শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩
সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় নির্বাচন জরুরি
ড. বদিউল আলম মজুমদার
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২১ এএম আপডেট: ১৯.০৯.২০২৬ ১২:৪৮ এএম |

 সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় নির্বাচন জরুরি
জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের আশ্বাস আমরা পেয়ে আসছি। নির্বাচন কমিশনও এ লক্ষ্যে তাদের প্রস্তুতির কথা বারবার জানান দিচ্ছে। শোনা যায়, এ বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে সর্বস্তরের স্থানীয় নির্বাচন শুরু হবে। তবে সরকার ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদগুলোয় দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। বর্তমানে তারা ইউনিয়ন পরিষদেও প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া শুরু করেছে। উল্লেখ্য, এসব নিয়োগ বিএনপির ৩১ দফার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ, ৩১ দফায় শুধু মৃত্যুর কারণে কিংবা আদালতের নির্দেশে কোনো ব্যক্তি অপসারিত হলেই প্রশাসক নিয়োগ করার অঙ্গীকার রয়েছে। এ ছাড়া প্রশাসক নিয়োগ আমাদের উচ্চ আদালতের রায়েরও পরিপন্থি। উপজেলা পরিষদ বিলুপ্তির মামলায় বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের নেতৃত্বে আমাদের সুপ্রিম কোর্ট ১৯৯২ সালে বিখ্যাত কুদরত-ই-ইলাহী পনির বনাম বাংলাদেশ মামলার রায়ে স্থানীয় সরকারে প্রশাসক নিয়োগের ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে ছয় মাসের মধ্যে সব স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশনা দেন।
তবে প্রশাসক নিয়োগের ফলে সরকারের দ্রুত নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগ্রহে ভাটা পড়াই স্বাভাবিক এবং এ লক্ষ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকদের, এমনকি স্থানীয় উন্নয়নে সংবিধানবহির্ভূতভাবে ক্রমাগতভাবে অধিকতর ক্ষমতাপ্রাপ্ত (যেমন-উপজেলা পরিষদে পরিদর্শনকক্ষ, স্থানীয় উন্নয়নে তদারকির এখতিয়ার, স্থানীয় উন্নয়নের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ ইত্যাদি) সংসদ সদস্যদের কাছ থেকেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অপ্রকাশ্য বিরোধিতা আসতে পারে। জেলা পরিষদের পরোক্ষ নির্বাচনে, যেখানে নির্বাচকমণ্ডলীর সংখ্যা সীমিত, সেখানে ভোট কেনাবেচা ভয়াবহ আকার ধারণ করে, যা আমাদের স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে কলুষিত করার আরেকটি বড় কারণ। তার ওপরে যেখানে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল, সেখানে আন্তঃদলীয় সহিংসতাও বেসামাল পর্যায়ে পৌঁছায়।
সম্প্রতি ড. আবদুল মঈন খান নতুন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর সংবিধানসম্মতভাবে তিনি প্রতিটি স্থানীয় সরকার স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করেন, যাতে সত্যিকারের প্রতিনিধিরা নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন। আশা করি, তিনি দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করবেন। তবে লক্ষ রাখবেন যেন নির্বাচনে সব আইনকানুন মেনে চলা হয়। বিশেষত, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রণীত এবং ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে পাস করা স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করার বিধানসংবলিত আইনটি যেন পরিপূর্ণভাবে পালন করা হয়। স্মরণ করা যেতে পারে, ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু ২০১৫ সালে আমাদের স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েতমন্ত্রী আনিসুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর আমাদের স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়। তখন বর্তমান লেখক এ সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী হিসেবে আখ্যায়িত করলেও ক্ষমতাসীনরা সম্পূর্ণরূপে তা উপেক্ষা করেন।
