
কুমিল্লা
শহরে বর্তমানে কয়টি সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্রিকা বের হয়, তা আমার জানা নেই।
লেখালেখি করি যখন, তখন তা জানা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এটা আমার ব্যর্থতা।
ব্যর্থতার পক্ষে যুক্তি আছে বলে মনে করি না। কিন্তু কুমিল্লা শহরেই তো
থাকি, যারা পত্রিকা প্রকাশ করেন, তারাও তো কোনো খোঁজ খবর রাখেন না। কারণ,
পত্রিকা প্রকাশ যারা করেন, তাদের তো এসব বিষয় জানা উচিত। প্রতিযোগিতা বলে
কথা।
৬৫/৬৬ বছর আগে প্রথম যখন গ্রাম থেকে কুমিল্লা শহরে আসি, কলেজে
ভর্তি হই, তখন কুমিল্লায় কোনো পত্রিকা প্রকাশ হতো কিনা মনে নেই, দরকারও ছিল
না। সুপারিবাগানে যে গুহপরিবারে থাকতাম-নিত্যদিন ‘ডেইলি স্টেটসম্যান’ ও
‘লোকসেবক’ পত্রিকা আসতো। ‘লোকসেবক’ পড়তাম একটি বিশেষ প্রতিবেদনের জন্য।
শৈলেশ দে ‘শৈলমাড়িতে নেতাজী’ শীর্ষক অসাধারণ কাহিনিটি পড়ার জন্য। ইংরেজি
পত্রিকা আমার কাছে অত্যন্ত দূরূহ বিষয়, এখনও। তার পেছনেও ছোট ইতিহাস আছে।
অধ্যাপক অজিতকুমার গুহের বিপত্নীক পিতা শ্রদ্ধেয় নৃপেন্দ্রকুমার গুহ বয়সের
কারণে ক্ষীণ দৃষ্টি হওয়ায় আমাকে ইংরেজি পত্রিকাটি পড়ে শুনানোর জন্য কাছে
ডাকতেন। বিকেলবেলায় ডাক পড়ত, ৪/৫দিন যাওয়ার পর পালিয়ে যেতাম। অর্থাৎ
লাপাত্তা। সুতরাং ইংরেজিতে মূর্খতাটা চিরকালীন রয়ে গেলো।
বলছিলাম
কুমিল্লা শহরের পত্রিকার কথা। অনেক পরে শুনতে পেলাম, একজন ব্যক্তি পুরাতন
চৌধুরীপাড়া থেকে ‘আমোদ’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করছেন। যেহেতু
বই-এর লাইব্রেরিগুলো মোগলটুলিতে, সেখানে মালিক-সম্পাদক-সংবাদকর্মী বা
সংবাদদাতা-কম্পোজিটর- মেশিনম্যান একজনই। নাম তাঁর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারণ
করছি-মরহুম ফজলে রাব্বী। তিনিই পত্রিকা প্রকাশের পর সাইকেলে করে পরিচিত
ব্যক্তিদের গ্রাহক নির্বাচন করে পৌঁছিয়ে দিতেন। তাতে আর্থিক লাভ-লোকসান কি
তা জানি না। বলে রাখি- পত্রিকার প্রধান বিষয়বস্তু ছিল ক্রীড়াজগতের সংবাদ,
বিশেষ করে কুমিল্লার ক্রীড়াঙ্গনের প্রতিবেদন। ‘আমোদ’ কুমিল্লার প্রাচীনতম
সপ্তাহিক পত্রিকা। আজ নিয়মিত-অনিয়মিত চলমান। রাব্বী সাহেবের পরিবার-পরিজন
এখন আমেরিকাবাসী। কিন্তু পত্রিকা অফিসটি আগের মতোই বর্তমান। মরহুম ফজলে
রাব্বী সাহেব আজীবন বেঁচে থাকবেন ‘আমোদ’ পত্রিকার নাম ধরে, যদিও ‘রাব্বী
স্মৃতিসংসদ’ বলে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
আমার দুলাভাই একটি সাপ্তাহিক
পত্রিকা বের করেছেন। নাম- ‘রূপসী বাংলা’। দুলাভাই-এর নাম অধ্যাপক আবদুল
ওহাব। তিনি আমার দুলাভাই হতে যাবেন কেন ? তিনি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৪
সালে এমএ পাশ করে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি কলেজের বাংলার অধ্যাপক। তখন
তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে হাসিনা বেগম ঢাকাশহরে কোনো একটি মহিলা কলেজের
উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্রী, অধ্যাপক আবদুল ওহাব তাঁকে বিয়ে করেন। হাসিনা
বেগম উচ্চমাধ্যমিক পাশের পর কুমিল্লা শ^শুরবাড়ি বাগিচাগাঁও চলে আসে,
