কেউ
মানুষের পাশে দাঁড়ান ছবি তুলে, কেউ করেন প্রচারের আলোয়। আবার কেউ আছেন,
মানুষের কষ্ট দেখলে নীরবে এগিয়ে যান—কোনো প্রচারের প্রত্যাশা ছাড়াই। নিজের
সামর্থ্য দিয়ে মানুষের পথ সহজ করেন, শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করেন,
মসজিদ-মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দান করেন। বর্ষায় কাদায় আটকে পড়া
মানুষের দুর্ভোগ দেখলে নিজের অর্থে রাস্তায় ইট-খোয়া ফেলেও দেন।
এমনই এক
নীরব মানবিক মানুষ গোলাম সারওয়ার। কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার মোকাম
ইউনিয়নের নিমসার শিকারপুর গ্রামের এই শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক দীর্ঘদিন ধরে
মানুষের কল্যাণে কাজ করে আসছেন। তাঁর এই পথচলার পেছনে রয়েছে তাঁর বাবা,
সারা দেশে পরিচিত শিক্ষানুরাগী ও দানশীল সমাজসেবক হাজী জুনাব আলী-এর আদর্শ।
বাবা
মানুষের জন্য যে পথ তৈরি করে গেছেন, সেই পথেই যেন আজ হাঁটছেন ছেলে। বাবার
হাতে গড়ে ওঠা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন থেকে শুরু করে এলাকার ভাঙা
রাস্তা, মসজিদ-মাদ্রাসা, অসহায় মানুষের চিকিৎসা—সবখানেই নিজের সামর্থ্য
অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন গোলাম সারওয়ার।
কুমিল্লার বুড়িচং
উপজেলার ঐতিহ্যবাহী জনপদ নিমসার। একসময় এই অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার
স্বপ্ন দেখেছিলেন হাজী জুনাব আলী। সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ নিমসার জুনাব
আলী ডিগ্রি কলেজ। ১৯৭২ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি আজও
এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান।
বাবার রেখে
যাওয়া সেই শিক্ষা-আদর্শকে ধারণ করে কলেজটির উন্নয়নে এগিয়ে আসেন গোলাম
সারওয়ার। তাঁর উদ্যোগে কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সংস্কার ও বিভিন্ন
শিক্ষাবিষয় চালুর ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা হয়। নির্মাণ করা হয় কলেজের
দৃষ্টিনন্দন তোরণ।
বর্ষা এলেই গ্রামের অনেক রাস্তা পরিণত হয় কাদার
সাগরে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও ভাঙা রাস্তা। স্কুলগামী শিশু, বৃদ্ধ,
অসুস্থ রোগী কিংবা কৃষকের জন্য তখন কয়েকশ গজ পথও হয়ে ওঠে দুর্ভোগের।
এমন
দৃশ্য চোখে পড়লে অপেক্ষা করেন না গোলাম সারওয়ার। নিজের অর্থে ইট, খোয়া,
বালু ও মাটি ফেলে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কারের উদ্যোগ নেন।
নিমসার,
শিকারপুর, ঝলম, পাচকিত্তা, মনিপুর, কাবিলা, বাড়াইল, চানসার, চানগাছা,
আবিদপুর, মিথলমা, মোকাম, কেদারপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত
সড়কে তাঁর অর্থায়নে সংস্কারকাজ করার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কোথাও
কাঁচা রাস্তা সংস্কার, কোথাও পাকা সড়কের ভাঙা অংশ মেরামত, আবার কোথাও
কর্দমাক্ত রাস্তায় ইট-খোয়া ফেলে মানুষের চলাচলের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ
নিয়েছেন তিনি।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঐতিহ্য বাহী নিমসারে তাঁর
মায়ের নামে তাহেরা জুনাব আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে আধুনিক অডিটোরিয়াম নির্মাণ,
শিকারপুরে জিলানীয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রাবাস নির্মাণ, শিকারপুর গোলাম
সারওয়ার হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা, মা আমেনা জুনাব আলী দারুল আকাম
মাদ্রাসার ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তিনি অর্থ ও জমি দিয়ে
সহযোগিতা করেছেন।
মা আমেনা জুনাব আলী দারুল আকাম মাদ্রাসার জন্য ১৮ শতক
জমিতে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৫ জন শিক্ষার্থীর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা
করা হয়েছে বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এছাড়া কাবিলা গ্রামে মসজিদ
নির্মাণ, শিকারপুর মুন্সী বাড়ি জামে মসজিদে সহযোগিতা, শিকারপুর নূরে
