
কুমিল্লার
লাকসামে চার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার অভিযোগে উপজেলার গোবিন্দপুর (উত্তর)
ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেনকে দল থেকে বহিষ্কার করা
হয়েছে।
শনিবার (১৫ আগষ্ট) উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুর
রহমান বাদল বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গতকাল শুক্রবার তাঁর স্বাক্ষরিত একটি
চিঠির মাধ্যমে এই বহিষ্কারাদেশ প্রদান করা হয়।
বিএনপির সাধারণ সম্পাদক
মো. আব্দুর রহমান বাদল স্বাক্ষরিত বহিষ্কারাদেশ পত্রে উল্লেখ করেন, উপজেলার
ইছাপুরা গ্রামের ৪টি পরিবারকে সমাজচ্যুত'র অভিযোগ গুরুতর অপরাধ। যা দলের
ভাবমুর্তি ও সাংগঠনিক মর্যদা ক্ষুন্ন হয়েছে। এটি দলীয় শৃংখলা ও সাংগঠনিক
স্বার্থের পরিপন্থী। ফলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো.
আলমগীর হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক পদসহ দলের সকল সাংগঠনিক এবং প্রাথমিক সদস্য
পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করা হলো।
এদিকে মাইকিংয়ের মাধ্যমে ৪টি
পরিবারকে সমাজচ্যুত'র ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে
ছড়িয়ে পড়ায় উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপে ৪ পরিবারকে
সমাজচ্যুত করার বে-আইনী ও মানবাধিকার পরিপন্থী সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার,
ভুক্তভোগী পরিবারের নিকট ক্ষমা চেয়ে পুনঃরায় এলাকায় মাইকিংয়ের মাধ্যমে
ঘোষণা দেন ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তরা।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, গত
সোমবার (১০ আগষ্ট) সন্ধ্যায় গোবিন্দপুর (উত্তর) ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ
সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে উপজেলার ইছাপুরা গ্রামের চারটি
পরিবারকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দিয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয়। এই ঘোষণার পর
পরিবারগুলো সামাজিকভাবে মর্যদাহানী, হেয়প্রতিপন্ন এবং একঘরে হয়ে পড়েন।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্নভাবে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনের
টনক নড়ে। পরে গত বুধবার (১২ আগষ্ট) লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী
কামরুন্নাহার লাইলী দুই পক্ষকে থানায় ডেকে আনেন এবং সমাজচ্যুত করার
সিদ্ধান্তের বিষয়টি প্রত্যাহারের জন্য সংশ্লিষ্ট সালিশ-বৈঠককারীদের নির্দেশ
দেন।
এলাকাবাসী সূত্রে আরো জানা গেছে, জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধের
বিষয়ে গ্রাম্য সালিস-বৈঠকের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে কুমিল্লার একটি আমলী
আদালতে মামলা দায়ের করায় উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের ইছাপুরা গ্রামের
সামাজিক সর্দারগণ চারটি পরিবারকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনার পর
পরই বিএনপি নেতা আলমগীরের নেতৃত্বে চারটি পরিবারকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা
দিয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয়। ঘটনার একাধিক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে
ছড়িয়ে পড়ে। এই নিয়ে এলাকায় তীব্র সমালোচনার ঝড় বইতে থাকে এবং চরম ক্ষোভের
সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগী চার পরিবারের একজন মমিন আলী জানান, তাঁদেরকে
সমাজচ্যুত'র ঘোষণা দিয়ে এলাকায় মাইকিং করায় তাঁরা বিব্রতবোধ করেন এবং চরম
বিপাকে পড়েন।
তাঁর অভিযোগ, বিএনপি নেতা আলমগীরসহ কতিপয় লোক
পরিকল্পিতভাবে তাঁদেরকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন ও মর্যদাহানীর লক্ষ্যে
এমন অমানবিক ও দেশের প্রচলিত আইন পরিপন্থী ঘটনা ঘটিয়েছেন।
ভুক্তভোগী
পরিবারের অভিযোগ, জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে চার পরিবারকে সমাজচ্যুত
করার মূল হোতা হলেন, একই গ্রামের বাসিন্দা গোবিন্দপুর ইউনিয়ন (উত্তর)
বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলমগীর হোসেন। তিনি রাজনৈতিক পদবীর প্রভাবে তাদেরকে
সমাজচ্যুত'র পর এলাকায় মাইকিং করিয়েছেন।
স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়,
ইছাপুরা গ্রামের প্রয়াত আবদুর রহমানের ছেলে মমিন আলী ও একই গ্রামের প্রয়াত
আবদুর রশিদের ছেলে আলমগীর হোসেনের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ
চলছে। ওই বিরোধ মিমাংসার জন্য ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ-বৈঠক
অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কোনোভাবেই বিরোধ মিমাংসা করা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে
গত ১৯ জুন স্থানীয় সর্দার-মাতব্বরগণ দু'পক্ষকে বিরোধীয় জায়গা-জমির সকল
কাগজপত্র সংগ্রহ ও জমা দিতে নির্দেশ দেন।
ওই বিরোধ মিমাংসার জন্য চলতি
মাসের ২০ আগস্ট পুনরায় সালিশ-বৈঠক অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু
গত ২ জুলাই মমিন আলী বাদী হয়ে আলমগীর হোসেন, অহিদুর রহমান ও নেছার আহমেদের
বিরুদ্ধে কুমিল্লার আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন। এরই প্রেক্ষিতে
সালিশ-বৈঠকের সিদ্ধান্ত অমান্য করে আদালতে মামলা দায়েরের অভিযোগে এনে গত
সোমবার মাইকিং করে মমিন আলীসহ চার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার ঘোষণা দেয়া হয়।
এ ছাড়াও তাঁদের সঙ্গে ব্যবসা-বানিজ্য, লেনদেন, এলাকা এবং দোকানপাটে
চলাফেরা না করার নির্দেশনাসহ মাইকে নানাহ রকম ঘোষণা করেন।
তাঁরা জানান,
ঘটনাটি উপজেলার নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) এবং লাকসাম থানার ওসি'র
হস্তক্ষেপে ৪ পরিবারকে সমাজচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার, ভুক্তভোগী
পরিবারের নিকট ক্ষমা চেয়ে পুনঃরায় এলাকায় মাইকিংয়ের মাধ্যমে ঘোষণা দেওয়া
হয়।
এই ঘটনায় অভিযুক্ত ও দল থেকে বহিস্কৃত উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়ন
বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের
চেষ্টা
করে তাঁকে না পাওয়ায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এই ব্যাপারে
শনিবার (১৫ আগষ্ট) বিকেলে লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী
কামরুন্নাহার লাইলী ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মাইকিং করে চারটি
পরিবারকে সমাজচ্যুত'র ঘটনাটি সম্পূর্ণভাবে দেশের প্রচলিত আইন পরিপন্থী।
বিষয়টি আমার নজরে আসলে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠিয়ে সংশ্লিষ্ট
সর্দার-মাতব্বরদের থানায় এনে এসব বে-আইনী কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ প্রদান
করা হয়। একপর্যায়ে তাঁরা ভুক্তভোগী পরিবারের নিকট ক্ষমা চেয়ে পুনঃরায়
মাইকিংয়ের মাধ্যমে তাঁদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন।
