শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩
ব্রাহ্মণপাড়ায় প্রসূতির মৃত্যু
সাড়ে ১২ লাখ টাকায় রফাদফার অভিযোগ
ফারুক আহাম্মদ, ব্রাহ্মণপাড়া
প্রকাশ: শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২১ এএম আপডেট: ১৯.০৯.২০২৬ ১২:৫০ এএম |

ব্রাহ্মণপাড়ায় প্রসূতির মৃত্যুকোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। নেই নিবন্ধিত গাইনি চিকিৎসকও। এর পরও কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আল বারাকা হসপিটালে চলছে চিকিৎসাসেবা ও অস্ত্রোপচার। সেখানে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর এক প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, অভিজ্ঞ গাইনি চিকিৎসকের কথা বলে অস্ত্রোপচার করানো হলেও তা করেছেন নিউরোলজি বিষয়ে অধ্যয়নরত এক চিকিৎসক। পরে ওই প্রসূতির মৃত্যু হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্বজনেরা।
নিহত প্রসূতির নাম মোসা. পপি আক্তার (২১)। তিনি ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার সাহেবাবাদ ইউনিয়নের সাহেবাবাদ গ্রামের মো. মোসলেম উদ্দিনের মেয়ে এবং একই ইউনিয়নের টাকই অহিদ সরকার বাড়ির মো. মোহন মিয়ার স্ত্রী।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে পপির মরদেহ নিয়ে স্বজন ও এলাকাবাসী আল বারাকা হসপিটালের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হাসপাতালটি আগে ‘ভিশন হসপিটাল’ নামে পরিচালিত হতো বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্বজনেরা জানান, গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রসবব্যা উঠলে পপিকে আল বারাকা হসপিটালে নেওয়া হয়। সেখানে অভিজ্ঞ গাইনি চিকিৎসকের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করে সন্তান প্রসব করানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। পরে তাঁর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়। ৭ সেপ্টেম্বর মা ও নবজাতককে হাসপাতাল েেক ছাড়পত্র দেওয়া হয়।
তবে ছাড়পত্র পাওয়ার পর থেকেই পপির শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে বলে পরিবারের সদস্যদের দাবি। ১৫ সেপ্টেম্বর তাঁকে আবার আল বারাকা হসপিটালে নেওয়া হলে অস্ত্রোপচারের স্থানের সেলাই কেটে দেওয়া হয়। তখন কোনো সমস্যা নেই বলে তাঁকে বাড়িতে পাঠানো হয় বলেও স্বজনেরা জানান।
পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর ভোরে পপির অবস্থার আরও অবনতি হলে তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্বজনরে ভাষ্য, সেখানে চিকিৎসকেরা তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক েেখ পুনরায় অস্ত্রোপচার করেন এবং আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে শয্যা না থাকায় তাঁকে কুমিল্লা শহরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার ভোরে তাঁর মৃত্যু হয়।
পরে মরদেহ নিয়ে স্বজনেরা আল বারাকা হসপিটালে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাঁদের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
১২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় মীমাংসার অভিযোগ
নিহতের স্বজনরে অভিযোগ, পপির মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় সাহেবাবা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বৈঠক হয়। সেখানে ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা করা হয়েছে। এরপর স্থানীয়ভাবে পপির মরদেহ দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তাঁরা দাবি করেন।
তবে এ অর্থ লেনদেন বা সমঝোতার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় কোনো লিখিত অভিযোগও থানায় দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
লাইসেন্স ও চিকিৎসক নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয়দের অভিযোগ, আল বারাকা হসপিটালের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে নিয়মিত গাইনি চিকিৎসক না থাকা সত্ত্বেও প্রসূতি রোগীর অস্ত্রোপচার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবায় যুক্ত ডা. আরিফুজ্জামান (শুভ) নিজেকে নিউরোসার্জন হিসেবে পরিচয় দেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। স্বজনদের দাবি, তিনি বর্তমানে নিউরোলজি বিষয়ে অধ্যয়নরত। ফলে তাঁর মাধ্যমে গাইনি রোগীর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করানো হয়ে থাকলে তা চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ও রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
তবে ডা. আরিফুজ্জামানের শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন এবং অস্ত্রোপচারে তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট নথি ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
তদন্ত কমিটি গঠন
ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফারুক হোসেন বলেন, “আল বারাকা হসপিটালে লোকজনের হট্টগোলের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। উভয় পক্ষকে শান্ত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বিষয়টি তদন্তের জন্য মৌখিকভাবে নির্শেনা দেওয়া হয়েছে। নির্শেনা অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তের পর আল বারাকা হসপিটালের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রসূতির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, অস্ত্রোপচারে কারা যুক্ত ছিলেন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের পেশাগত যোগ্যতা ও নিবন্ধন এবং হাসপাতালের বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না-এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তেই স্পষ্ট হওয়ার কথা।













http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২