কুবি সংবাদদাতা: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অ্যাকাডেমিক অবস্থান শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন পিএইচডিধারী শিক্ষকবৃন্দ। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) ২৮৬ জন শিক্ষকের মধ্যে বর্তমানে পিএইচডিধারী শিক্ষক রয়েছেন মোট ৯৩ জন, যা মোট শিক্ষকের ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৬৮ শতাংশ শিক্ষকই ডিগ্রিবিহীন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৯৩ জন শিক্ষকের মধ্যে গণিত বিভাগে রয়েছেন সর্বোচ্চ ১০ জন পিএইচডিধারী শিক্ষক, বাংলা বিভাগে ৯ জন, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, লোক প্রশাসন ও (এআইএস) বিভাগে ৮ জন করে এবং অর্থনীতি ও ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজে ৭ জন করে পিএইচডিধারী শিক্ষক রয়েছেন। মার্কেটিংয়ে ৬ জন, ইংরেজিতে ৪ জন, পরিসংখ্যান এবং ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংয়ে রয়েছেন ৩ জন করে।
এ ছাড়া ফার্মেসি, প্রত্নতত্ত্ব ও কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগে ২ জন করে এবং গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা (এমসিজে) ও নৃবিজ্ঞান বিভাগে রয়েছেন একজন করে পিএইচডিধারী শিক্ষক। পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক সংখ্যায় শূন্য রয়েছে আইন বিভাগে।
পিএইচডিধারী শিক্ষকের ঘাটতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিক্ষার্থীদের গবেষণার কাজেও। থিসিসের বিষয় নির্বাচন, গবেষণা পদ্ধতি নির্ধারণ, তথ্য বিশ্লেষণ ও গবেষণাপত্র তৈরির বিভিন্ন ধাপে প্রয়োজন পড়ে অভিজ্ঞ গবেষক শিক্ষকের অ্যাকাডেমিক দিকনির্দেশনা। কিন্তু পিএইচডিধারী শিক্ষক কম থাকায় এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই অভিজ্ঞতা এবং মানসম্পন্ন নির্দেশনামূলক সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে জানায় শিক্ষার্থীরা।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী রকিব আহম্মেদ বলেন, পর্যাপ্তসংখ্যক পিএইচডিধারী শিক্ষক না থাকায় গবেষণার সময় শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। বিশেষ করে গবেষণার বিষয় নির্বাচন, মেথড ঠিক করা এবং ডেটা অ্যানালাইসিসের ক্ষেত্রে অনেক সময় পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় না। পর্যাপ্ত পিএইচডিধারী শিক্ষক থাকলে গবেষণার কাজ আরও সহজ ও মানসম্মত হতো বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে শিক্ষকদের গবেষণার অভিজ্ঞতা অ্যাকাডেমিক পাঠদানেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে তাঁর মত।
শুধু থিসিস তত্ত্বাবধান নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্র প্রকাশ, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা, গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও পিএইচডিধারী ও গবেষণায় সক্রিয় শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে শিক্ষার্থীরা। ফলে উচ্চতর গবেষণা ডিগ্রিধারী শিক্ষকের সংখ্যা কম থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক গবেষণা সক্ষমতা বাড়ানোর পথও কঠিন হয়ে পড়ে।
আইসিটি বিভাগের শিক্ষার্থী ফরহাদ হোসেন বলেন, পিএইচডিধারী শিক্ষকরা তাঁদের বিশেষায়িত জ্ঞান ও গবেষণার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও গবেষণায় কার্যকর দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও গবেষণার মানোন্নয়নে তাই পিএইচডিধারী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান বৃদ্ধিতে শিক্ষকদের পিএইচডি ডিগ্রি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পিএইচডির মাধ্যমে শিক্ষকরা নিজ বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা অর্জন করেন। পিএইচডিধারী শিক্ষকের ঘাটতি থাকলে গবেষণার পরিধি ও মান এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণার সুযোগে প্রভাব পড়তে পারে।”
