
২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন একটি দিন খুব কমই আছে, যার সঙ্গে মানুষের অস্তিত্বের এত নিবিড় সম্পর্ক। শান্তি ছাড়া সভ্যতা টিকে থাকতে পারে না, অর্থনীতি এগোয় না, বিজ্ঞান বিকশিত হয় না, পরিবার নিরাপদ থাকে না, রাষ্ট্র স্থিতিশীল হয় না। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো-মানুষ সভ্যতার শুরু থেকেই শান্তির সন্ধান করছে, কিন্তু শান্তিকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না।
শান্তিকে যদি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে শান্তির প্রকৃত চিত্র কখনোই পাওয়া যাবে না। একটা দেশে যুদ্ধ নেই, সীমান্তে গুলির শব্দ নেই, কিংবা দীর্ঘদিন বড় ধরনের কোনো সশস্ত্র সংঘাত ঘটেনি, এগুলো অবশ্যই শান্তির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ; কিন্তু এগুলোই শান্তির সম্পূর্ণ পরিমাপক নয়।
প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না তা বুঝতে হলে দেখতে হবে সমাজে সহিংসতা কতটা কমেছে, মানুষ কতটা নিরাপদে জীবনযাপন করছে, ন্যায়বিচার কতটা নিশ্চিত হয়েছে, নাগরিকের অধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ কতটা সুরক্ষিত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কতটা কমেছে, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহাবস্থান কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বিরোধ দেখা দিলে তা অস্ত্র ও প্রতিশোধের পরিবর্তে আলোচনা, আইন ও কূটনীতির মাধ্যমে সমাধান করা যাচ্ছে কি না।
শান্তির প্রথম ও সবচেয়ে দৃশ্যমান প্যারামিটার হলো সহিংসতার অনুপস্থিতি। যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাস, হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতা কিংবা সশস্ত্র সংঘাত যত বেশি থাকে, কোনো সমাজকে তত কম শান্তিপূর্ণ বলা যায়। কিন্তু সহিংসতা না থাকাই শান্তির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। কারণ একজন মানুষ হয়তো যুদ্ধের মধ্যে নেই, কিন্তু সে যদি প্রতিদিন অপরাধ, ভয়, রাজনৈতিক নিপীড়ন বা সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করে, তাহলে তার জীবনকে পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ বলা কঠিন।
এখান থেকেই শান্তির দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্যারামিটার মানবনিরাপত্তা। মানুষ তার জীবন, খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান, শিক্ষা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে কতটা নিশ্চিন্ত-শান্তি পরিমাপের ক্ষেত্রে সেটিও বিবেচনা করতে হবে। রাষ্ট্রের সীমান্ত নিরাপদ অথচ রাষ্ট্রের ভেতরের মানুষ নিরাপত্তাহীন-এমন অবস্থাকে পূর্ণাঙ্গ শান্তি বলা যায় না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন। একটি সমাজে মানুষ যদি বিশ্বাস করে যে অন্যায় হলে সে ন্যায়বিচার পাবে, আইন সবার জন্য সমান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তার অধিকার রক্ষা করবে, তাহলে সেখানে শান্তির ভিত্তি শক্তিশালী হয়। বিপরীতে বিচারহীনতা, আইনের অসম প্রয়োগ, ক্ষমতাবানদের দায়মুক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা সমাজের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। তাই শান্তি শুধু বন্দুকের নীরবতা নয়; আদালত, আইন ও প্রতিষ্ঠান মানুষের মধ্যে যে ন্যায়বিচারের আস্থা তৈরি করে, সেটিও শান্তির অংশ।
শান্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো রাজনৈতিক অধিকার ও অন্তর্ভুক্তি। মানুষ কি স্বাধীনভাবে নিজের মত প্রকাশ করতে পারে? ভিন্নমত পোষণ করলেও কি তার নিরাপত্তা ও মর্যাদা বজায় থাকে? নাগরিকরা কি রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়? রাজনৈতিকভাবে কোনো জনগোষ্ঠী যদি দীর্ঘদিন নিজেকে বঞ্চিত, উপেক্ষিত বা রাষ্ট্রের বাইরে মনে করে, তাহলে বাহ্যিক স্থিতিশীলতার মধ্যেও অশান্তির বীজ তৈরি হতে পারে। ফলে শান্তির সঙ্গে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, প্রতিনিধিত্ব, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার গভীরভাবে সম্পর্কিত।
একইভাবে সামাজিক ন্যায় ও বৈষম্য শান্তির একটি মৌলিক প্যারামিটার। সমাজে যদি সম্পদ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, রাজনৈতিক সুযোগ ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর বৈষম্য থাকে, তাহলে শুধু যুদ্ধ না থাকার কারণে সেই সমাজকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বলা যায় না। বিশেষ করে কোনো ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষাগত বা সামাজিক গোষ্ঠী যদি মনে করে যে তারা নিয়মিতভাবে বঞ্চিত হচ্ছে, তাহলে সেই বঞ্চনা ভবিষ্যৎ সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করতে পারে। এখানেই শান্তির ধারণা শুধু নিরাপত্তা থেকে ন্যায়বিচারের দিকে প্রসারিত হয়।
