বুধবার ● ৭ অক্টোবর ২০২৬
২২ আশ্বিন ১৪৩৩
স্বপ্নের মায়াজালে কুমিল্লা
শান্তিরঞ্জন ভৌমিক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৬ এএম আপডেট: ০৬.১০.২০২৬ ২:০৫ এএম |

 স্বপ্নের মায়াজালে কুমিল্লা
শোন বন্ধু শোন, এই শহরে ইতিকথা।
ইটের পাঁজরে লোহার খাঁচায় দারুন মর্মব্যথা।।
স্বপ্ন দু’প্রকার। নিশীথে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখা, যার কোনো ভিত্তি নেই। তারপরও মানুষ স্বপ্নের কথা বলে, মনে রাখতে চায়। পঞ্জিকায় স্বপ্নতত্ত্ব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনাও আছে। অপর স্বপ্নটি হলো ‘দ্বিবাস্বপ্ন’। তা না ঘুমিয়ে মানুষ অলস সময়ে স্বপ্নটি নিবিষ্টমনে দেখতে থাকে, ভালোও লাগে। তারও কোনো ভিত্তি নেই। কেবলই মনের অভিলাষ বা আত্মসুখ যাপন। আরেকটি স্বপ্ন আছে। সে স্বপ্নটিই আসলে প্রকৃত স্বপ্ন, যার সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়, স্বপ্নটি বাস্তবায়নে জীবন উৎসর্গ করতে হয়। তা প্রতিজ্ঞা নামান্তর। সে স্বপ্নটি কি ?
ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবুল কালাম বলেছেন- স্বপ্ন হলো তা, যা তোমাকে ঘুমুতে দেয় না। ঘুম যেন হারাম হয়ে যায়। এখন এ কথা কেন ? কারণ, আমি বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার কুমিল্লা শহরের একজন ৬৫/৬৬ বছর যাবত বসবাসকারী নাগরিক। আমি শহরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখাই, স্বপ্নের কথা শুনি, স্বপ্নজালে জড়িয়ে আছি।
বিংশ শতাব্দীর ষাটের দশকে অর্থাৎ ১৯৬১ সালে মেট্রিক পাশ করে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে আই,এ ভর্তি হই। কলেজে ভর্তি হয়েই শুনি যে, কুমিল্লায় একটি বিশ^বিদ্যালয় হবে। গরিব শিক্ষকের ছেলে তারপরও মনে মনে ভেবেছি, যদি বিশ^বিদ্যালয় হয়, তবে সামর্থ, যোগ্যতা, সুযোগ থাকলে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারব। কারণ বিশ^বিদ্যালয়টি অন্তত নাগালের মধ্যে থাকবে। পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রীসভায় কুমিল্লার দেবিদ্বার বড়শালঘরের কৃতিসন্তান জনাব মফিজুদ্দিন আহমদ প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী, তাঁর নেতৃত্বে কুমিল্লা শহরের পশ্চিম প্রান্তে বিশ^বিদ্যালয়ের জন্য ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিধি বাম। প্রেসিডেন্ট আয়ুব বিদেশে সফর করতে যাওয়ার সময় চট্টগ্রামের ফ, কা চৌধুরী, যিনি স্পীকার ছিলেন, একদিনের জন্য প্রেসিডেন্টের দায়িত্বভার পেয়েই প্রস্তাবিত কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়টিকে ছিনিয়ে নিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার জঙ্গলে ঢুকিয়ে দিলেন। কুমিল্লাবাসীর স্বপ্নভঙ্গ হলো। ৪০ বছর পর কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পায়, তাও আবার জঙ্গলে। বলে রাখি, তখন কুমিল্লায় বিশ^বিদ্যালয়ের প্রয়োজন ছিল না। কারণ, তখন কলেজেই বিশ^বিদ্যালয় হয়ে গেছে। কলেজগুলো লিখতে শুরু করেছে ‘বিশ^বিদ্যালয় কলেজ’। অর্থাৎ চাচা ছিল, এখন ‘রহিম চাচা’।