১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ভিক্টোরিয়া কলেজে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় অধীন অনার্স কোর্স
চালু হয়। সে বাংলা অনার্সে ভর্তি হয়, আমিও ঘটনাচক্রে ভর্তি হই এবং দু’জন
তখন সহপাঠী। সহপাঠী অর্থাৎ বন্ধু ও বোন। তার স্বামী সংগতকারণেই দুলাভাই।
আমরা ১৯৬৬ সালে অনার্স পাশ করি। হাসিনা ওহাব (বেগম তখন তামাদি) দ্বিতীয়
শ্রেণিতে অনার্স পাশ করার পরও এমএ পড়তে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়নি। তখন
নয়, এখন বিষয়টি নিয়ে যখন ভাবতে বসলাম, অধ্যাপক ওহাবের প্রতি ক্ষোভে ও
অভিমানে মনে মনে দু’চারটি গালি দিলাম। আসলে কাছ থেকে দেখেছি তো। অধ্যাপক
ওহাব সাদা খদ্দরের পাঞ্জাবী পরতেন, মনকাড়া হাসি ছিল মুখে, অভিনয়ের ভঙ্গিতে
কথা বলতেন, সবসময় ‘সম্রাট সম্রাট’ ভাব (এ নামে তাঁর একটি বইও আছে),
প্রগতিশীল চালচলন। কিন্তু পারিবারিকভাবে যে অর্থে উদার সহজগামী হওয়ার কথা
তদ্রুপ ছিলেন না। হাসিনা ওহাব আজীবন লোকের চক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেলেন। তাঁর
জন্য সমবেদনা তো বন্ধু হিসেবে যাপন করছি। দুলাভাইয়ের প্রতি ক্ষোভটা সেখানে।
অধ্যাপক
আবদুল ওহাব ‘রূপসী বাংলা’ প্রথম সাপ্তাহিক অনেকপরে দৈনিক এবং চলমান
কুমিল্লার অন্যতম দৈনিক পত্রিকা। অধ্যাপক ওহাব আজীবন অধ্যাপনা করেছেন,
কিন্তু বেঁচে আছেন ‘রূপসী বাংলা’র সম্পাদক হিসেবে। এটাই তাঁর শেষ ঠিকানা।
এই পত্রিকার ছায়াতলে কুমিল্লার বর্তমানে অনেক সংবাদকর্মী সাংবাদিক পত্রিকা
সম্পাদক কোনো না কোনোভাবে বিশ্রাম নিয়েছেন। অনেকে স্বীকার করেন, অনেকে করেন
না। কুমিল্লার একজনই অধ্যাপক আবদুল ওহাব- রূপসী বাংলার আজীবন সম্পাদক।
তাঁর সম্পর্কে দুটি কথা। ১৯৬৮ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ সরকারি হয়ে
যাওয়া একটি বেসরকারি কলেজের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তখন থেকে কুমিল্লা
কলেজের যাত্রা শুরু। কলেজ প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক নিয়োগে অধ্যাপক আবদুল ওহাব
হলেন প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যাপক। পরে অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয় জনাব রফিকুল
হককে। তাই অধ্যক্ষের পরবর্তী নামটি হলো অধ্যাপক ওহাবের। তিনি কিন্তু
প্রথমজন অর্থাৎ কলেজের প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত অধ্যাপক। বিষয়টি ঐতিহাসিক মূল্য
রয়েছে, কলেজের সঙ্গে ওহাব সাহেবের। নামটি স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে।
বলছিলাম
কুমিল্লার পত্রিকার কথা, নীতিশ সাহা বর্তমানে ‘শিরোনাম’ পত্রিকার সম্পাদক।
জিলা স্কুলের মেধাবী ছাত্র। সে সময় ‘আমোদ’ পত্রিকার ছোটদের পাতায় লেখা
শুরু করে। একসময় ছোটেদের জন্য পাতাটি সম্পাদনাও করেছে। ঢাকা বিশ^বিদ্যারয়
থেকে সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে সাপ্তাহিক ‘শিরোনাম’
পত্রিকা বের করে, এখন পত্রিকাটি দৈনিক। পারিবারিকভাবে নীতিশেরা ধনাঢ্য
পরিবার। কান্দিরপাড় পানপট্টি, তেলিকোনায় তাঁদের অনেক ভূমি ছিল। লাকসামে তো
তাদের রাজ্য। তাই এ পরিবারের সদস্যদের চাকরি মানায় না। কুমিল্লার হার্টে
‘হার্ট’ তৈরি করে অতীত বর্তমানকে দৃশ্যমান করে রেখেছে। ভাবি ভবিষ্যতে নীতিশ