এরপর আসে সামাজিক আস্থা ও সম্প্রীতি। একটি শান্তিপূর্ণ সমাজে মানুষ শুধু আইনের ভয়ে সহিংসতা থেকে বিরত থাকে না; বরং তারা একে অপরের অস্তিত্ব, অধিকার ও মতপার্থক্যকে স্বীকার করে। ভিন্ন ধর্ম, জাতি, ভাষা, শ্রেণি কিংবা রাজনৈতিক মতের মানুষ যদি পরস্পরকে শত্রু না ভেবে সহাবস্থানকারী নাগরিক হিসেবে দেখতে পারে, তাহলে সমাজের শান্তির ভিত্তি শক্তিশালী হয়। বিপরীতে পারস্পরিক অবিশ্বাস, ঘৃণা, প্রতিশোধের মানসিকতা এবং ‘আমরা বনাম তারা’-র সংস্কৃতি থাকলে সাময়িকভাবে সহিংসতা বন্ধ থাকলেও শান্তি ভঙ্গুর থেকে যায়।
এরপর দেখতে হবে বিরোধ কীভাবে নিষ্পত্তি হচ্ছে। কোনো সমাজ বা রাষ্ট্রে মতপার্থক্য ও স্বার্থের সংঘাত থাকবেই। শান্তিপূর্ণ সমাজ মানে সংঘাতহীন সমাজ নয়; বরং এমন সমাজ, যেখানে সংঘাতকে সহিংসতায় রূপ নেওয়া থেকে রোধ করার কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে আদালত, সংসদ, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, মধ্যস্থতা, আলোচনা, সংলাপ ও কূটনীতি কার্যকর থাকে। একই বিষয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু তারা যদি যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনা, আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি ও সহযোগিতার পথ বেছে নেয়, তাহলে সেটিই টেকসই শান্তির লক্ষণ।
অতএব শান্তিকে একটি মাত্র সূচকে মাপা যায় না। সহিংসতার অনুপস্থিতি, মানবনিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন, রাজনৈতিক অধিকার ও অন্তর্ভুক্তি, সামাজিক ন্যায় ও বৈষম্য হ্রাস, পারস্পরিক আস্থা ও সামাজিক সম্প্রীতি এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি-এই সাতটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনা করলেই একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে শান্তি কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার একটি তুলনামূলক পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব।
আর এই প্যারামিটারগুলো সামনে রাখলেই পরবর্তী প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে-মানুষ যদি শান্তির জন্য এত প্রতিষ্ঠান, আইন, ধর্ম, দর্শন, রাষ্ট্র, কূটনীতি ও বিজ্ঞান তৈরি করে থাকে, তাহলে পৃথিবীতে স্থায়ী শান্তি এখনো কেন প্রতিষ্ঠিত হলো না? এখান থেকেই শুরু হয় শান্তি সম্পর্কে থমাস হবস, ইমানুয়েল কান্ট, জোহান গালতুং, রিয়ালিজম, সিকিউরিটি ডিলেমা এবং কনফ্লিক্ট ট্রান্সফরমেশন-এর দীর্ঘ তাত্ত্বিক আলোচনা।
এই সাতটি প্যারামিটারকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে শুধু রাষ্ট্রের আইন বা সামরিক শক্তি যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ন্যায়ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, মানবিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক সুযোগ, সামাজিক আস্থা এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম প্রয়োজন সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
থমাস হবস-এর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল নিরাপত্তার এই প্রশ্ন। তার মতে, এমন একটি কর্তৃত্ব প্রয়োজন যা মানুষের পারস্পরিক ভয় ও সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এখান থেকে আধুনিক রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব দাঁড়ায়-নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও নিরাপত্তা রক্ষা করা।
কিন্তু শুধু শক্তিশালী রাষ্ট্রই শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না; রাষ্ট্রীয় শক্তির ব্যবহারকে অবশ্যই আইন ও জবাবদিহির মধ্যে রাখতে হয়। না হয় নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার নামে রাষ্ট্র নিজেই নিপীড়নের উৎস হয়ে উঠতে পারে। ফলে শান্তির জন্য প্রয়োজন কার্যকর পুলিশ ও বিচারব্যবস্থা, আইনের শাসন, নাগরিক নিরাপত্তা এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন। জন রলস-এর ন্যায়বিচারের ধারণা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে একটি স্থিতিশীল সমাজ শুধু আইন দিয়ে টিকে থাকে না; মানুষকে এমন একটি সামাজিক ব্যবস্থা দিতে হয়, যেটিকে তারা ন্যায্য বলে গ্রহণ করতে পারে। যদি মানুষ মনে করে যে রাষ্ট্রের সম্পদ, সুযোগ, অধিকার ও প্রতিষ্ঠান কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য এবং অন্যদের জন্য নয়, তাহলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই শান্তির জন্য স্বাধীন ও কার্যকর বিচারব্যবস্থা, আইনের সমান প্রয়োগ, জবাবদিহি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিকের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ অপরিহার্য।
