বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট ২০২৬
৫ ভাদ্র ১৪৩৩
গোলাপি বাস: নিরাপত্তা নাকি অধিকারের সংকোচন?
ফজিলাতুন নেসা শাপলা
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৪৭ এএম আপডেট: ২০.০৮.২০২৬ ১:০৮ এএম |

 গোলাপি বাস: নিরাপত্তা নাকি অধিকারের সংকোচন?

নারী কাজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেই শুরু হয়ে যায় গণপরিবহনে ওঠার সেই চেনা নরকযন্ত্রণা-ধাক্কাধাক্কি, কুরুচিপূর্ণ দৃষ্টি, গায়ে ঘেঁষে দাঁড়ানোর নোংরা মানসিকতা, কুরুচিকর স্পর্শ আর যুদ্ধ করে বাসে ওঠার অবিরাম সংগ্রাম। প্রতিদিনের এই গণপরিবহন-যুদ্ধে অতিষ্ঠ নারীদের জন্য ‘গোলাপি বাস’ বা পৃথক বাস সার্ভিস নিঃসন্দেহে আপাতদৃষ্টিতে হয়তো স্বস্তির নিশ্বাস নিয়ে আসতে পারে। এ রকম উদ্যোগ গণপরিবহনে নারীকে সুরক্ষা দেওয়ার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
সব বাসকে নারীর জন্য নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করার মূল দায় এড়িয়ে কেবল একটি নির্দিষ্ট রঙের বাসে নারীদের সীমাবদ্ধ করার এই 'আলাদা করে দাও' কৌশল প্রকারান্তরে নারীদের মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি বাড়ায়। গণপরিবহনে নারীদের এই পৃথকীকরণের মধ্য দিয়ে প্রকৃতপক্ষে সাধারণ বাসগুলোকে পুরোপুরি পুরুষের একক সম্পত্তিতে পরিণত করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে।
জরাজীর্ণ, নিয়মহীন ও শৃঙ্খলাহীন পরিবহন ব্যবস্থার পুরোনো কিছু বাসকে গোলাপি রঙে সাজিয়ে রাস্তায় নামালেই কি নারীর মৌলিক নিরাপত্তা আর নগরীতে অবাধে বিচরণের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব?
নারীর আসল লড়াই কিন্তু বাসে ওঠা নয়, তার লড়াই শুরু হয়ে যায় বাসস্টপেজে যাওয়ার পথ থেকেই-অন্ধকার গলি, আলোহীন স্ট্যান্ড, ফুটপাত দখল আর বখাটেদের ইভটিজিংয়ের প্রাচীর পার হয়ে তারপর বাসের পাদানিতে পা রাখতে হয় একজন নারীকে।
নারীর গণপরিবহনে ওঠার ক্ষেত্রে যে পাহাড়সম বাধাগুলো রয়েছে, সেগুলো আড়াল করে এই যে বাসের গোলাপীকরণ, তা কতখানি টেকসই হবে তা এখনই ভাববার বিষয়। আমাদের দেশে কোনো সমস্যা এলে, তার মূলে না গিয়ে পাশ কাটিয়ে অস্থায়ী কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, যা সমস্যাকে না কমিয়ে আরও বাড়িয়ে তোলে।
গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু বাসের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়। একজন নারী যখন ঘর থেকে বের হন, তখন থেকেই তার নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি হয়। ঢাকার বেশিরভাগ বাসস্টপেজে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই, নেই কোনো ওয়েটিং শেড বা বসে অপেক্ষা করার জায়গা। সন্ধ্যার পর এই আলোহীন স্টপেজগুলো আগে থেকেই নারীদের জন্য আতঙ্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্টপেজে পৌঁছানোর আগে নারীকে অতিক্রম করতে হয় হকার, যত্রতত্র পার্ক করে রাখা গাড়ি ও নোংরা পরিবেশ। এর ওপর যোগ হয় মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা কুরুচিপূর্ণ মানসিকতার লোকদের ইভটিজিং।