বৃহস্পতিবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২ আশ্বিন ১৪৩৩
আশির দশকে ফেরার আকুতি আসলে কিসের?
ড. আলা উদ্দিন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৫ এএম আপডেট: ১৭.০৯.২০২৬ ১:৪১ এএম |

 আশির দশকে ফেরার আকুতি আসলে কিসের?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাতায় চোখ রাখলেই আজকাল আশির দশকের ফ্রেমে মোড়ানো নানা স্মৃতি ভেসে ওঠে-বিশেষত চেহারা ও পোশাকে। পুরোনো ক্যাসেট প্লেয়ার, জ্যাকেট, ফ্লেয়ার্ড বেলবটম প্যান্ট কিংবা রোদচশমার সেই রেট্রো স্টাইল-সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আবেদনময় পরিবেশ তৈরি হয়। ভার্চুয়াল জগতের এই লাইক-কমেন্টের ভিড়ে পোশাক ও ফ্যাশনের এই পুনরুজ্জীবন দেখে মনে স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন জাগে, মানুষের এই ব্যাকুলতা কি কেবলই অতীতমুখী এক ফ্যাশন সচেতনতা? নাকি এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে বর্তমান সমাজব্যবস্থা নিয়ে এক গভীর ক্ষোভ, শূন্যতা ও আক্ষেপ?
যদি সত্যি কোনো জাদুকরি উপায়ে সময়ের চাকা উল্টো ঘুরিয়ে আশির দশকে ফিরে যাওয়া যেত, তবে কেমন হতো সেই সময়ের বাংলাদেশ? আজকের এই অতি দ্রুতগতির যান্ত্রিক, আত্মকেন্দ্রিক ও জটিল সময়ের সাপেক্ষে সেই দশকটিকে খতিয়ে দেখলে মনে হয়, সেটি কেবল ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট সময়কাল ছিল না; বরং তা ছিল বাঙালি জীবন ও মানস গঠনের এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও রূপান্তরকামী সময়। ষাটের দশকের উত্তাল জাতীয়তাবাদী আন্দোলন এবং একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে আশির দশককেই বলা চলে শিল্প, সাহিত্য ও মানবিক মূল্যবোধের দ্বিতীয় এক পুনর্জাগরণের কাল।
আশির দশকের কথা বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য ও সর্বস্তরের রাজনৈতিক জোটের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা গণ-আন্দোলনের বীরত্বগাথা। রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষু, সান্ধ্য আইন (কারফিউ) এবং সামরিক শাসনের কঠিন অনুশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাঙালি তখন রাজপথে নেমেছিল। অকুতোভয় তরুণরা বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল গণতন্ত্রের সুরক্ষার জন্য।
১৯৯০-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে স্বৈরাচারের পতন ঘটেছিল এবং মানুষ মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। কিন্তু তিন দশক পর আজকের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, সেই কাঙ্ক্ষিত ও নিখাদ গণতন্ত্র কি আদতে আমরা কখনো পেয়েছি? গণতন্ত্রের বাহারি লেবাস পরে দেশে একের পর এক ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি মেলেনি। আজকের নির্বাচনব্যবস্থা, ভোটাধিকারের সংকট এবং বাকস্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার বাস্তবতায় আশির দশকের সেই আপসহীন প্রতিবাদী চেতনা মানুষের স্মৃতিতে আরও বেশি উজ্জ্বল ও আকাক্সিক্ষত হয়ে ওঠে।
