
সড়ক
দুর্ঘটনা একটি নীরব মহামারী, যা শুধু একজন ব্যক্তির জীবনহানি বা পঙ্গুত্ব
ঘটায় না, বরং পুরো পরিবারকে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ফেলে
দেয়। সড়ক দুর্ঘটনা জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটি বড় সংকট সৃষ্টি করেছে ।
যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, অমনোযোগী হয়ে গাড়ি চালানো, অতিরিক্ত গতি এবং
দুর্বল অবকাঠামো-এই বিষয়গুলোর কারণে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ও
আহতের ঘটনা ঘটে। সড়ক দুর্ঘটনায় যারা হতাহত হন, তাদের অধিকাংশই উপার্জনক্ষম
ব্যক্তি। এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার মোকাবিলায়
বিশ্বজুড়ে জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ট্রাফিক আইন প্রয়োগের আরও
কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশিত তথ্য
অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় ১১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ মারা যান এবং ২
থেকে ৫ কোটি মানুষ আহত বা পঙ্গু হন। ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী শিশু ও তরুণদের
মৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার বিষয়টি এখনো অব্যাহত
রয়েছে। রাইড-হেলিং এবং ডেলিভারি অ্যাপের প্রসারের ফলে ২০১১ থেকে ২০২৫ সালের
মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনায় মোটরসাইকেল আরোহীদের মৃত্যুর হার প্রায়
এক-তৃতীয়াংশ। অথচ দুর্ঘটনার সময় হেলমেট ব্যবহার করলে মৃত্যুর ঝুঁকি ছয়
গুণেরও বেশি কমে যায়।
সড়ক দুর্ঘটনায় বিশ্বব্যাপী দেশগুলোর বার্ষিক মোট
দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ সমপরিমাণ ৩.৭৮৯ ট্রিলিয়ন বা ৩,৭৮৯
বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এই বিশাল ক্ষতির পেছনে রয়েছে
চিকিৎসা ব্যয়, নিহত বা আহত ব্যক্তির কর্মক্ষমতা হারানো এবং পরিবারের যত্ন
নেওয়ার কারণে কাজের সময় নষ্ট হওয়া। জীবনের মূল্য ও অন্যান্য আর্থিক হিসেবে
প্রতিটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনায় বড় অঙ্কের ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
সড়ক দুর্ঘটনার বর্তমান চিত্র রীতিমতো আতঙ্কজনক। যদিও প্রতি বছর সরকারি ও
বেসরকারি সংস্থাগুলো দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান প্রকাশ করে, কিন্তু প্রকৃত
সংখ্যাটি প্রায় প্রকাশিত সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি হয় বলে ধারণা করা হয়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় বার্ষিক আর্থিক ক্ষতির
পরিমাণ প্রায় ৩৪ হাজার থেকে শুরু করে ৬০ হাজার কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে
পারে।
ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে সারা বাংলাদেশে
সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২০ সালে ৩,৯১৮ জন, ২০২১ সালে ৫,০৮৪ জন, ২০২২ সালে ৪,৬৩৬
জন, ২০২৩ সালে ৫,০২৪ জন, ২০২৪ সালে ৫,৪৮০ জন এবং ২০২৫ সালে ৫,৪৯০ প্রাণ
হারিয়েছিলেন। এই পরিসংখ্যান দেশের সড়ক নিরাপত্তার চিত্র ও ক্রমবর্ধমান
ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরে। সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে কাজ করা
সংস্থা ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’র তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনার মধ্যে
৩,০২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মোট ২,৬৭২ জন নিহত হয়েছেন। তথ্যে দেখা যায়,
২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট প্রাণহানির প্রায় ৭৮ শতাংশ ১৮ থেকে ৬৫ বছর
বয়সী কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী। এসব দুর্ঘটনায় প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ নিহত
বা আহত হন—যাদের মধ্যে অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন-পাশাপাশি
যানবাহন ও মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণেও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি সাধিত হয়।
বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত ও ইঞ্জিনচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল, দুর্বল
ব্রেকিং সিস্টেম এবং ট্রাফিক আইন না মানার প্রবণতার কারণে ইদানিং সড়ক
দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে।
দেশে সড়ক দুর্ঘটনার উচ্চ
হারের পেছনে বহুবিধ কারণ রয়েছে। টেকসই পরিকল্পনা ছাড়াই অপরিকল্পিত
