
টেক্সটাইল খাত দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এ খাত ১৩ শতাংশ অবদান রাখছে। তিন দশক ধরে দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগে এ খাতটি গড়ে উঠেছে। কিন্তু বেশ কিছু কারণে এখন তার জৌলুশ হারিয়েছে। এখন তারা টিকে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে। সম্ভাবনাময় টেক্সটাইল খাতটির উৎপাদন ব্যয়, নীতিগত দুর্বলতা এবং বৈষম্যমূলক প্রতিযোগিতার চাপে সংকটে রয়েছে। টেক্সটাইল খাতটি তৈরি পোশাকশিল্পের মূল ভিত্তি। এ খাত দুর্বল হলে পুরো অর্থনীতি থমকে যাবে। গত মাসে দেশে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাসসংকট শুরু হলে অন্য খাতের মতো টেক্সটাইল খাতেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদীসহ অনেক এলাকায় বহু কারখানা বন্ধ হয়েছে। রপ্তানিতেও এর প্রভাব পড়েছে। বিটিএমইএ কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে চলমান সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বৈঠক করেছে। গত এক বছরে ভারত থেকে সুতা আমদানি প্রায় ৪৮ শতাংশ বেড়ে যাওয়াকে দেশি শিল্পের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। চলমান সংকট মোকাবিলায় বিটিএমএর সদস্যরা ইতোমধ্যে বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছেন।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল মেটানোর পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন দিতে গিয়ে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল বা চলতি মূলধন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ফলে এরই মধ্যে বিটিএমএর ১৫০টির মতো মিল বন্ধ হয়েছে। আগামীতে এ সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। যেখানে ব্যবসায়ীদের মূল লক্ষ্য ছিল নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা, সেখানে এখন বিদ্যমান চাকরিগুলো টিকিয়ে রাখাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘অর্থনীতির লাইফলাইন’ কারখানায় এখন চলছে তীব্র সংকট। একই সময়ে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি প্রায় ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমেছে। যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৬৫ কোটি মার্কিন ডলার। গ্যাসসংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর পক্ষ থেকে নতুন কাজের অর্ডার বা ক্রয়াদেশ কমে গেছে। ব্যাংকঋণের চড়া সুদ এবং ঋণ পরিশোধের চাপে ছোট ও মাঝারি মানের টেক্সটাইল কারখানাগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে। তাই এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা গ্যাস-বিদ্যুৎসংকট, জ্বালানির উচ্চমূল্য, ব্যাংকঋণের সুদ বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা জটিলতায় দেশের টেক্সটাইল ও পোশাক খাত আজ অস্তিত্বসংকটের মুখে পড়েছে। এর ফলে উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বহু কারখানা বন্ধ এবং কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছেন।
টেক্সটাইলশিল্পকে রক্ষায় সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বহু কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি স্তব্ধ হয়েছে। এমনকি নির্ধারিত সময়ে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বিপুল বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান যাতে ঠিক থাকে, সে বিষয়ে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। তবে বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে সবার আগে প্রয়োজন নিরবছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ ব্যাপারে সরকারের সঠিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপই পারে দেশের টেক্সটাইলশিল্পকে বাঁচাতে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