আশির দশকের সঙ্গে আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও বেদনাদায়ক পার্থক্যটি চোখে পড়ে রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে। সে যুগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের উচ্চশিক্ষালয়গুলোর উপাচার্য পদে যাদের নিয়োগ দেওয়া হতো, তাদের আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, মেধা, ব্যক্তিত্ব ও গভীর পাণ্ডিত্য দেখে সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা মাথা নত হয়ে আসত। পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি), বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) কিংবা বাংলা একাডেমির মতো জাতীয় সংস্থাগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও সামাজিকভাবে মান্যগণ্য ব্যক্তিবর্গ। তাদের সিদ্ধান্ত ও ভাবমূর্তিতে এক ধরনের অভিভাবকসুলভ দৃঢ়তা ও প্রশাসনিক সততা প্রকাশ পেত।
আজকের বাস্তবতা ঠিক তার বিপরীত। রাষ্ট্রীয় ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষপদে কাকে এবং কেন বসানো হয়, তা আজ কারও অজানা নয়। মেধা, যোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতার চেয়ে ‘দলীয় আনুগত্য’ এবং ‘তোষামোদ’ যখন নিয়োগের প্রধান ও একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে আজ নগ্ন দলীয়করণের থাবা। মেধার সঠিক মূল্যায়ন না থাকায় এবং চাটুকারিতার জয়জয়কার চলায় সমাজ থেকে প্রকৃত বুদ্ধিজীবী ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের বিলুপ্তি ঘটছে।
সামরিক শাসনের রাজনৈতিক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ সত্ত্বেও আশির দশকে সাহিত্য, নাটক, গান, চলচ্চিত্র ও চিত্রশিল্পে যে সৃজনশীল বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা ছিল অবিশ্বাস্য। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেবল সার্টিফিকেট অর্জনের কারখানা ছিল না; সেগুলো ছিল প্রগতিশীল চিন্তা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। ক্লাসরুমের পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে তরুণদের সেই বৌদ্ধিক প্রজ্ঞা ছড়িয়ে পড়ত টিএসসির চায়ের কাপে, রোদে পোড়া আড্ডায় এবং রাজপথের প্রতিবাদী মিছিলে। নাটক, কবিতা ও জীবনমুখী গান তখন গণমানুষের মনকে জাগ্রত করত। মাদক সেবন ও ধর্ষণ তখন চরম গর্হিত কাজ ছিল। মানুষে মানুষে সম্পর্ক, বিশ্বাস ও পারিবারিক বন্ধন-এসব দিন-রাত ছিল আশির দশকের মূল সুর, যা হারিয়ে গেছে নব্বইয়ের গণজোয়ারের পর তৈরি হওয়া ব্যক্তিকেন্দ্রিক বাস্তবতায়।
শুধু সংস্কৃতির জগতেই নয়, সাধারণ মানুষের কাজের মধ্যেও একটি গভীর নৈতিক দায়িত্ববোধ দৃশ্যমান ছিল। তখন একটি রাস্তা, সাঁকো বা ইমারত নির্মাণের কাজ আজকের মতো প্রথম বর্ষার সামান্য বৃষ্টিতেই ধুয়ে-মুছে যেত না। ঠিকাদার থেকে শুরু করে প্রকৌশলী-সবার মধ্যেই কোনো না কোনো স্তরে কাজের মান ও দায়বদ্ধতা কাজ করত। মানুষের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ক, প্রতিবেশীসুলভ আন্তরিকতা, বন্ধুত্বের গভীরতা, নিষ্কলুষ প্রেম এবং পারিবারিক বন্ধন ছিল সে সময়ের মূল চালিকাশক্তি। আজকের বিষণ্ন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যখন মানুষ সেই নিভে যাওয়া জীবনবোধ, বিশ্বস্ত সম্পর্ক এবং নৈতিক সততা ফিরে পেতে চায়, তখন অনেকেই এর দায় চাপান আধুনিক প্রযুক্তির ওপর। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল কি প্রযুক্তি বা হাতের স্মার্টফোনটি কেড়ে নিয়েছে আমাদের সেই সোনালি মূল্যবোধ? উত্তর হলো-না। প্রযুক্তি তো কেবল একটি মাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোতেও প্রযুক্তির অভাবনীয় বিপ্লব ঘটেছে; কিন্তু সেখানে সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয় এভাবে রাষ্ট্রীয় জীবনের সামগ্রিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দেয়নি।