অবকাঠামো নির্মাণ, যার ফলে ত্রুটিপূর্ণ ফুটপাত, অত্যধিক যানজটপূর্ণ
ফ্লাইওভার এবং যান চলাচলের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার মতো সমস্যা সৃষ্টি হয়।
শহরজুড়ে অবৈধভাবে গাড়ি থামানো এবং যানজট একটি সাধারণ বিষয়। সড়ক দুর্ঘটনার
মূল যে কারণগুলো রয়েছে এর মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অতিরিক্ত পণ্য বা
যাত্রী পরিবহন, সড়কের নিম্নমান, চালকদের দক্ষতার অভাব, মাদকাসক্তি ও
অসুস্থতা, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক অবকাঠামো, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো,
জনসচেতনতা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলার অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি। যত্র তত্র
গাড়ি পার্কিং করা, নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী উঠানামা করা, রাস্তা
পারাপারের সময় পথচারীদের অসতর্কতা, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করা, পর্যাপ্ত
সিগন্যাল-যুক্ত জেব্রা ক্রসিং না থাকা, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রাস্তা
পার হওয়া, হেলমেট ব্যবহার না করা, সিটবেল্ট না বাঁধা, ভুল পথে গাড়ি চালানো
এগুলোও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। বর্ষাকালে সড়কে জলাবদ্ধতা, অবৈধভাবে হকার বা
দোকানপাট দ্বারা সড়কের অংশ দখল করে রাখাও দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দেশের
আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা অন্যতম প্রধান
চালিকাশক্তি। দেশের অর্থনীতি, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং
বাণিজ্যের প্রতিটি ক্ষেত্রই সড়ক পরিবহনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। সড়ক
নিরাপত্তা কেবল যাতায়াত ব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও
মানবাধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে না পারলে টেকসই
উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হয়। এটি জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি একটি
দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক সুরক্ষার পূর্বশর্ত। প্রায় প্রতিটি
দেশেই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে, যার ফলে প্রাণহানি, যানবাহনের ক্ষয়ক্ষতি এবং
অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়। সম্পদ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলেও হারানো
প্রাণের কোনো বিকল্প নেই, যা পরিবার ও সমাজের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়
। বিশেষ করে গণমাধ্যমে প্রচার চালিয়ে প্রতিটি মানুষের কাছে সঠিক নিয়ম
পৌঁছে দেওয়া, স্কুল ও কলেজ পর্যায় থেকে পাঠ্যপুস্তকে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা
যুক্ত করা, চালক ও পথচারীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক
ক্যাম্পেইন করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে যত ধরনের
কারণই থাকুক না কেন সেগুলোকে বিবেচনায় নিয়েই সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে
এবং জীবন বাঁচাতে একটি সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে
সরকারি, বেসরকারি ও জনগণ—সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সড়ক নিরাপদ
রাখতে বিশ্ব স্বীকৃত ‘শিক্ষা, প্রকৌশল, আইন প্রয়োগ, জরুরি সাড়াদান'- মডেলের
পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে অবশ্যই সামগ্রিক নীতিমালা
প্রণয়ন এবং সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক তথ্য
প্রযুক্তির ব্যবহার, সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে অংশীজনের সচেতনতা বৃদ্ধি,
যুগোপযোগী সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে ডিজিটাল, টেকসই,
নিরাপদ, সুশৃংখল, পরিবেশ বান্ধব আধুনিক সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আসুন
সম্মিলিতভাবে কাজ করি। শতভাগ দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব না হলেও সচেতনতা ও সঠিক
পদক্ষেপের মাধ্যমে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা, সিসিটিভি মনিটরিং
এবং ডিভাইডার স্থাপন ও এর যথাযথ আইনি প্রয়োগ করে অনেক দুর্ঘটনা রোধ করা
সম্ভব। আমাদের এমনভাবে কাজ করা উচিত যাতে সড়ক দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু না হয়,
নিজের ও অন্যের জীবন নিরাপদ থাকে। আমাদের সকলের সড়ক যাত্রা নিরাপদ ও
আনন্দময় হোক।
লেখকঃ গবেষক, কলাম লেখক, সমাজকর্মী এবং একজন সরকারি কর্মচারী।
