
কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় আল বারাকা হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর প্রসূতি পপি আক্তারের (২১) মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগে হাসপাতাল ঘেরাও, ভাংচুর ও বিক্ষোভের ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে হাসপাতালটির বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ‘আল বারাকা হাসপাতাল’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান তাদের তালিকাভুক্ত নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্টরা জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তথ্য গোপন করে থাকলে এভাবে চিকিৎসাসেবা পরিচালনার সুযোগ নেই।নিহত পপি আক্তার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের সাহেবাবাদ গ্রামের মো. মোসলেম উদ্দিনের মেয়ে এবং একই ইউনিয়নের টাকই অহিদ সরকার বাড়ির মো. মোহন মিয়ার স্ত্রী। পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রসবব্যথা উঠলে পপি আক্তারকে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা সদরের আল বারাকা হাসপাতালে (সাবেক ভিশন হাসপাতাল) নেওয়া হয়। সেখানে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর সন্তান প্রসব করানো হয়। ৭ সেপ্টেম্বর পপি ও তাঁর নবজাতক সন্তানকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়। স্বজনদের অভিযোগ, বাড়িতে ফেরার পর থেকেই পপির শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। অস্ত্রোপচারের স্থানের সেলাই কাটার পর তাঁর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরে ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে আবার আল বারাকা হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক সেলাই কেটে দিয়ে গুরুতর কোনো সমস্যা নেই বলে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন বলে দাবি পরিবারের। পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর ভোর সাড়ে ৩টার দিকে পপির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে পুনরায় অস্ত্রোপচার করেন এবং আইসিইউতে চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা না থাকায় তাঁকে কুমিল্লা শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ সেপ্টেম্বর ভোরে পপি আক্তারের মৃত্যু হয়। পপির শারীরিক অবস্থার অবনতিকে কেন্দ্র করে ১৬ সেপ্টেম্বর রাতে আল বারাকা হাসপাতালে ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ব্রাহ্মণপাড়া থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে পপি আক্তারের মরদেহ নিয়ে স্বজন ও এলাকাবাসী আল বারাকা হাসপাতালে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় হাসপাতাল ঘেরাও ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরিবারের অভিযোগ, আল বারাকা হাসপাতালে করা অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসায় গাফিলতির কারণেই পপির শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা দাবি করেছেন। এদিকে প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনায় সাহেবাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম্য আদালতের কক্ষে স্থানীয়ভাবে বৈঠক করে বিষয়টি রফাদফা করে এবং সাড়ে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সমঝোতা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে সাহেবাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, “আইনগতভাবে আমার পরিষদের গ্রাম্য আদালতের পক্ষে এ ধরনের বৈঠক করার সুযোগ নেই। তবে সামাজিক ও মানবিক দিক বিবেচনা করে আমরা বিষয়টি মীমাংসা করেছি।এ বিষয়ে হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল কাফি বলেন, আমাদের হাসপাতালের পক্ষ থেকে কোনো গাফিলতি ছিল না। তবে যেহেতু রোগী মারা গেছে, সেক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনা করে স্থানীয় লোকজন বসে সাড়ে ১২ লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হাসপাতালের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, নামটার জন্য আমি আবেদন করেছি। এখনো অনুমোদন পাইনি। আশা করি কয়েক দিনের মধ্যে পেয়ে যাব। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বিষয়টি তদন্তের জন্য মৌখিকভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের পর আল বারাকা হাসপাতালের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলাম বলেন, বিষয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আমাকে জানিয়েছেন। তাঁরা ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জানা যাবে এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম্য আদালতের মাধ্যমে এ ধরনের চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা আর্থিক সমঝোতা করা যায় কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ইউএনও বলেন, গ্রাম্য আদালতের এখতিয়ার অনুযায়ী এ ধরনের বিষয় মীমাংসা করার সুযোগ নেই। তবে ইউনিয়ন পরিষদে এমন কোনো বৈঠক বা সমঝোতা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আমি এখনো অবগত নই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব। প্রসূতি পপি আক্তারের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং আল বারাকা হাসপাতাল বৈধ অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে কি না এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই জানা যাবে।
