
স্কুল এবং কলেজের গণ্ডি সফলতার সঙ্গে পার করলেও কর্মে যাওয়ার আগেই ঝরে পড়ার প্রবণতা চোখে পড়ার মতো। গত এক দশক ধরে জিপিএ ও পাসের হারের দিক থেকে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা এগিয়ে। এক দশকে এসএসসিতে মেয়েদের পাসের হার ছেলেদের চেয়ে ৮ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া কোটা বাতিল হওয়ায় বিসিএসসহ সব চাকরিতে ছেলেদের চেয়ে তারা যোজন দূরে। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন, ব্যাংক খাত, প্রকৌশল এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তাদের অংশগ্রহণের হার তলানিতে।
তবে গবেষণা বলছে, মেয়েদের পিছিয়ে যাওয়ার জন্য প্রধান দায়ী ‘এডুকেশন-এমপ্লয়মেন্ট প্যারাডক্স’ (শিক্ষা-কর্মসংস্থান বৈপরিত্য)। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ক্লডিয়া গোল্ডিনের গবেষণায় অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ট (ইউ) আকৃতির পরিবর্তন দেখানো হয়েছে। অর্থনৈতিক কাঠামো, কাজের ধরন, পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক রীতিনীতির পরিবর্তন এ প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্কিত। গবেষণায় বলা হয়, একটি দেশ যখন নিম্নআয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দিকে যায়, তখন পুরুষের আয় বাড়ে। মধ্যম শিক্ষিত মেয়েরা পারিবারিক স্বচ্ছলতা এবং সামাজিক সম্মানের কথা চিন্তা করে চাকরি না করে স্বেচ্ছায় বা পারিবারিক চাপে ঘরে ফিরে যান। দেশ যখন উন্নত হয় এবং নারীরা উচ্চশিক্ষার শীর্ষে পৌঁছায়, কেবল তখনই এই প্যারাডক্স ভেঙে তারা আবার দলে দলে কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসেন। এ কারণে বাংলাদেশে পরীক্ষায় ভালো করেও কর্মক্ষেত্রে পিছিয়ে মেয়েরা।
আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সী নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮ দশমিক ৬ শতাংশ, পুরুষদের ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ এই প্যারাডক্সে আটকে গেছে।
বিবিএসের রিপোর্টে বলা হয়েছে, একই শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষিত পুরুষদের যেখানে ৪৭.১৩ শতাংশ আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যুক্ত, নারীদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ২৯.৮৮ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত রিপোর্টে ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক মধ্যম ও উচ্চ পরিচালনামূলক পদের মাত্র ৭.২২ শতাংশ নারীদের দখলে। ২০২৩ সালে এটি ৮.৭৩ শতাংশ ছিল। ফলে শীর্ষ পদে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ছে না, বরং কমছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শুধু ভালো পরিবারে বা বিত্তবান ছেলের সঙ্গে বিয়ের লক্ষ্যেই মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করছে। ফলে অর্থনৈতিকভাবে মেয়েদের স্বাবলম্বী করার চিন্তা করা হচ্ছে না। এর সঙ্গে সামাজিক, পারিবারিক ও সংসার জীবনের বাধা কর্মক্ষেত্রে তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশে ২২ থেকে ২৭ বছর বয়স সাধারণত উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরিতে প্রবেশের মূল সময়। এই সময়টাতেই নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ করে গ্রামীণ এবং মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের বিয়ের জন্য অতিরিক্ত সামাজিক ও পারিবারিক চাপ সৃষ্টি হয়। শহরাঞ্চলে এবং সচেতন পরিবারগুলোতে মেয়েরা অনেকটাই ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে এ সংখ্যা অনেকটাই নগণ্য।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ বলেন, মাদকের আসক্তি ও ডিজিটাল ডিভাইসের অতি ব্যবহার পাবলিক পরীক্ষায় ছেলেদের পিছিয়ে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা ভালো করছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শেষ হওয়ার পর তারা চাকরির প্রতিযোগিতায় ভালো করতে পারছে না। এর জন্য সামাজিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে দায়ী করেন তিনি।
শিক্ষায় এগিয়ে থাকলেও কর্মক্ষেত্রে নারীরা অনেক পিছিয়ে। এ অবস্থার জন্য সনাতন দৃষ্টিভঙ্গি ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ দায়ী। পারিবারিক ও সামাজিক চাপে পড়ে অনেক নারী কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ পান না। আবার অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয় গণ্ডি পেরিয়ে গেলেও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অনেক ক্ষেত্রে চাকরিদাতাদের অনাগ্রহও লক্ষ করা যায়। আবার কেউ কেউ কর্মের সুযোগ পেলেও সন্তান লালন-পালনের কারণে তা ছাড়তে বাধ্য হন। এজন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উন্নতমানের ডে কেয়ার সেন্টার চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। সর্বোপরি, নারীদের সামাজিক অধিকার নিশ্চিত হওয়া জরুরি। আশা করছি, সরকার নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে আশানুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
