ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়
একটি মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন এক রোগীকে পিটিয়ে
হত্যার অভিযোগ ওঠার পর সেখানে চিকিৎসাধীন প্রায় ৪০ জন একসঙ্গে পালিয়ে গেছে
বলে খবর পাওয়া গেছে।
গত বুধবার দুপুরে শহরের ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড
সংলগ্ন ‘প্রয়াস মাদক নির্ভরশীলতার চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে’ এ ঘটনা
ঘটে স্থানীয় লোকজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় এলাকায়
চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এক রোগীর মৃত্যুর
ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় লোকজন সেখানে ভাঙচুর চালায়। পরে চিকিৎসাধীন
রোগীরা কেন্দ্র থেকে পালিয়ে যান।
নিহত ২৯ বছর বয়সী মো. ফোরকান নবীনগর উপজেলার নাটঘর ইউনিয়নের কুড়িঘর গ্রামের মো. রশিদ মিয়ার ছেলে।
প্রয়াসের
লোকজন চিকিৎসা না দিয়ে ফোরকানকে নির্যাতন ও মারধর করে হত্যা করেছে বলে
অভিযোগ করেছেন তার ভগ্নিপতি ইমন হোসেন। আর প্রয়াসের পরিচালক প্রমোদ বর্মণ
বলছেন, “নিহতের পরিবার মিথ্যা অভিযোগ তুলেছে।”
স্থানীয় লোকজন ও
প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলা শহরের ফুলবাড়িয়া
বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকায় একটি ভবনের তৃতীয় তলায় প্রয়াস মাদক
নির্ভরশীলতার চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে অবস্থিত। জেলা শহরের
কান্দিপাড়ার বাসিন্দা রুবেল হক ও নরসিংদীর প্রমোদ বর্মনসহ ৮-১০ জন পরিচালক
মিলে এটি পরিচালনা করেন।
গত মঙ্গলবার রাতে এই কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন
ফোরকান নামের এক তরুণের মৃত্যু হয়। কেন্দ্রের পরিচালক ও কর্মচারীদের
নির্যাতন ও মারধরে তার মৃত্যু হয়েছে-এমন তথ্য অন্য রোগীদের মধ্যে ছড়িয়ে
পড়লে সেখানে আতঙ্ক দেখা দেয়।
চিকিৎসাধীন রোগীরা নিজেদের নিরাপত্তার কথা
চিন্তা করে বুধবার দুপুরে কেন্দ্র থেকে পালানোর সিদ্ধান্ত নেন। একপর্যায়ে
তারা ঝুঁকি নিয়ে কেন্দ্রের জানালা ভেঙে পাশের একটি ভবনের ছাদে লাফিয়ে পড়েন।
পরে সেখান থেকে দ্রুত পালিয়ে যান।
নিহতের ফোরকানের ভগ্নিপতি ইমন হোসেন
বলেন, ফোরকার কাতারপ্রবাসী ছিলেন। গত ছয় মাস আগে তিনি ছুটিতে দেশে আসেন।
ফেরার দুমাস পরই তিনি মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন।
তার ভাষ্য, “শ্যালককে সুস্থ
করে তুলতে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পাঁচ দিন পর ফিরল
তার লাশ। প্রয়াসের লোকজন চিকিৎসা না দিয়ে তাকে নির্যাতন ও মারধর করে হত্যা
করেছে।
“মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রয়াসের লোকজন আমার শ্যালককে হাসপাতালে নিয়ে
যায়। সেখানে চিকিৎসক ইসিজিসহ অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত
ঘোষণা করেন। পরে তারা লাশ অ্যাম্বুলেন্সে রেখে আমাকে কার্যালয়ে যেতে বলে।
এরপর ৯৯৯-এ ফোন করে লাশ উদ্ধার করা হয়।”
সদর থানার এসআই সঞ্জীব কুমার পাল বলেছেন, “ফোরকানের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।”
মাদক
নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক প্রমোদ বর্মণ বলছেন, “ফোরকান অসুস্থ হয়ে পড়লে
আমরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। পরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু
বিষয়টিকে নিহতের পরিবার মিথ্যা অভিযোগ তুলেছেন।”
রোগী পালিয়ে যাওয়ার
বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “স্থানীয় লোকজন আমাদের মাদক নিরাময় কেন্দ্রে
ভাঙচুর চালায়। সে সময় সেখানে চিকিৎসাধীন ৪০ জন রোগী পালিয়ে যায়। বর্তমানে
মাদক নিরাময় কেন্দ্রে কোনো রোগী ভর্তি নেই।”
এর আগে ২০১৪ সালের ৯ অগাস্ট
দুপুরে প্রয়াস নামের এই মাদক নিরাময় কেন্দ্রের লোকজনের বিরুদ্ধে জেলা
শহরের কান্দিপাড়ার আতিকুল ইসলাম ওরফে শাকিল (৩০) নামের এক যুবককে হত্যার পর
তার লাশ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের বারান্দায় রেখে পালিয়ে যাওয়ার
অভিযোগ উঠেছিল।
ওই ঘটনা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে প্রয়াসের পরিচালক প্রমোদ বর্মণ বলেন, “সে সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না, বিষয়টি জানি না।”
মাদকদ্রব্য
নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক সাজেদুল হাসান বলেন, জেলায় অনুমোদিত ছয়টি
মাদক নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে। এর একটি ‘প্রয়াস’। এসব কেন্দ্রে খণ্ডকালীন
চিকিৎসক ও স্থায়ী নার্স থাকেন। অধিদপ্তর থেকে প্রতি মাসেই কেন্দ্রগুলো
পরিদর্শন করা হয়।
“যেহেতু অভিযোগ উঠেছে, প্রয়াসের ঘটনা পুলিশ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করবে।”
ফোরকানের
মৃত্যুর ঘটনায় কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তার
ভগ্নিপতি ইমন বলেন, “নিহতের বাবা আব্দুর রশিদ বাদী হয়ে রোববার আদালতে মামলা
করবেন।”
সদর থানার ওসি মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, মাদক নিরাময় কেন্দ্রে
তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। তবে তার পরিবারের
পক্ষ থেকে কোনো মামলা বা অভিযোগ দেওয়া হয়নি। রোগীদের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায়ও
মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ করা হয়নি।