সমস্যাটি প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নয়, সমস্যা হলো আমাদের মনস্তাত্ত্বিক পচন ও চরম ব্যক্তিস্বার্থ। বাংলাদেশ যেন প্রযুক্তির ইতিবাচক ও জ্ঞানভিত্তিক ব্যবহারের চেয়ে এর নেতিবাচক ও সস্তা দিকগুলোই সবচেয়ে বেশি আপন করে নিয়েছে। দলকানা রাজনীতি ও অন্যায় আনুগত্য মানুষের ন্যূনতম বিবেক ও নীতিবোধকে গিলে খেয়েছে। নৈতিকতা আজ অবহেলিত; আর অন্যায়কে কৌশলে মেনে নেওয়াই হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার নতুন সামাজিক কৌশল।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ দৃশ্যমান অবকাঠামোগত দিক থেকে সামনের দিকে এগোলেও মানসিক, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিচারে ক্রমশ পেছনের দিকে হেঁটে চলেছে। বহুতল ভবন, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে বা মেগা প্রজেক্ট আমাদের বাহ্যিক আধুনিকতার একটি চাকচিক্যময় রূপ তৈরি করেছে ঠিকই, কিন্তু সমাজের আত্মিক উন্নতি ঘটেছে শূন্যের কোঠায়।
রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যখন দুর্নীতি, অর্থপাচার ও সুবিধাবাদ বাসা বাঁধে, তখন ভবিষ্যতের পথচলা নিয়ে শঙ্কিত হওয়া অনিবার্য। আমাদের তরুণ প্রজন্মের সামনে আজ কোনো সর্বজনগ্রাহ্য নীতিবান আদর্শ বা দিকনির্দেশক অভিভাবক নেই। এক অনিশ্চিত ও লক্ষ্যহীন অন্ধ দৌড়ে তারা শামিল হয়েছে, যেখানে মেধার চেয়ে তদবির এবং নীতিবোধের চেয়ে স্বজনপ্রীতি বেশি কার্যকর। সমাজ ও রাজনীতিতে আশির দশকের সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও, আমাদের গতি হয়েছে উল্টো।
এমতাবস্থায়, আশির দশকে ফিরে যাওয়ার এই আকুতি মোটেও নিছক কোনো অতীতমুখিতা, রোমান্টিকতা বা অনর্থক সেন্টিমেন্ট নয়। এটি বর্তমানের এই যান্ত্রিক, স্বার্থপর, হীনম্মন্য ও নীতিহীন বাস্তবতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের এক নীরব মনস্তাত্ত্বিক প্রতিবাদ। চারপাশের গুমোট ও দমবন্ধ পরিবেশে মানুষ যখন হাঁপিয়ে ওঠে, তখন সে অতীতে গিয়ে একটু স্বস্তির অক্সিজেন খোঁজে।
আমরা সময়ের চাকা পেছনে ঘুরিয়ে আশির দশকে পুরোপুরি ফিরে যেতে পারব না-সেটি সম্ভবও নয়। কিন্তু সেই দশকের মানুষের মাঝে যে সামাজিক সততা, শিল্প-সাহিত্যের প্রতি ব্যাকুলতা, মুক্তচিন্তার স্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং সামষ্টিক কল্যাণের স্পৃহা ছিল, সেগুলোর পুনর্জাগরণ ঘটানো অসম্ভব কিছু নয়। একটি মানবিক ও সুশীল সমাজ টিকিয়ে রাখতে হলে আমাদের আজ এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়াতেই হবে। বাহ্যিক উন্নতির এই কৃত্রিম বেলুন দিয়ে ভেতরের অসাড়তাকে বেশিদিন ঢেকে রাখা যাবে না; নীতি ও মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ না ঘটলে উন্নয়নের এই চাকচিক্য একদিন হঠাৎ করেই ধসে পড়বে এবং আমাদের সামনে কেবল এক গভীর শূন্যতা অবশিষ্ট থাকবে।
লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়












http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২