দলীয় প্রতীকের ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচনের ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে আমরা হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেছি। এসব নির্বাচনে প্রার্থীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। অতীতে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় অনেক নির্দলীয় ব্যক্তি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে জিতে আসতেন। কিন্তু দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ফলে দলীয় মনোনীত ব্যক্তি ছাড়া সমাজের অন্য নির্দলীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত থাকেন। ফলে আমরা সুজনের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে দেখিয়েছি যে, দলীয় প্রতীক ব্যবহারের কারণে নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের মানে ব্যাপক ধস নামে। নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের মানে ধস নামার আরেকটি কারণ ছিল তথাকথিত মনোনয়ন-বাণিজ্য এবং পেশিশক্তির প্রভাব। এ ছাড়া গত সরকারের আমলে নির্বাচনব্যবস্থা নির্বাসনে চলে যাওয়ার কারণে যারা ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন পেতেন, তারাই নির্বাচিত হতেন। তাই যেকোনো মূল্যে মনোনয়ন পাওয়াই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়, যা আমাদের নির্বাচনব্যবস্থাকে চরমভাবে কলুষিত করে।
প্রসঙ্গত, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে নির্বাচনের নামে সেখানে একপ্রকার ‘যুদ্ধ’ হয় এবং দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় নির্বাচনের ফলে সমাজে বিভাজন ভয়াবহ আকার ধারণ করে, ফলে তাদের আর্থসামাজিক অগ্রগতি ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। দুর্ভাগ্যবশত, সংসদে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন পাস করলেও আমাদের রাজনীতিবিদরা যেন এর মর্মার্থ অনুধাবনে অনাগ্রহী। দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করার উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পূর্ণরূপে দলনিরপেক্ষ করা, এতে কোনোরূপ দলীয় সংশ্লেষ না থাকা। তা সত্ত্বেও জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি-সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইতোমধ্যে তাদের দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করছে। বিএনপিও স্থানীয় নির্বাচনে একক প্রার্থী দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর।
এটি সুস্পষ্ট যে, রাজনীতিবিদরা নির্বাচনে প্রতীক ব্যবহার না করার তাৎপর্য অনুধাবন করতে শুধু অনাগ্রহীই নন, তারা এর নেতিবাচক প্রভাবও উপেক্ষা করছেন। প্রতীক ব্যবহার না করার উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনকে দলনিরপেক্ষ করা, যাতে অপেক্ষাকৃত বেশি প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্য থেকে সবচেয়ে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেন। আর যোগ্য ব্যক্তিরা নির্বাচিত হলেই ক্ষমতাসীন সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে। দল মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব-হানাহানি রোধ করা যাবে, গত সরকারের সময় যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। এ ছাড়া নির্দলীয় নির্বাচন সমাজে বিভাজন রোধ করা সম্ভব হবে, যা ইতোমধ্যে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে আমরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের স্থানীয় সরকারের আইনগুলো মান্ধাতার আমলের এবং এগুলো পশ্চাৎমুখী। এগুলো পারস্পরিকভাবে সাংঘর্ষিকও। উদাহরণস্বরূপ, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদে সরাসরি নির্বাচনের বিধান থাকলেও জেলা পরিষদের নির্বাচন স্বল্প নির্বাচকমণ্ডলী নিয়ে ‘বেসিক ডেমোক্রেসির’ আদলে পরোক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় সরকার আইনের এসব দুর্বলতা দূর করে ২০০৭ সালে একটি আধুনিক, সমন্বিত আইনি কাঠামোর প্রস্তাব করে ড. শওকত আলীর নেতৃত্বে গঠিত ‘স্থানীয় সরকার শক্তিশালী ও গতিশীলকরণ কমিটি’, বর্তমান লেখক যার একজন সদস্য ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার সরকার কমিটির সুপারিশ প্রায় পুরোটাই উপেক্ষা করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রয়াত ড. তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে আরেকটি কমিশন গঠন করা হয়, যা আমাদের আগের সুপারিশকৃত আইনি কাঠামোকে আরও পরিশীলিত করে। উপযুক্ত দুটি কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে আমাদের স্থানীয় সরকারের আইনি কাঠামোকে যুগোপযোগী করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, যার মাধ্যমে একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থা সৃষ্টির পথ সুগম হবে। আশা করি, আমাদের নতুন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী নির্বাচনের আগে এ সুযোগ কাজে লাগাবেন।
লেখক: প্রধান নির্বাহী, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২