
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার খুলে দেওয়ার ঘোষণার পর নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বহুল আলোচিত সেই সিন্ডিকেট। অভিযোগ রয়েছে, আগের ১০১ এজেন্সির সিন্ডিকেটের ধারাবাহিকতায় এবারও একটি বিশেষ গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায় মাত্র ২৫টি এজেন্সিকে নিয়ে নতুন সিন্ডিকেট গঠনের পাঁয়তারা শুরু হয়েছে। ফলে শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার সুফল কর্মীদের কাছে পৌঁছানোর আগেই তা একটি চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নতুন সিন্ডিকেটের প্রত্যেক সদস্যের জন্য ৫ মিলিয়ন মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত বা প্রায় ১৭ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৫টি এজেন্সির কাছ থেকে এ অর্থ আদায় করা হলে প্রাথমিক পর্যায়েই প্রায় ৪২৫ কোটি টাকা হাতবদলের সুযোগ তৈরি হবে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অর্থের প্রকৃত গন্তব্য অনুসন্ধান করা জরুরি হলেও সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো-এই অর্থ শেষ পর্যন্ত কর্মীদের ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হবে।
এর আগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ১০১ এজেন্সির সিন্ডিকেট নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, সিন্ডিকেটের সদস্য থেকে প্রত্যেক এজেন্সিকে ৫ থেকে ৭ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়েছে। সেই অর্থ পরে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় হিসেবে আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এবারও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে বাংলাদেশি কর্মীদের বিদেশযাত্রার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় প্রাথমিকভাবে ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। পরবর্তী সময়ে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। কিন্তু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগ ও অভিবাসন-প্রক্রিয়া পরিচালিত হলে কর্মীদের ব্যয় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। শুধু অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের নামেই বিপুল অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হলে তা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের ঝুঁকিও বাড়াবে।
অভিযোগ উঠেছে, কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা পাচারের পাঁয়তারা চলছে। এত বিপুল অর্থ বিদেশে যাওয়ার সম্ভাবনা শুধু অভিবাসন খাতের অনিয়ম নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং শ্রমিকদের পরিবারের ওপরও বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একজন কর্মী বিদেশে গিয়ে কয়েক বছর কঠোর পরিশ্রম করে যে অর্থ দেশে পাঠান, তার একটি বড় অংশ যদি অস্বচ্ছ ও অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে চলে যায়, তাহলে পুরো বৈদেশিক কর্মসংস্থানব্যবস্থার উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
এ অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে কোনোভাবেই কয়েকটি এজেন্সির একচেটিয়া ব্যবসায় পরিণত হতে না দেওয়া। বায়রার সাবেক এক নেতা সিন্ডিকেট বাতিল করে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড-বোয়েসেলের মাধ্যমে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবটি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছ ও নির্ধারিত খরচে নিয়োগ হলে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমবে এবং কর্মীদের হয়রানি ও অতিরিক্ত ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। তাই নতুন করে শ্রমবাজার খোলার সুযোগ কোনো সিন্ডিকেটের হাতে তুলে দেওয়া হলে অতীতের মতো এবারও তার মাশুল দিতে হবে কর্মীদের। তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কর্মী বাছাই থেকে মেডিকেল পরীক্ষা, ভিসা, বিমান ভাড়া ও নিয়োগ-প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের তদন্ত এবং নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন। কারণ শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার আসল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য নিরাপদ, স্বচ্ছ ও সাশ্রয়ী বিদেশযাত্রা-কয়েকটি এজেন্সির জন্য নতুন করে কোটি কোটি টাকার ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি নয়।