শান্তির তৃতীয় ভিত্তি হলো রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি ও অংশগ্রহণ। ইমানুয়েল কান্ট-এর পারপেচুয়াল পিস ধারণায় গণতান্ত্রিক বা প্রজাতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্ব রয়েছে। তার চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো-যে রাষ্ট্রে নাগরিকরা নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অংশীদার, সেখানে যুদ্ধ ও ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনস্বার্থের গুরুত্ব বাড়ে।
আধুনিক গণতান্ত্রিক শান্তি তত্ত্বও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহির সঙ্গে আন্তঃরাষ্ট্রীয় শান্তির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছে। সুতরাং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু নির্বাচন থাকলেই হবে না; প্রয়োজন অর্থবহ রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী মতের প্রতি সহনশীলতা, প্রতিনিধিত্ব, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন এবং এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।
কিন্তু রাজনৈতিক অধিকার থাকলেই শান্তি নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার। জোহান গালতুং-এর ইতিবাচক শান্তি ধারণা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তার মতে, প্রত্যক্ষ সহিংসতা বন্ধ করলেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় না; সমাজের ভেতরে যে কাঠামোগত বৈষম্য ও বঞ্চনা মানুষকে পিছিয়ে রাখে, সেগুলোও দূর করতে হয়।
একটি শিশু যদি জন্মের কারণে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, একটি জনগোষ্ঠী যদি দীর্ঘদিন সম্পদ ও সুযোগ থেকে বাদ পড়ে, কিংবা কোনো শ্রেণি যদি রাষ্ট্রীয় সুযোগ থেকে নিয়মিতভাবে বঞ্চিত হয়, তাহলে সেখানে যুদ্ধ না থাকলেও শান্তির ভিত দুর্বল থাকে। তাই শান্তির জন্য দরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি, মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সুযোগের ন্যায্য বণ্টন।
এখানে মানবনিরাপত্তা ধারণা শান্তির অর্থকে আরও বিস্তৃত করে। জাতিসংঘের মানবনিরাপত্তা ধারণা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার পাশাপাশি মানুষের দৈনন্দিন নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ মানুষ যেন ভয় ও অভাব-দুই ধরনের অনিরাপত্তা থেকে মুক্ত থাকে। খাদ্যনিরাপত্তা, স্বাস্থ্যনিরাপত্তা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, রাজনৈতিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা তাই শান্তির বৃহত্তর কাঠামোর অংশ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে একটি রাষ্ট্রকে শুধু সীমান্ত রক্ষা করলেই হবে না; নাগরিকের জীবনযাত্রার মৌলিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
শান্তির আরেকটি অপরিহার্য উপাদান হলো সামাজিক আস্থা ও সম্প্রীতি। এখানে সামাজিক পুঁজি-এর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। রবার্ট ডেভিড পুটনাম-এর কাজ থেকে বোঝা যায়, সামাজিক সম্পর্ক, পারস্পরিক আস্থা এবং সহযোগিতার নেটওয়ার্ক একটি সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করতে সহায়তা করে।
মানুষ যদি মনে করে অন্য মানুষ, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিশ্বাসযোগ্য, তাহলে বিরোধ সহজে সহিংসতায় রূপ নেয় না। ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু আইন প্রয়োগ নয়; পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোও পারস্পরিক আস্থা ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হয়।
এখানে শিক্ষা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শান্তির সংস্কৃতি তৈরি না হলে শান্তির প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল হয়ে যেতে পারে। শিশু যদি ছোটবেলা থেকে ভিন্নমতকে ঘৃণা করতে শেখে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে করতে শেখে কিংবা ধর্মীয় ও সামাজিক পার্থক্যকে সংঘাতের কারণ হিসেবে দেখতে শেখে, তাহলে ভবিষ্যৎ সমাজে সহিংসতার সম্ভাবনা থেকেই যায়। তাই শান্তির জন্য শান্তি শিক্ষা, মানবাধিকার শিক্ষা, নাগরিক শিক্ষা, সহনশীলতা, সংলাপের সংস্কৃতি এবং ভিন্নতার প্রতি সম্মান গড়ে তোলা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে শান্তির জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো পারস্পরিক আস্থা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তববাদী তত্ত্ব আমাদের দেখায়, রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে প্রায়ই অস্ত্র ও সামরিক শক্তি বাড়ায়। এখানেই তৈরি হয় নিরাপত্তা দ্বিধা। একটি রাষ্ট্র নিজের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র বাড়ালে অন্য রাষ্ট্র সেটি হুমকি হিসেবে দেখে এবং তারাও অস্ত্র বাড়ায়। ফলে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু একতরফা নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস-নির্মাণ ব্যবস্থা, সামরিক যোগাযোগ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা, কূটনৈতিক সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তি। অর্থাৎ রাষ্ট্রগুলো এমন ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে একজনের নিরাপত্তা অন্যের নিরাপত্তাহীনতার কারণ না হয়।
