সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩
অপ্রতিমরা কেন আর ঘরে ফেরে না
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৬ এএম আপডেট: ২১.০৯.২০২৬ ১:৪৩ এএম |

  অপ্রতিমরা কেন আর ঘরে ফেরে না
এ ধরনের খবর শুনলে মনটা বিষাদে ছেয়ে যায়। কখনো কখনো মনে হয়, আমরা যেন প্রতিদিন এমন কিছু খবর গিলছি, যেগুলো স্বাভাবিকভাবে কোনও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যই ভালো নয়। সকাল শুরু হয় খুনের খবর দিয়ে, দুপুরে নিখোঁজ শিশু, বিকেলে আগুন, রাতে পিটিয়ে হত্যার খবর। সবকিছু দেখতে দেখতে ভেতরে এক ধরনের অসহায় ক্লান্তি জমে। কতটা আর সহ্য করা যায়? এর শেষ কোথায়?
১৩ বছরের অপ্রতিম বন্ধুদের সঙ্গে বেরিয়েছিল ছবি তুলতে। মায়ের আইফোনটি সঙ্গে নিয়েছিল। বয়সটাই এমন-বন্ধু, ছবি, হাসি, ঘোরাঘুরি, তারপর বাড়ি ফিরে মাকে ছবি দেখানো। কিন্তু অপ্রতিম আর বাড়ি ফেরেনি। তাকে পাওয়া গেছে জঙ্গলে। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা ছিল। শেষ পর্যন্ত ছবি তোলা হয়েছে তার মরদেহের। এই জায়গাটায় এসে আমার বারবার মনে হয়, আমরা আসলে কোন দেশে বাস করছি?
অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা বেগমের ছেলে। কিন্তু তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়, সে একটি শিশু। তার বয়স ছিল পৃথিবীকে ভয় পাওয়ার নয়, পৃথিবীকে চিনে নেওয়ার। তার বয়স ছিল ছবি তুলে স্মৃতি জমিয়ে রাখার। নিজেই স্মৃতি হয়ে যাওয়ার নয়। অপ্রতিমের ঘটনা তাই শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়। আমার কাছে এটি আমাদের চারপাশের নিরাপত্তাবোধ ভেঙে পড়ার এক নির্মম ছবি।
একটি শিশু নিখোঁজ হলে একটি পরিবারও যেন নিখোঁজ হয়ে যায়। পরিচিতদের ফোন করা হয়, বন্ধুদের বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হয়, থানায় যেতে হয়, ছবি ছড়িয়ে দিতে হয়। তারপর শুরু হয় অপেক্ষা। কখন খবর আসে। অপ্রতিমের ক্ষেত্রে সেই খবর এসেছে। কিন্তু কোনো মা এমন খবর পেতে চান না। প্রশ্ন হচ্ছে, অপ্রতিমের মতো আর কত শিশু নিখোঁজ?
পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হয়েছে। ১৩ হাজার ৬৭৯ জন উদ্ধার হয়েছে বা পরিবারের কাছে ফিরেছে। কিন্তু ২ হাজার ৩৮ জন তখনও নিখোঁজ। পুলিশের ব্যাখ্যায়, পারিবারিক বিরোধ, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, স্বাধীনভাবে থাকার আকাক্সক্ষা, অর্থের প্রয়োজন কিংবা বন্ধুদের প্রভাবসহ নানা কারণ থাকতে পারে। কিন্তু কারণ যা-ই হোক, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের অপেক্ষা তো একই রকম থাকে।
দুই হাজার আটত্রিশ। সংখ্যাটি লিখতে কয়েকটি অঙ্কই যথেষ্ট। অথচ এর পেছনে ২ হাজার ৩৮টি পরিবার। ২ হাজার ৩৮টি ঘর। ২ হাজার ৩৮টি বিছানা। ২ হাজার ৩৮টি স্কুলব্যাগ। ২ হাজার ৩৮টি মায়ের বুক। আর অসংখ্য প্রশ্ন—সন্তান কোথায়? কার সঙ্গে? খেতে পেয়েছে? কেউ কষ্ট দিচ্ছে? বেঁচে আছে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর নেই। আছে শুধু অপেক্ষা।
খিলক্ষেতেও তিন বছরের মাহাদি বাড়ি থেকে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন একটি ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। তার বাবা সেদিনই থানায় জিডি করেছিলেন। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ১৩ বছরের স্কুলছাত্র নাহিদ নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর
শীতলক্ষ্যা নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার হয়।
