অতীতে বিরল, ভবিষ্যতেও দুর্লভ। ইলা মিত্র আমাদের প্রগতির অন্যতম আলোকসম মানুষ।
লেখক: অধ্যাপক, কলাম লেখক ও প্রাবন্ধিক