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম মূলত টিচিং, লার্নিং, রিসার্চ ও কমিউনিটি এনরিচমেন্ট-এই চারটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষকরা গবেষণা না করলে শিক্ষার্থীরাও গবেষণায় আগ্রহী হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো পিএইচডিধারী শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। পিএইচডি ছাড়া কোনো শিক্ষককে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর বা প্রফেসর পদে উন্নীত না করার নীতিকে তিনি সমর্থন করেন। একই সঙ্গে পিএইচডি সম্পন্ন করতে শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সময়, অর্থ, গবেষণার পরিবেশ, গ্রন্থাগার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
এছাড়া পিএইচডিধারী শিক্ষকদের গবেষণাভিত্তিক বিশেষায়িত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা পাঠদানের মান উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে মনে করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. বেলাল হোসেন।
তিনি জানান, পিএইচডি সম্পন্ন শিক্ষকরা নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার মাধ্যমে গভীর ও বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জন করেন। ফলে তাঁদের গবেষণার অভিজ্ঞতা ও বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা একদিকে যেমন অ্যাকাডেমিক পাঠদানের মান বাড়ায়, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের গবেষণায় সম্পৃক্ত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আইন বিভাগে কোনো পিএইচডিধারী শিক্ষক না থাকায় সংকটটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। আইন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহকারী অধ্যাপক সাদিয়া তাবাসসুম বলেন, বর্তমানে আইন বিভাগে পিএইচডিধারী কোনো শিক্ষক নেই। তবে বিভাগের চারজন শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন পিএইচডি করছেন। তাঁরা ফিরে এলে সংকট কিছুটা কমবে। তবে পিএইচডি সম্পন্ন করে তাঁদের ফিরতে কমপক্ষে তিন বছর সময় লাগতে পারে।
তিনি আরও বলেন, পিএইচডি করতে শিক্ষকদের আগ্রহ থাকলেও শিক্ষকসংকট ও অ্যাকাডেমিক দায়িত্বের চাপ অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। একজন শিক্ষককে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা, বিভাগীয় প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং একাধিক কোর্স পরিচালনা করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির সুযোগ পাওয়া কিংবা স্কলারশিপ অর্জনের পরও অনেক শিক্ষককে নানা বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
এদিকে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৪ জন শিক্ষক উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই পিএইচডি করছেন। বিভাগভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সিএসইতে ৯ জন, পরিসংখ্যান ও পদার্থবিজ্ঞানে ৮ জন করে এবং রসায়ন, ফার্মেসি ও নৃবিজ্ঞানে ৭ জন করে শিক্ষক শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন। গণিতে ৬ জন এবং ইংরেজি, এমসিজে, এআইএস ও আইন বিভাগে ৪ জন করে শিক্ষক রয়েছেন শিক্ষাছুটিতে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, বর্তমানে সংকট থাকলেও অনেক শিক্ষক পিএইচডির জন্য ছুটিতে রয়েছেন। তারা ডিগ্রি সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরলে অচিরেই সেই সংকটের কিছুটা লাঘব হবে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষাছুটিতে থাকা শিক্ষকরা পিএইচডি সম্পন্ন করে ফিরলে সংকট কিছুটা কমবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে পিএইচডির সুযোগ বাড়ানো, গবেষণা অনুদান ও উচ্চশিক্ষায় সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভাগভিত্তিক গবেষণার পরিবেশ শক্তিশালী করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পিএইচডিধারী শিক্ষকদের গবেষণায় সক্রিয় রাখাও জরুরি।
এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়ন ও আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো অবস্থানের জন্য শিক্ষকদের পিএইচডি থাকা জরুরি। আমরা শিক্ষকদের পিএইচডি সম্পন্ন করতে উৎসাহিত করি। বর্তমানে ৯৩ জন শিক্ষক পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন এবং ৮৪ জন শিক্ষক উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষাছুটিতে রয়েছেন। তাঁদের অনেকেই পিএইচডি করছেন। তাঁরা পিএইচডি সম্পন্ন করে ফিরে এলে বর্তমান সংকট অনেকটাই কেটে যাবে বলে আশা করছি।”