ঘটনাগুলো আলাদা। কিন্তু একজন মা-বাবার কাছে এগুলোর ভাষা একই—সন্তান বাইরে গেছে, আর ফিরে আসেনি। নিখোঁজের ঘটনায় একটি জিডি নেওয়া প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার শুরু হতে পারে, শেষ নয়। ‘জিডি হয়েছে, খোঁজ চলছে’ বলে পরিবারকে বসিয়ে রাখলে দায়িত্ব শেষ হয় না। শেষ কোথায় দেখা গেছে, কার সঙ্গে ছিল, কোন পথে গেছে, ফোনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, কোথায় সিসিটিভি আছে—সবকিছু দ্রুত খুঁজে দেখতে হবে। কারণ নিখোঁজের ক্ষেত্রে সময় শুধু সময় নয়। কখনও কখনও একটি ঘণ্টাই জীবন আর মৃত্যুর পার্থক্য তৈরি করে। কিন্তু ভয়টা শুধু শিশু নিখোঁজ হওয়ার নয়।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে জামালপুর থেকে ঢাকাগামী বাসে ওঠা ইসমাইল হোসেনের মরদেহ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে পাওয়া গেছে। পুলিশের ভাষ্য, বাসের চালক, সুপারভাইজার ও সহকারী তার কাছে থাকা টাকা দেখে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। প্রায় আড়াই লাখ টাকা নিয়ে তাকে হত্যা করে মরদেহ ফেলে দেওয়ার অভিযোগে তিন জন গ্রেফতার হয়েছে।
আমি এই খবর পড়েও থমকে যাই। একজন মানুষ বাসে উঠেছিলেন। কোথাও যাওয়ার কথা ছিল। পরিবারের কাছে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু বাসটাই হয়ে গেল তার শেষ যাত্রা। তাহলে আমরা কোথায় নিরাপদ?
তারপর খুলনা। ‘ভাত চুরি’ করে খাওয়ার অভিযোগে এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগটি সত্য কি না, তা তদন্ত ও বিচারেই নির্ধারিত হবে। কিন্তু অভিযোগ সত্য হলেও কাউকে পিটিয়ে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। আদালত আছে, আইন আছে। সন্দেহের বিচার করার জন্য জনতার হাতে লাঠি দেওয়া হয়নি।
কিন্তু আমরা যেন ধীরে ধীরে সেই কথাটাই ভুলে যাচ্ছি।
মানুষ হত্যার জন্য এখন আর বড় কোনও কারণ লাগে না। চুরি, ছিনতাই, তর্ক, চাঁদা, রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যক্তিগত রাগ-কোনও কিছুই যেন মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার অজুহাত হয়ে উঠতে পারে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, আমরা এতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। সকালে একটি খুনের খবর। দুপুরে নিখোঁজ শিশু। বিকেলে বাসে আগুন। রাতে পিটিয়ে হত্যা। পরদিন নতুন মরদেহ। আমরা পড়ি, একটু অবাক হই, দু-চারটি মন্তব্য করি, তারপর স্ক্রল করে পরের খবর চলে আসি।
খুনের খবরও যেন ডালভাত। কিন্তু খুনের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠছে খুনের খবরের প্রতি আমাদের অসাড়তা। একজন মানুষ মারা গেছে-এই বাক্যের মধ্যে একসময় যে আতঙ্ক ছিল, সেটি যেন কমে যাচ্ছে। নিহত ব্যক্তি কারও বাবা, কারও সন্তান, কারও ভাই, কারও স্বামী। কিন্তু সংবাদপাঠের কয়েক মিনিট পর সেই মানুষটি একটি সংখ্যা হয়ে যায়। একটি শিরোনাম হয়ে যায়। তারপর হারিয়ে যায়। এই অসাড়তাটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়।
কারণ অপরাধী যদি মানুষের জীবনকে তুচ্ছ ভাবতে শেখে, আর সমাজ যদি সেই মৃত্যুকে কেবল আরেকটি খবর হিসেবে গ্রহণ করতে শেখে, তাহলে বিপদ শুধু রাস্তায় নয়; বিপদ আমাদের ভেতরেও। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রশ্ন তাই শুধু কতজন গ্রেফতার হয়েছে, কতটি মামলা হয়েছে, কতটি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে-এতটুকু নয়। আমার প্রশ্ন আরও সরল: মানুষ কি নিরাপদ? শিশু কি নিরাপদ? বাসের যাত্রী কি নিরাপদ? অভিযোগের মুখে পড়া মানুষ কি নিরাপদ? রাগের শিকার মানুষ কি নিরাপদ?