বিশ^বিদ্যালয় স্থাপন জঙ্গলে কেন ? আমাদের যতীনস্যার স্কুলে পড়া না পারলে বেত দিয়ে মারতেন আর বলতেন- কত গরু মানুষ করলাম, তোকেও মানুষ করব। তাই পাকিস্তান আমলে রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয় স্থাপিত হয় শহর থেকে ৩/৪ কিলোমিটার দূরে, চট্টগ্রামের কথা তো বল্লামই, কুমিল্লাও তা-ই। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্ররা সরকারকে ভীষণ যন্ত্রণা দেয়, তার শক্তি কমানোর জন্য ঢাকার অদূরে সাভারে জাঙ্গীর নগর মুসলিম বিশ^বিদ্যালয় (আবাসিক) প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্বাধীনতার পর ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়। লোকালয়ের লোক মানুষ হবে, পরিবেশগতভাবে অনেকটা মানুষ এমনিতেই তারা হয়ে আছে, যতীনস্যারের গরুগুলোকে জঙ্গলেই অন্যান্য জীবসকলের সমন্বয়ে মানুষ করা হবে এবং মানুষ হচ্ছে। আবার ‘অপ্রতিমের’ মতো বাচ্চারা বনে-জঙ্গলে হারিয়েও যাচ্ছে। যাক সে সব কথা। কুমিল্লাবাসী স্বপ্ন দেখেছিল একটি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার, বড় অসময়ে দাবিহীন সময়ে তা সমাপ্ত হলো। কিন্তু স্বপ্নবাস্তবায়নে কোনো আনন্দ পাওয়া গেল না।
আশির দশকে কুমিল্লা স্বপ্ন দেখতে শুরু করল যে, কুমিল্লাকে ‘বিভাগ’ করতে হবে। পক্ষে যুক্তি অনেক। একসময় কুমিল্লা ত্রিপুরারাজ্যের সমৃদ্ধ সমতল অঞ্চল ছিল। শিক্ষা দীক্ষায় সংস্কৃতিতে ছিল উপমহাদেশের অন্যতম উজ্জ্বল জনপদ। পাকিস্তান হওয়ার পর কুমিল্লা ৪টি মহকুমা নিয়ে জেলা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-চাঁদপুর-কুমিল্লা উত্তর-কুমিল্লা দক্ষিণ। আশির দশকে মহকুমাগুলো জেলা হয়ে যায়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-চাঁদপুর এবং কুমিল্লা উত্তর-দক্ষিণ মিলে একটি জেলা অর্থাৎ কুমিল্লা তিনটি জেলায় পরিণত হয়। তখন কেউ প্রশ্ন বা দাবি করল না- কুমিল্লা উত্তর ও কুমিল্লা দক্ষিণ এ দুটি মহকুমা দু’টি জেলা হবে না কেন ? এখন ১৭/১৮টি উপজেলা নিয়ে একটি মাত্র জেলা। বিভাগ হতে হলে কমপক্ষে ৪টি জেলার প্রয়োজন। আশা করা হয়েছে বা হয়েছিল নোয়াখালী সাথে থাকবে, এখন নোয়াখালী নিজেই বিভাগ হতে দাবি জানাচ্ছে।
কুমিল্লার বিভাগ নিয়ে যাঁরা উত্থাপন করেছিলেন, তাঁরা আজ কেউ বেঁচে নেই। দাবিনামা হাত বদল হতে হতে এখন বাজার পণ্য। যাঁরা প্রথম যাত্রা শুরু করেছিলেন, শ্রদ্ধার সাথে নাম উচ্চরণ করছি- সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা ভাই, এডভোকেট মুখলেছুর রহমান প্রমুখ। তাঁরা এখন হারিয়ে গেছেন। এক সময় সরকার বললেন- কুমিল্লাকে বিভাগ করা হবে। এরই মধ্যে রংপুর-রবিশাল-সিলেট-খুলনা-ময়মনসিংহ বিভাগ হয়ে গেছে। কুমিল্লা বিভাগ হচ্ছে না কেন ? সরকার প্রধান কুমিল্লা নামে বিভাগ দিতে ইচ্ছুক নন। তাঁর ভীষণ অভিমান-ক্ষোভ। নাম পাল্টাতে হবে- লালমাই, নয়ত ময়নামতি, কুমিল্লাবাসী থেকে আপত্তি উঠল। তাহলে মেঘনা। এটা তো নদী, চাঁদপুর তার ঢালে অবস্থিত। তাহলে চাঁদপুর ? কুমিল্লাবাসী মানবে কেন ? সরকার আসে, সরকার যায়- আর বলে ‘কুমিল্লা বিভাগ’ হবে। বিষয়টি এমন- ছেলেটি বলে এই আমগাছের আম বড় মিঠা (মিষ্টি)। তাকে জিজ্ঞাসা করে একজন- তুমি খেয়েছ ? ছেলেটি বলে ‘মামু কইছে (বলছে), পাকলে দিব’। মামুর আমগাছের আম তো এখনও পাকে না। যে স্বপ্ন কুমিল্লাবাসী হৃদয় ধারণ করে ঘুমুচ্ছে না, তা তো বাস্তবায়ন দেখছি না। আর যদি কোনোদিন ‘বিভাগ’ হয়ও, তখন তার কোনো বাড়তি আমেজ থাকবে না। এমনিতেই সিটি কর্পোরেশনের জ¦ালায় বাঁচি না। হায়রে বিভাগের জন্য স্বপ্ন, তুমি ঠিক মতো ঘুমুতেও দেও না।