এর পরিচয় কি হবে ? সম্পাদক, শিরোনাম পত্রিকার সম্পাদক ভিন্ন অন্যকোনো
ঠিকানা তো খুঁজে পাচ্ছি না।
আমি একটি পত্রিকার সঙ্গে মিশে গেছি ২০ বছর
যাবত। আমার স্নেহভাজন ছাত্র মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয় এর ‘দৈনিক কুমিল্লার
কাগজ’ পত্রিকার সঙ্গে। সে অনেক কথা। আমি আর নিজেকে খুঁজি না, আমি খুঁজি
সম্পাদক মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয়কে। তার পত্রিকা প্রথমে সাপ্তাহিক এখন
দৈনিক এবং কুমিল্লায় প্রকাশিতগুলোর অগ্রগণ্য। হৃদয় কুমিল্লার পত্রিকার একটি
কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। পত্রিকার আকার (সাইজ), পত্রিকার কাগজ,
কালারফুল ছবি মুদ্রণ, নান্দনিক বিজ্ঞাপন পরিবেশনা, কলাম লেখকসমাজ তৈরি করা
এবং অগ্রবর্তী বার্তা প্রদান ইত্যাদি। ফলে সম্পাদক ও মালিকের মানসিকতায়
অস্থিরতা মাঝে মাঝে দেখতে পাই। মূল্যায়ন ভুল হতে পারে- হৃদয় যখন পত্রিকার
মালিক নিজেকে মনে করে, তখন সে অনেককিছু হতে চায়। সেখানেই দ্বন্দ্ব। একজন
ব্যক্তি অনেক কিছু হতে চাইলে পরিসর খণ্ডিত হয়, শত্রু বা প্রতিযোগী বাড়ে,
পছন্দ-অপছন্দের মানুষগুলো তখন আকড়িয়ে ধরে। পত্রিকা এমন একটি প্রতিষ্ঠান তার
মাধ্যমে সম্পাদক সকল ইচ্ছা পূরণ করতে পারে। সে ইতিহাসের সাক্ষী,
রাজনীতিবিদদের দোসর, সমাজপতিদের পরামর্শদাতা, শিক্ষিত বা পণ্ডিত ব্যক্তিদের
আশ্রয়স্থল, জাতীয়ভাবে মান্যব্যক্তি এবং তাকে কারও কাছে যেতে হয় না, তার
কাছে সকলেই আসে- সম্মান নিয়ে, সম্মান দিয়ে সম্মান পেয়ে। আমার স্নেহভাজন
ছাত্র কি তা বুঝে ? পত্রিকার একটি অলৌকিক শক্তি আছে।
স্নেহের গাজীউল হক
সোহাগ ‘আমার শহর’ নামে দৈনিক পত্রিকা বের করেছে। একসময় অনেকদিন সে ‘প্রথম
আলো’র সাংবাদিক ও কুমিল্লার ব্যুরো প্রধান ছিল। বর্তমানে নিজে সম্পাদক হয়ে
‘আমার শহর’ পত্রিকা বের করলেও আমরা ‘প্রথম আলোর সোহাগ’কেই চিনি, জানি।
নিজের পত্রিকা দিয়ে কতটুকু পরিচিত পাবে, তা জানি না।
কুমিল্লার নিয়মিত
‘কুমিল্লার জমিন’ নামে পত্রিকা বের হচ্ছে। হাতে পাই না। দীর্ঘদিন প্রবীন
সাংবাদিক আবুল হাসানাত বাবুল ‘সাপ্তাহিক অভিবাদন’ পত্রিকা বের করছে। নিয়মিত
কিনা বুঝতে পারি না। কারণ, মাঝে মাঝে হাতে পাই, পড়ি। বাবুলের বহুমাত্রিক
পরিচয় আছে, শেষ পর্যন্ত ‘অভিবাদন’ই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে এটা আমার দৃঢ়
বিশ^াস। এখনও সভাসমিতিতে তার নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে ঘোষক উচ্চারণ করে
‘সাবেক প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাপ্তাহিক অভিবাদন পত্রিকার সম্পাদক....।’
কথা
তো সাদামাটা, পরিষ্কার। পত্রিকার লোক স্বপেশায় ও নেশায় যত সহজে সম্মানিক
মর্যাদা পায়, তাদের জন্য অন্য পথটা সহযোগী হতে পারে, প্রধান নয়।
স্নেহভাজন
মোহাম্মদ আবুল কাশেম হৃদয়- এ বিষয়টি নিয়ে ভাববে। পত্রিকা হলো খেয়াপারের
নৌকা। যাত্রী চিনে তোলার প্রয়োজন নেই, ভাড়াটাও বড় কথা নয়। যাত্রী যেন
নৌকাটা না ডুবায় এদিকে সতর্ক থাকতে হয়। আবার যাত্রীকে সম্মানও করতে হয়।
পত্রিকার সম্পাদকদের অভিমান থাকতে নেই। অভিমান ভাঙার দায়িত্ব তার। কেন এসব
বলছি, জানি না। তবে বলতে হচ্ছে কুমিল্লার পত্রিকা সমাজকে।
