সোমবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৬ আশ্বিন ১৪৩৩
চোখের জলে চিরবিদায় অপ্রতিমের
জহির শান্ত, কুমিল্লা
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৩০ এএম আপডেট: ২১.০৯.২০২৬ ১:৪৪ এএম |

  চোখের জলে চিরবিদায় অপ্রতিমেরমায়ের বুকফাটা আহাজারী আর বাবার চাপা আর্তনাদে শোক ও ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছে কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র পুত্র ইশারয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে পৃথক দুটি জানাজা শেষে গন্ধমতি এলাকায় নিজ বাসভবনের পাশের কবরস্থানে সমায়িত করা হয় তাকে। একমাত্র সন্তানকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য মা-বাবার গগনবিদারী চিৎকারে ভারী হয়ে উঠে গন্ধমতি এলাকার পরিবেশ। চোখ ছলছল হয়ে উঠেছিলো অপ্রতিমকে দাফনে অংশ নেওয়া সকল মানুষের। এসময় তারা নিমর্ম এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
রোববার সকাল ১০টায় মায়ের কর্মস্থল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে রোববার সকালে সন্তানের মরদেহ বাড়িতে আনার পর মায়ের গগনবিদারী চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে কোটবাড়ির গন্ধামতি এলাকার নূরজাহান ভিলার পরিবেশ। অপ্রতিমের মরদেহ যখন শেষ বিদায়ের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল, তখন টানা দুই দিনের নির্ঘুম, ক্লান্ত মা শেষবারের মতো সন্তানের মুখ ছুঁয়ে চুমু দিয়ে বিদায় জানান। একপর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
নাহিদা বেগম বারবার মুর্ছা যেতে যেতে বলতে থাকেন, অপ্রতিম, আমার রুহটাও নিয়া গেলা তুমি। আমার ফড়িংটা ছবি তুলতে পছন্দ করত। সে আর ছবি তুলবে না। আমার রুহটাও চলে গেছে আমার ছেলের সঙ্গে। আমার দেহটা আছে, প্রাণটা নেই রে।
পরে বিশ^বিদ্যালয়ের মাঠে জানাজার পূর্বে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অপ্রিতমের বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার আকুতি জানিয়েছেন, আর কোনো বাবাকে যেন তার মতো সন্তান হারাতে না হয়। তিনি বলেন, বাবার কাঁধে সন্তানের লাশ কতটা কষ্টের, সেটা আজ বুঝতে পারছি। আর কাউকে যেন আমার মতো সন্তান হারাতে না হয়। আমার ছেলের বয়স যখন দুই বছর, তখন সে এই এলাকায় এসেছে। আমার স্ত্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। অপ্রতিম এই এলাকায় আপনাদের কাছেই বড় হয়েছে। তাই আপনাদের কাছেই অপ্রতিমকে সমাহিত করছি।
এসময় কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমার একটাই সন্তান, ওর বয়স ১৩ বছর। আমি ওর বাবা হিসেবে আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থী। ও যদি কোনো আচরণে আপনারা ত্রুটি পান, আপনারা ক্ষমা করে দিবেন। এবং ওর জন্য দোয়া করবেন, ও যেন বেহেশতবাসী হয়।
পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গন্ধমতি এলাকায় দ্বিতীয় জানাজা শেষে অপ্রতিমকে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়।
এদিকে অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের পর লালমাই পাহাড় ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কয়েকজন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে আগে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তারা প্রশ্ন তোলেন তারা। পরে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকা অবরোধ করেন। এসময় প্রায় দেড় ঘন্টা যাবত তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এসয় মহাসড়কের দুই লেনে যাত্রী ও পণ্যবাহী পরিবহনের দীর্ঘ সারি দেখা দেয়। পরে বেলা ১টার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরোধ তুলে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

‘বন্ধুকে শেষ বিদায় দিয়ে গেলাম’:
‘ক্লাসে আমি আর অপ্রতিম একসঙ্গে বসতাম। অপ্রতিম যেখানে বসত, সেখানে বেঞ্চে ওর নাম লিখে রাখছে সে, আমরা কেউ তার জায়গায় বসতাম না। অপ্রতিম অনেক ভালো ছাত্র ছিল। স্যার যে পড়াগুলো দিতেন, সেগুলো সে প্রতিদিন এসে স্যারের কাছে বলত। আজকে বন্ধুটাকে শেষ বিদায় দিয়ে গেলাম।’ 
রবিবার বেলা ১১টার দিকে কোটবাড়ি গন্ধমতি ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে এ কথাগুলো বলছিলো অপ্রতিমের সহপাঠি সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মো.আরিফুল ইসলাম। এসময় অপ্রতিমের ক্লাসের অন্তত ১৫-২০ জন সহপাঠি উপস্থিত ছিলো। 
আরিফুল আরও বলেন, শুক্রবার বিকালে ফেসবুকে যখন দেখলাম অপ্রতিম নিখোঁজ, তখন আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। অপ্রতিম হারিয়ে যাওয়ার মতো ছেলে না, নিশ্চয়ই ওকে কেউ কিছু করেছে।’ এই কথা বলতে বলতে থেমে যায় আরিফ। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বলতে শুরু করে সে। অপ্রতিমের সঙ্গে কাটানো শেষ সময়ের কথা মনে করে আরিফ বলেন, ‘হারিয়ে যাওয়ার আগের দিন বৃহস্পতিবার বিকেলে আমরা একসঙ্গে ফুটবল খেলেছি। তখন তো বুঝতেই পারিনি, এটাই ওর সঙ্গে আমাদের শেষ দেখা। স্কুলে কোন অনুষ্ঠান হলে আমরা এক সঙ্গে খেলাধুলা করতাম, হাসাহাসি করতাম। অপ্রতিম আর আমাদের মাঝে নেই এই বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। 
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার আরেক সহপাঠী সিয়াম বলে, অপ্রতিমকে শেষবারের মত বিদায় দিতে এসে বুক কেঁপে উঠছে। এত তারাতারি তাকে বিদায় দেব এটা ভাবতেও পারেনি। ক্লাসে তার শূন্যতা কোনদিনও পূরণ হবে না। আমাদের ক্লাসে প্রায় ৯০ জন সহপাঠি আছে, আমরা সবাই তার জন্য কেঁদেছি। অপ্রতিমকে যেভাবে যারা হত্যা করেছে আমরা ঠিক সেভাবেই তার হত্যাকারীদের বিচার দেখতে চাই। 