এই জায়গায় উদারনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকতাবাদ-এর ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ। রবার্ট ওয়েন কেওহান-এর মতো তাত্ত্বিকদের আলোচনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও নিয়ম রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কারণ সব রাষ্ট্রই সবসময় একে অপরের শত্রু নয়; তাদের মধ্যে বাণিজ্য, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির মতো অসংখ্য অভিন্ন স্বার্থ থাকে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অভিন্ন স্বার্থকে সহযোগিতায় রূপ দিতে পারে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আদালত, আঞ্চলিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং কূটনৈতিক ব্যবস্থা তাই শান্তির প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর অংশ।
তবে সংঘাত একবার শুরু হয়ে গেলে শুধু প্রতিষ্ঠান দিয়ে সবসময় তা সমাধান করা যায় না। এখানেই জন পল লেডেরাক-এর সংঘাত রূপান্তর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতের ওপর সাময়িক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং সংঘাতের মূল কারণ পরিবর্তন করা এক বিষয় নয়। দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত সম্পর্ক পুনর্গঠন, অবিশ্বাস কমানো, বঞ্চনার কারণ দূর করা, ক্ষমতার অসমতা মোকাবিলা করা এবং প্রতিপক্ষের মধ্যে সংলাপ তৈরি করা প্রয়োজন। অর্থাৎ শান্তি প্রতিষ্ঠা মানে শুধু যুদ্ধ থামানো নয়; যুদ্ধের যে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো সংঘাত সৃষ্টি করেছিল, সেগুলোকেও পরিবর্তন করা।
আর এখানেই পুনর্মিলন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোনো সমাজ দীর্ঘদিন সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেলে শুধু আইন দিয়ে মানুষের ক্ষত সারানো যায় না। প্রয়োজন সত্য উদ্ঘাটন, স্বীকৃতি, ক্ষমা, ক্ষতিপূরণ, ন্যায়বিচার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে সহাবস্থানের সংস্কৃতি তৈরি করা। দক্ষিণ আফ্রিকার সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপের পুনর্মিলন প্রক্রিয়া এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা হিসেবে আলোচিত হয়।
সবশেষে প্রয়োজন জবাবদিহিমূলক ও সক্ষম রাষ্ট্র। দুর্বল প্রতিষ্ঠান, দুর্নীতি, পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন, বিচারহীনতা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার শান্তির ভিত দুর্বল করে। একটি রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে শক্তিশালী এবং সীমাবদ্ধ-দুই অর্থেই সক্ষম হতে হয়। তাকে নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে হবে, কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে নাগরিকের অধিকার হরণ করা যাবে না। তাকে আইন প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু আইনকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার বানানো যাবে না। তাকে উন্নয়ন করতে হবে, কিন্তু উন্নয়নের সুফলকে সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে রাখা যাবে না।
সুতরাং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মূলত সাতটি প্যারামিটারের পেছনে সাত ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ভিত্তি প্রয়োজন-সহিংসতা কমাতে নিরাপত্তা ও আইনের শাসন; মানবনিরাপত্তার জন্য শিক্ষা-স্বাস্থ্য-কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা; ন্যায়বিচারের জন্য স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহি; রাজনৈতিক শান্তির জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান; সামাজিক শান্তির জন্য বৈষম্য হ্রাস ও সামাজিক আস্থা; সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য সংলাপ, পুনর্মিলন ও সংঘাত রূপান্তর; এবং আন্তর্জাতিক শান্তির জন্য কূটনীতি, আন্তর্জাতিক আইন, আস্থা-নির্মাণ, অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান।
এখানেই শান্তির সবচেয়ে বড় শিক্ষা নিহিত। শান্তি কোনো একটি প্রতিষ্ঠান দিয়ে তৈরি হয় না; শান্তি তৈরি হয় প্রতিষ্ঠান, ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সুযোগ, মানবাধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, সামাজিক আস্থা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্মিলিত কাঠামোর মাধ্যমে। আর এই কাঠামোর কোনো একটি স্তম্ভ দুর্বল হয়ে পড়লে যুদ্ধ না থাকলেও শান্তি ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