মোহাম্মদীয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসায় জমি দান, কাবিলা জুনাব আলী সরকারি প্রাথমিক
বিদ্যালয়ে অর্থ সহায়তা এবং কাবিলা ভূমি অফিস ও সড়কের জন্য জমি দেওয়ার কথাও
জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কুমিল্লার বাইরেও তাঁর সহযোগিতার হাত পৌঁছেছে।
কক্সবাজারের চকরিয়া ডুলাহাজরায় মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণে সহায়তা এবং তিন
শতাধিক শিক্ষার্থীকে সহযোগিতা করেছেন বলে জানা গেছে। কুমিল্লার কোটবাড়ীতে
মরকাজুল কোরআন শিক্ষায় কওমি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
শিকারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য ৪৮ শতক জমি দানের কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
গোলাম সারওয়ারের কাছে সমাজসেবা যেন কোনো পদ-পদবি বা পরিচয়ের বিষয় নয়। মানুষের কষ্ট দেখলে পাশে দাঁড়ানোই তাঁর কাছে বড় কথা।
দরিদ্র
ও অসহায় মানুষের মাঝে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে
সহযোগিতা এবং ওষুধ দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নিজের এসব
কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গোলাম সারওয়ার বলেন, “সমাজ ও মানুষের জন্য কিছু করতে
পারলে আমার ভালো লাগে। মানুষের জন্য কিছু করতে পারাটা আমার কাছে এক ধরনের
স্বস্তি। এর বাইরে আমার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই।”
বাবার আদর্শের কথা বলতে
গিয়ে তিনি বলেন, “আমার বাবা হাজী জুনাব আলীর দেখানো পথ ও তাঁর শিক্ষা আমাকে
সমাজসেবায় অনুপ্রাণিত করেছে। মানুষের জন্য কিছু করতে পারাটা আমার জন্যই
আনন্দের।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জন্য কাজ করলেও গোলাম
সারওয়ার কখনো নিজের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রচারে আসতে চাননি। কোনো সড়ক সংস্কার
করেছেন, কোনো প্রতিষ্ঠানে দান করেছেন কিংবা কোনো অসহায় পরিবারকে সহযোগিতা
করেছেন-এসব নিয়ে প্রচারের আগ্রহ তাঁর নেই।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি বলেন,
“যেখানে মানুষের চলাচলের রাস্তা নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে, সেখানে তিনি নিজের
টাকা দিয়ে রাস্তা ঠিক করেন। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হলে সহযোগিতা
করেন। অসহায় মানুষ বিপদে পড়লে পাশে দাঁড়ান। তিনি প্রচার চান না-মানুষের
উপকার করাটাই তাঁর কাছে বড়।”
তাঁদের মতে, সরকারি উদ্যোগে কোনো রাস্তা বা
অবকাঠামো নির্মাণের পর তা নষ্ট হয়ে গেলে সংস্কারে সময় লাগতে পারে। কিন্তু
মানুষের দুর্ভোগ দেখে গোলাম সারওয়ার অনেক সময় নিজ অর্থেই এগিয়ে আসেন। ফলে
তাঁর এসব উদ্যোগে সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
হাজী জুনাব আলী
হয়তো বহু বছর আগে নিমসারে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষার যে বীজ বপন
করেছিলেন, সময়ের পরিক্রমায় সেই বীজ আজ অনেকটা ছায়াবৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর
সেই বৃক্ষের ছায়া আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছেন তাঁর ছেলে গোলাম সারওয়ার।
একটি
রাস্তা হয়তো তাঁর কাছে শুধু ইট-খোয়ার রাস্তা নয়—সেটি একজন কৃষকের মাঠে
যাওয়ার পথ, একজন রোগীর হাসপাতালে যাওয়ার পথ, একটি শিশুর স্কুলে যাওয়ার পথ
কিংবা কোনো মায়ের সন্তানের কাছে নিরাপদে ফিরে আসার পথ।
একটি মাদ্রাসা বা বিদ্যালয়ে তাঁর দেওয়া অর্থ হয়তো শুধু একটি ভবন তৈরি করে না—তার সঙ্গে তৈরি হয় কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন দেখার সুযোগ।
রাজনীতি
কিংবা পদ-পদবির প্রত্যাশা নয়, মানুষের জন্য কাজ করেই যে মানুষের হৃদয়ে
জায়গা করে নেওয়া যায়—নিমসারের গোলাম সারওয়ার যেন তারই এক নীরব উদাহরণ।
এলাকাবাসীর
অনেকের প্রত্যাশা, দল-মতের ঊর্ধ্বে থেকে তাঁর মতো মানুষেরা যদি জনসেবার
আরও বড় পরিসরে উপজেলা পরিষদের কিংবা ইউনিয়নে আসেন, তাহলে সাধারণ মানুষের
কল্যাণে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য আরও বেশি কাজে লাগতে পারে।