আইফোন ছিনিয়ে নিতেই হত্যা: 
এদিকে আইফোন ছিনিয়ে নিতেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার মোঃ আনিসুজ্জামান। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার ও আটকের তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, এদের মধ্যে তিনজন সরাসরি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। বাকি একজনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অধিকতর যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। রোববার দুপুর দুইটায় এক সংবাদ সম্মেলনে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এ তথ্য জানান। 
গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে- সাদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকার নূরে আলমের ছেলে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), সালমানপুর এলাকার মমিন হোসেনের ছেলে মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ ( ১৫), সদর উপজেলার হাতিগাড়া এলাকার মো. আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে কামরুল হাসান (১৫) ও সদর দক্ষিণের এলাহিপুর এলাকার সেলিম মিয়ার ছেলে মো. সিয়াম (১৮)। 
পুলিশ সুপার জানান, অপ্রতিমকে হত্যা করতে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল মিলেই তাকে আঘাত করেছে। মাথায় বাঁশের লাঠি দিয়ে সংঘবদ্ধ ভাবে আঘাত করে অপ্রতিমের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। হত্যায় সক্রিয় ভূমিকা রাখায় অভিযুক্ত তিনজনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। এছাড়াও এ হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে সিয়াম নামে আরো একজনকে আটক করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। 
প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অপ্রতিমের হাতে থাকা আইফোনটি ছিনিয়ে নিতে তাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল। অপ্রতিমের হাত থেকে আইফোনটি ছিনিয়ে নিতে তুহিনের পরিকল্পনা ছিল পূর্বপরিকল্পিত। পরিকল্পনা অনুযায়ী শুক্রবার তুহিন অপ্রতিমকে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকায় জঙ্গলে নিয়ে যান। হত্যাকাণ্ডে প্রথমে তুহিন, এরপর ফাহাদ পর্যাক্রমে কামরুল অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করে। 
পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ অপ্রতিমের বাবা এম ফিরোজ শাহরিয়ারের জিডি ধরে তদন্ত শুরু করে। তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রেফতার সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), মোজাম্মেল হোসেনের ফাহাদ (১৫) ও মোঃ কামরুল হাসান (১৫) এর সঙ্গে অপ্রতিমের যোগাযোগ ও চলাফেরা ছিল। অপ্রতিম শুধু শুক্রবারই নয়, প্রায়ই মায়ের আইফোন নিয়ে অভিযুক্তদের সঙ্গে ঘুরতে, ছবি তুলতে এবং আড্ডা দিতে বের হতো। এছাড়াও বিভিন্ন গ্রুপে অপ্রতিমের সক্রিয় ভূমিকা থাকার বেশ কিছু আলামত রয়েছে, যেগুলো ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেগুলো আমরা সংগ্রহ করেছি।

যেভাবে উদ্ধার অপ্রতিমের আইফোন:
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে আটকের পর তুহিনের বাসা থেকে আই আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। শনিবার দিবাগত রাতে কোটবাড়ি এলাকার ওই বাসায় অভিযান চালিয়ে আইফোনটি উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান।
তিনি জানান, হত্যাকাণ্ডের পর শনিবার বিকেলে ও সন্ধ্যায় পৃথক অভিযান চালিয়ে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাওয়া তুহিনসহ বাকিদের আটক করা হয় । এরপর ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে তুহিনের স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বাসায় অভিযান চালিয়ে তোষকের নিচ থেকে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে। 
পুলিশ সুপার জানান, প্রাথমিকভাবে আমরা জানতে পেরেছি, ঘটনার দিন (শুক্রবার) বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সালমানপুরের সানন্দা এলাকার চারপাশে পাহাড় ঘেরা নির্জন বনের মধ্যে অপ্রতীমের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতীম বাধা দেয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। এ সময় প্রথমে তুহিন এবং পরবর্তীতে ফাহাদ ও কামরুল বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমকে মাথায় আঘাত করে। একপর্যায়ে অপ্রতীমের মৃত্যু নিশ্চিত হলে তুহিন অপ্রতীমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি নিয়ে নেয় এবং ফাহাদ ও কামরুলসহ ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। মূলত আইফোনটি ছিনিয়ে নিতেই অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে।
















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২