প্রথম বিশ^যুদ্ধে কুমিল্লায় বিমান ঘাটি হয়, মিত্র বাহিনীর সুবিধার জন্য। উড়োজাহাজ উড়ে, যুদ্ধজাহাজ উড়ে হেলিকাপ্টার পাখা ঘুরায়-বিশাল এয়ারপোর্ট, কুমিল্লার গর্ব। একসময় তা অকেজো হয়ে পড়ে, আস্তে আস্তে সকল কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। বিস্তৃত তো বলতে পারবো না, তবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিমানবন্দরটি চালু হয়। এখান থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম উড়োজাহাজ উঠানামা করে। ১৯৭২ সালে আমি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া কলেজের শিক্ষক। বৌদ্ধ পূর্ণিমায় প্রধান অতিথি হিসেবে কুমিল্লা থেকে পণ্ডিতপ্রবর ড. রাসমোহন চক্রবর্তী ও তাঁর সাথী উমেশ চক্রবর্তীকে নিয়ে উড়োজাহাজে চট্টগ্রামে যাই। ভাড়া মাথাপিছু ৪২টাকা। আমার জীবনে প্রথম এবং শেষ উড়োজাহাজ যাত্রা। বৈশাখ মাস। আকাশে একটু মেঘ ছিল, তাই চট্টগ্রামের বিমান বন্দরে নামাতে দেরি হয়। এই ফাঁকে প্লেনটি বঙ্গোপসাগরের উপরে দু’চক্র ঘুরে, সাগরটি দেখি প্রাণভরে। এখন কুমিল্লার বিমান বন্দরটি বন্ধ। স্বপ্ন দেখি, স্বপ্ন দেখায়-বিমানবন্দর চালু হবে। এখানে ইপিজেড আছে, মানুষের বিদেশ ভ্রমণের প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে, দ্রুত যাতায়াত করা জরুরি। এতকিছু প্রাসঙ্গিকতা থাকার পরও বিমানবন্দরটি চালু হচ্ছে না। কুমিল্লা নিরাশ, হতাশ আশাহত। তাহলে স্বপ্নটি কি এভাবেই শেষ হয়ে যাবে ?
দাবি উঠেছে কুমিল্লা-ঢাকা রেললাইন স্থাপনের, রেলচলাচলের। যদি বাস চলাচল করে দেড় ঘন্টার রাস্তা যানজট, দুর্ঘটনা, মারামারি, চাঁদাবাজি, ভাড়ার পরিমাণও অধিক ইত্যাদি কারণে মানুষ অতিষ্ঠ। তারপরও রেল গাড়ি দিয়ে ঢাকা যেতে হলে ৭/৮ ঘন্টা লেগে যায়, ঢাকা-কুমিল্লা রেল চলাচল করলে একঘন্টা বা তার চেয়েও কম সময় ব্যয় হবে, রাজধানীর লোকসংখ্যাও ভারসাম্যে চলে আসবে, খরচও কম, দুর্ঘটনা কম ইত্যাদি। এসব প্রাসঙ্গিকতার কথা বিবেচনা করার জন্য সরকার ও রেলমন্ত্রণালয়ে আবেদন-নিবেদন-ডিও ইত্যাদি দেয়ার পরও কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। মজার ব্যাপার হলো-কুমিল্লাবাসী কুমিল্লায় কোথায় রেলস্টেশন হবে-লাকসাম-লালমাই-বিজয়পুর-পদুয়ারবাজার, না কুমিল্লা রেলস্টেশন- এ নিয়ে বিভিন্ন মতামত এবং ক্ষমতাবান বলেছেন- বরুড়া হয়ে যেতে হবে, চান্দিনা নয় কেন, মুরাদনগর দোষ করল কি , দাউদকান্দি তো উৎপেতে বসে আছে। কথায় বলে না- পীরের দেখা নেই, শিন্নির কোতকুতি। হায়রে স্বপ্ন বিলাস। মানুষ ভাবে এক, ঘটনা ঘটে জামতলায়-আমতলায়।
চলবে...













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২