
বাংলাদেশের
অর্থনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নয়, বরং
অর্থনীতিতে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা। গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং
খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা এবং বিনিয়োগে ধীরগতির
কারণে সেই আস্থায় কিছুটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তাই বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি
খাত নয়, বরং সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে সমন্বিতভাবে সংস্কার করতে
হবে।
আমার মতে, প্রথম গুরুত্ব পাওয়া উচিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন মাসে মূল্যস্ফীতির
হার ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। এটি আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও এখনো সাধারণ
মানুষের জন্য বড় চাপের বিষয়। মূল্যস্ফীতি কমাতে শুধু সুদের হার বাড়ানো
যথেষ্ট নয়; খাদ্যপণ্যের উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাপনাকে আরও
দক্ষ করতে হবে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ক্ষেত্রে আগাম চাহিদা
নিরূপণ, পর্যাপ্ত মজুত এবং সময়মতো আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। বাজারে
কোথায় অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে, কোথায় কৃত্রিমসংকট তৈরি হচ্ছে এবং
কোথায় অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া হচ্ছে-এসব বিষয়ে তথ্যভিত্তিক নজরদারি প্রয়োজন।
ব্যাংকিং
খাতের সংস্কারও আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। খেলাপি ঋণ, দুর্বল করপোরেট
সুশাসন এবং কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের কারণে আর্থিক
খাতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছাড়া
শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বা বিনিয়োগ-কোনোটিই টেকসই হবে না। তাই ইচ্ছাকৃত
ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, ব্যাংকের পরিচালনায় স্বচ্ছতা এবং
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা আরও জোরদার করতে হবে।
অর্থনৈতিক
স্থিতিশীলতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা।
রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে, তবে করের হার বাড়িয়ে নয়; করের আওতা বৃদ্ধি, কর
প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং কর ফাঁকি কমানোর মাধ্যমে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়ের
অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস করতে হবে, যাতে উৎপাদনশীল খাত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা
ও সামাজিক সুরক্ষায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নিশ্চিত হয়।
বাংলাদেশ এখন এলডিসি
থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সরকার প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর আবেদন করেছে,
যাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য আরও সময় পাওয়া যায়। আমার মতে,
সম্ভাব্য এই অতিরিক্ত সময়কে সংস্কার পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে নয়, বরং
আর্থিক খাত, রাজস্বব্যবস্থা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির
জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় হিসেবে দেখতে হবে।
সবশেষে,
একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। দেশের অর্থনীতিকে টেকসইভাবে
স্থিতিশীল করতে হলে এটি কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সরকার, রাজনৈতিক দল,
বেসরকারি খাত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং জনগণ-সব অংশীজনের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও
পারস্পরিক আস্থা অপরিহার্য। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতির ধারাবাহিকতা এবং
অর্থনৈতিক বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা
বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে
বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা
এবং তথ্য-উপাত্তভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এসব
পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে দেশের অর্থনীতি আরও দৃঢ় ও টেকসই
ভিত্তির ওপর স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের
রাজস্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো-করের হার নয়, করের ভিত্তি। দেশে
এমন অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের কর দেওয়ার সক্ষমতা আছে, কিন্তু
তারা কার্যত করের আওতার বাইরে। আবার যারা নিয়মিত কর দেন, অনেক সময় বাড়তি
চাপও তাদের ওপরই পড়ে। এই বৈষম্য দূর করা জরুরি। বাংলাদেশের কর-জিডিপি
অনুপাত সমপর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। করের আওতা
সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের অটোমেশন ও অযৌক্তিক কর অব্যাহতি যৌক্তিকীকরণের
ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ স্বীকৃতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে।
আমার
মতে, প্রথম কাজ হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলা। জাতীয়