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বাসে ওঠা ও নামার জন্য থাকে মাত্র একটি সংকীর্ণ দরজা। এই এক দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে ওঠার সময়ই নারীরা সবচেয়ে বেশি শারীরিক স্পর্শ ও হয়রানির শিকার হন। তাছাড়া বাস কোথায় থামবে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট জায়গা নেই। চলন্ত বাসে লাফিয়ে ওঠার যে সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে উঠেছে এবং যেভাবে বাস না থামিয়ে ধাক্কা দিয়ে যাত্রী নামানো হয়, তা মূলত যেকোনো মানুষের জন্যই বিপজ্জনক; গর্ভবতী নারী, শিশু ও বয়স্কদের জন্য কার্যত মৃত্যুফাঁদ।
গণপরিবহনে নারীর প্রতি হয়রানি রুখতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রধান দেশ, যেমন ভারত ও পাকিস্তানও নারীর জন্য পৃথক বাসের উদ্যোগ নিয়েছিল, যা থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে।
ভারতের দিল্লিতে ‘পিংক বাস’-এ ‘পিঙ্ক টিকিট’ (২০১৯) ও 'সহেলি স্মার্ট কার্ড' (২০২৬) প্রবর্তন করে এবং প্রযুক্তিগতভাবে সিসিটিভি, জিপিএস, প্যানিক বাটনসহ ‘হিম্মত অ্যাপ’ চালু করে যাতায়াত ও অবকাঠামোগত উন্নতি ঘটালেও সামাজিক মানসিকতার আশানুরূপ পরিবর্তন হয়নি।
পাকিস্তানের করাচিতে ২০২৩ সালে ঠিক আমাদের দেশের মতো এ রকম উজ্জ্বল গোলাপি রঙের বাস চালু করা হয়েছে এবং সেখানকার বাসের ড্রাইভার ও কনডাক্টররা সকলেই নারী। ধরে নেওয়া যেতে পারে, আমাদের এই উজ্জ্বল গোলাপি বাসের মডেলটি একটি পাকিস্তানি মডেল। সিন্ধু প্রদেশের এই বাসে নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করলেও সীমিত রুটের কারণে সার্বিক কোনো সমাধান আসেনি।
দক্ষিণ এশিয়ার নগর পরিকল্পনাবিদরা যখনই নারীদের নিরাপত্তার কথা ভাবেন, তখনই তাদের প্রথম ও সহজ সমাধান হলো-‘আলাদা করে দাও’। এতে মূল সমস্যার সমাধান হয় না, অন্য সমস্যার সূত্রপাত হয়।
বাসকে গোলাপি রং করে নারীকে আলাদা বাস সার্ভিসে পাঠিয়ে দেওয়া আদতে এক ধরনের পৃথকীকরণের মানসিকতা। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এর প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত নেতিবাচক। এর ফলে গোলাপি বাস নিরাপত্তা নামে অধিকারের সংকোচনে পরিণত হতে পারে।
বাস আলাদা করে দেওয়া মানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ধরেই নেবে যে সাধারণ গণপরিবহন কেবল পুরুষেরই সম্পত্তি। এতে অপরাধীদের মনস্তত্ত্ব তো শুধরাবেই না, বরং তারা আরও বেশি নারীবিদ্বেষী হয়ে উঠতে পারে।
যেখানে ঢাকার রাস্তায় গণপরিবহনের তীব্র সংকট, সেখানে নির্দিষ্ট গোলাপি বাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা কোনো কর্মজীবী নারী যখন বাধ্য হবেন সাধারণ পরিবহনে উঠতে, তখন তাদের অবস্থা আগের চেয়ে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কারণ তখন পুরুষ যাত্রীদের আরও আক্রমণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির মুখে পড়তে হতে পারে-যেমন: ‘তোমাদের জন্য তো আলাদা বাস আছে, এখানে কেন উঠেছ?’