রাষ্ট্রকে অপরাধের পর ব্যবস্থা নিতেই হবে। কিন্তু তার আগেও একটি বার্তা স্পষ্ট করতে হবে-অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে না। নিখোঁজ শিশুর অনুসন্ধানে দ্রুততা চাই। গণপরিবহনে জবাবদিহি চাই। জনতার হাতে বিচার বন্ধ করতে হবে।
আইনের শাসনকে কাগজের কথা না রেখে মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা বানাতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের নিজেদেরও প্রশ্ন করতে হবে। একজন মানুষকে অপছন্দ করা যায়। তার সঙ্গে মতের অমিল হতে পারে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু তারবেঁচে থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না। এই সামান্য কথাটি যদি আমাদের বারবার মনে করিয়ে দিতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে সভ্যতার পাঠে আমরা কোথাও বড় ভুল করেছি।
আমরা শিশুদের বলি, সাবধানে বাইরে যেও। অপরিচিতের সঙ্গে কথা বলো না। কোথায় যাচ্ছ জানাও। অবশ্যই সতর্কতা দরকার। কিন্তু একটি তেরো বছরের শিশুর ওপর পুরো পৃথিবীর বিপদ চিনে চলার দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে আমরা বড়রা নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে পারি না। নিরাপদ পৃথিবী তৈরি করার দায়িত্ব আমাদের।
অপ্রতিমের বয়স ছিল ছবি তোলার। বন্ধুদের ছবি, নিজের ছবি, হয়তো বিকেলের আকাশের ছবি। তার বয়স ছিল স্মৃতি জমিয়ে রাখার; নিজেই স্মৃতি হয়ে যাওয়ার নয়। তার মায়ের আইফোনটি হয়তো আবার ফিরে আসবে। কিন্তু সেই ফোনে যে ছবিগুলো থাকার কথা ছিল, সেগুলো আর কখনও তোলা হবে না। এই জায়গাটাতেই এসে আমার বারবার মনে হয়-আমরা কি সত্যিই এমন একটি দেশ তৈরি করতে পারবো, যেখানে একটি শিশু বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হলে তার মাকে সন্তানের মরদেহের ছবি দেখতে হবে না?
প্রশ্নটি শুধু অপ্রতিমের মায়ের নয়। প্রশ্নটি আমারও। আপনারও। রাষ্ট্রেরও। সমাজেরও। অপ্রতিমকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু তার মৃত্যুকে যদি আরেকটি খবর বানিয়ে ভুলে যাই, তাহলে আমরা শুধু একটি শিশুকে হারাব না; নিজেদের ভেতরের মানবিকতাকেও একটু একটু করে হারাব।
অপ্রতিমের বয়স ছিল তেরো। তার হাতে ক্যামেরা থাকার কথা ছিল। এখন তার ছবি আমাদের হাতে। এই ছবিটা যেন আমাদের ঘুম ভাঙানোর জন্য যথেষ্ট হয়। কারণ অপ্রতিমরা শুধু হারিয়ে যায় না। তাদের সঙ্গে আমাদের নিরাপত্তাবোধ, আমাদের বিবেক, আমাদের সভ্যতার দাবিও একটু একটু করে হারিয়ে যায়।
প্রশ্ন শুধু অপ্রতিমরা কেন আর ঘরে ফেরে না-প্রশ্ন হলো, আমরা কবে এমন একটি দেশ বানাব, যেখানে তাদের ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা থাকবে?
লেখক: কলামনিস্ট












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২