পরিচয়পত্র, আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব, ভূমি নিবন্ধন, গাড়ির মালিকানা,
কোম্পানির আর্থিক বিবরণী এবং অন্যান্য সরকারি তথ্যভাণ্ডার সমন্বিতভাবে
ব্যবহার করা গেলে প্রকৃত করদাতাদের শনাক্ত করা সহজ হবে। তবে এটি করতে গিয়ে
সাধারণ নাগরিকের হয়রানি বা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার যেন না হয়, সেদিকেও
সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কর প্রশাসনে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার আরও বাড়ানো
প্রয়োজন। অনলাইন রিটার্ন দাখিল, ই-ইনভয়েসিং, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং
স্বয়ংক্রিয় তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে রাজস্ব আহরণ যেমন বাড়বে, তেমনি করদাতা ও
কর কর্মকর্তাদের মধ্যকার সরাসরি যোগাযোগ কমবে। এতে দুর্নীতির সুযোগও কমবে।
একই সঙ্গে কর অব্যাহতির বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়ন করা উচিত। কোনো খাতকে কর
ছাড় দেওয়া হলে তার বিনিময়ে কত বিনিয়োগ, কত কর্মসংস্থান বা কত রপ্তানি
সৃষ্টি হয়েছে, সেটি নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। ফলাফল না থাকলে বছরের পর বছর
একই সুবিধা বহাল রাখার যৌক্তিকতা নেই।
অর্থ পাচার এবং শুল্ক ফাঁকিও
রাজস্ব আহরণের বড় বাধা। আমদানি-রপ্তানিতে পণ্যের মূল্য কম বা বেশি দেখিয়ে
অর্থ পাচারের অভিযোগ বহুদিনের। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড,
কাস্টমস, আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য
বিনিময় জোরদার করলে এ ধরনের অনিয়ম অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কর আদায়কে কখনোই
শুধু সরকারের আয় বৃদ্ধির বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। মানুষ তখনই কর দিতে
আগ্রহী হয়, যখন তারা দেখে সেই অর্থের সঠিক ব্যবহার হচ্ছে। তাই করব্যবস্থার
সংস্কারের পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান
গুরুত্বপূর্ণ। করদাতার মধ্যে এই বিশ্বাস তৈরি করতে হবে যে তার দেওয়া অর্থই
দেশের উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ হচ্ছে। তবেই
স্বেচ্ছায় কর পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, করের আওতা সম্প্রসারিত হবে,
রাজস্ব আহরণ টেকসইভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক
আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
বাংলাদেশ এখনো অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য
আমদানিনির্ভর। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য একটি মাত্র কারণকে
দায়ী করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময়
হার, জ্বালানি ব্যয়, উৎপাদন খরচ, সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারে
প্রতিযোগিতার ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে অস্বচ্ছ ব্যবসায়িক আচরণ-সবকিছু মিলেই
মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলে। ভোজ্যতেল, গম, ডাল, চিনি, সার, পশুখাদ্যসহ
বিভিন্ন পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য এবং ডলারের বিনিময় হার বাড়লে তার প্রভাব
দেশের বাজারেও পড়ে। গত কয়েক বছরে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয়
উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ব্যয়ও বাড়িয়েছে।
তবে
আন্তর্জাতিক বাজারের বিষয়টি সব ব্যাখ্যা করে না। একটি বড় সমস্যা হলো
উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সরবরাহ শৃঙ্খলের বা সাপ্লাই চেইনের অদক্ষতা।
অনেক ক্ষেত্রে কৃষক ন্যায্য দাম পান না, আবার ভোক্তাকে অনেক বেশি দামে
কিনতে হয়। এ ব্যবধানের পেছনে অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগী, সংরক্ষণের
সীমাবদ্ধতা, পরিবহন ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাজ করে।
আমার
মনে হয়, বাজারে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবও একটি বড় সমস্যা। কোনো পণ্যের
উৎপাদন কত, মজুত কত রয়েছে, আমদানি কত হয়েছে এবং আগামী মাসে চাহিদা কী
পরিমাণ হতে পারে-এসব তথ্য যদি নিয়মিত প্রকাশ করা হয়, তাহলে অযৌক্তিক গুজব
বা কৃত্রিমসংকট তৈরির সুযোগ অনেক কমে যাবে। সরকার অনেক সময় আমদানি শুল্ক বা
কর কমায়, কিন্তু সেই সুবিধা সবসময় ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। কেন পৌঁছায়
না, সেটিও নিয়মিত পর্যালোচনা করা দরকার। বাজারে প্রকৃত প্রতিযোগিতা থাকলে
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুফলও দ্রুত ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা।
আমার
কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-বাজার ব্যবস্থাপনায় পূর্বপ্রস্তুতির
অভাব। অনেক সময় সংকট তৈরি হওয়ার পর আমরা ব্যবস্থা নিই। অথচ উৎপাদন, মজুত,
আমদানি ও সম্ভাব্য চাহিদার তথ্যের ভিত্তিতে আগাম পরিকল্পনা করা গেলে অনেক
মূল্যবৃদ্ধিই এড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন,
পরিবহন এবং পাইকারি বাজারের আধুনিকায়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে
এগুলোই মূল্য স্থিতিশীল রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে।
লেখক: সভাপতি, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