অন্যদিকে, গোলাপি বাসের নারী ড্রাইভার ও কন্ডাক্টরদের বিদ্যমান পরিবহন খাতের মাস্তান ও চালক-হেলপাররা কীভাবে নেবে, তা এক বিরাট প্রশ্ন।
এটা তো বলাই বাহুল্য, আমাদের পরিবহন ব্যবস্থা চরম প্রতিযোগিতামূলক ও বিশৃঙ্খল। পুরুষ চালকদের বেপরোয়া ড্রাইভিং, ওভারটেকিং এবং ওভারস্পিডিংয়ের মুখোমুখি হয়ে নারী চালকরা কতটা নিরাপদে বাস চালাতে পারবেন? তাছাড়া একজন নারী চালক বা কন্ডাক্টরকে যে টার্মিনালে কাজ করতে হবে, সেগুলো অত্যন্ত পুরুষশাসিত ও অপরাধপ্রবণ জায়গা। সেখানে তাদের শৌচাগারের সুবিধা, বিশ্রামাগার ও শারীরিক সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে নারী কর্মীদের জন্য কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
সড়ক পরিবহন খাতের ভেতরের সিন্ডিকেট ও পুরুষ শ্রমিকরা যদি নতুন এই নারী কর্মীদের প্রতি সহযোগিতাপূর্ণ মানসিকতা না দেখায়, তবে উদ্যোগটি মাঝপথেই থমকে যাওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।
এই উদ্যোগকে শতভাগ কার্যকর ও নিরাপদ করতে হলে বাসের ভেতরের নিরাপত্তার পাশাপাশি 'ডোর-টু-ডোর' বা মূল সংযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। নারীদের মূল স্রোত থেকে আলাদা না করে দিয়ে, মূল ধারার সাধারণ বাসে নারীরা যত ধরনের হয়রানির শিকার হন, তার তাৎক্ষণিক বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি চালক ও হেলপারদের জেন্ডার-সংবেদনশীলতার ওপর প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে শেখানো জরুরি। দয়া করে দেওয়া সংরক্ষিত আসন তুলে দিয়ে গণপরিবহনের পরিবেশ করে তুলতে হবে নারী-বান্ধব। বৈষম্য না করে নারীকে দিতে হবে মানুষের মর্যাদা।
নারীর নিরাপত্তা কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, আর গোলাপি বাস এই জটিল সমস্যা সমাধান প্রক্রিয়ার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, চূড়ান্ত সমাধান নয়। সমস্যার মূল শিকড় প্রোথিত আছে আমাদের সমাজ ও সড়ক পরিবহন ব্যবস্থার পুরুষতান্ত্রিক ও অপরাধপ্রবণ মানসিকতায়। তাই সব কিছু গোলাপি করে, এভাবে নারীকে মূল স্রোত থেকে আলাদা করে দেওয়ার মাধ্যমে এর সমাধান খোঁজা কোনো কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে না।
যেদিন একজন নারী স্বাধীনভাবে, কোনো প্রকার ভয়-ভীতি, হয়রানি ব্যতিরেকে দিন ও রাতের যেকোনো সময়ে মূল স্রোতের যেকোনো সাধারণ বাসে নিরাপদে উঠতে পারবেন-সেদিন বুঝতে হবে, আমরা সার্বিক উন্নতি করেছি।
গোলাপি বাস যেন নারীকে মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন করার হাতিয়ার না হয়; এটি যেন হয় নারীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর এবং পরিবহন খাতে সার্বিক শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার এক কার্যকর প্রথম পদক্ষেপ।
লেখক: কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।















http://www.comillarkagoj.com/ad/1752266977.jpg
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় (আবুল কাশেম হৃদয়)
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ১২২ অধ্যক্ষ আবদুর রউফ ভবন, কুমিল্লা টাউন হল গেইটের বিপরিতে, কান্দিরপাড়, কুমিল্লা ৩৫০০। বাংলাদেশ।
ফোন +৮৮ ০৮১ ৬৭১১৯, +৮৮০ ১৭১১ ১৫২ ৪৪৩, +৮৮ ০১৭১১ ৯৯৭৯৬৯, +৮৮ ০১৯৭৯ ১৫২৪৪৩, ই মেইল: [email protected]
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, কুমিল্লার কাগজ ২০০৪ - ২০২২